থমকে যাওয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিমে গতি ফেরাতে আসছে বড় পরিবর্তন

থমকে যাওয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিমে গতি ফেরাতে আসছে বড় পরিবর্তন

সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুরক্ষার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিমে গতি ফেরাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রচারের ঘাটতি, আস্থার সংকট এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে নতুন নিবন্ধন ও অংশগ্রহণের গতি কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়াতে স্কিমে যুক্ত হচ্ছে সময়োপযোগী বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকালে অনুষ্ঠেয় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চালুর পর প্রথম ১০ মাসে যেখানে তিন লাখের বেশি মানুষ এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, সেখানে সবশেষ ২৬ মাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মাত্র ৮০ হাজার। ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই ও নিরাপদ সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। কিন্তু সাধারণ জনগণের তেমন সাড়া না পেয়ে সর্বজনীন পেনশন স্কিম থমকে গেছে।

বিজ্ঞাপন

কর্মকর্তারা বলছেন, সচেতনতার ঘাটতি ও মানুষের আস্থার সংকটই অংশগ্রহণ কমার অন্যতম কারণ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রচার কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় নতুন নিবন্ধন কমেছে। এছাড়া অনেক নাগরিক এখনো স্কিমের সুবিধা, রিটার্ন ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না পাওয়ায় আগ্রহ কম দেখাচ্ছে।

জানা গেছে, পেনশন স্কিমকে আকর্ষণীয় করতে যুক্ত করা হচ্ছে শরিয়াহ বা ইসলামিক ভার্সন। একইসঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে স্বাস্থ্যবীমা। এছাড়াও মাত্র পাঁচ বছর অর্থ জমা দিয়েই বিশেষ পরিস্থিতিতে তহবিল উত্তোলনের সুযোগ রাখা, নমিনির আজীবন পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করা, মাঠ পর্যায়ে কাজের উৎসাহ বাড়াতে কমিশন ফি বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ও ঝুঁকি মোকাবিলায় পৃথক ফান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত আসছে।

চালু হচ্ছে স্বাস্থ্যবীমা

সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর পর থেকেই এটি কাঙ্ক্ষিত হারে মানুষের কাছ থেকে সাড়া পায়নি। এজন্য স্বাস্থ্যবীমাকে পেনশন স্কিমের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষীয় সূত্র জানিয়েছে, আগামীকালের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এটি অনুমোদন পেতে পারে। এতে এ স্কিমের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইসলামিক ভার্সন চালুকরণ

সর্বজনীন পেনশন স্কিম জনপ্রিয় করতে ইসলামিক ভার্সন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান প্রডাক্ট ডিজাইন এবং অপর প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

জানা গেছে, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে ইসলামিক ভার্সন না থাকায় নাগরিকদের এক বড় অংশ এতে অন্তর্ভুক্ত হতে অনীহা প্রকাশ করছে। একই কারণে দেশের লাখ লাখ মসজিদের ইমামদেরও প্রচারকাজে লাগানো যাচ্ছে না। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি স্কিমের ইসলামিক ভার্সন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে চালু থাকা চারটি স্কিমের ইসলামিক ভার্সন চালু করা গেলে গ্রাহকসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।

পেনশনের বয়সসীমা পুনর্নির্ধারণ

জানা গেছে, আগামী পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে পেনশন শুরুর বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। এর আগে বয়সসীমা পুনঃনির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

আজীবন পেনশন সুবিধা

জানা গেছে, নতুন প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে পেনশনদাতার মৃত্যুর পর তার মনোনীত নমিনি বা স্বামী/স্ত্রী এককালীন সুবিধার পাশাপাশি আজীবন পেনশন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এই দীর্ঘমেয়াদি সুবিধাটি চালু হলে পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেকটাই লাঘব হবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি আরো বেশি পোক্ত হবে।

এক্সিট প্ল্যান

সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের কিছু যৌক্তিক দাবি ও আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে ‘এক্সিট প্ল্যান’ বা অর্থ উত্তোলনের শর্তেও বড় ধরনের নমনীয়তা আনা হচ্ছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদে টাকা জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী কোনো গ্রাহক মাত্র পাঁচ বছর নিয়মিত অর্থ জমাকরণের পর যদি শারীরিক কিংবা আর্থিকভাবে চরম অক্ষম হয়ে পড়েন, তাহলে কর্তৃপক্ষের বিশেষ বিবেচনায় নির্দিষ্ট নিয়মে তার জমাকৃত অর্থ উত্তোলনের সুযোগ রাখা হচ্ছে। এটি চরম বিপদে গ্রাহকদের জন্য একটি বড় আর্থিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

আবারও চালু হচ্ছে ঋণ কার্যক্রম

আগে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে জমা হওয়া টাকা থেকে গ্রাহকের ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু অর্থসংকটে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আইন অনুযায়ী বিদ্যমান ঋণ কার্যক্রম পুনরায় চালু ও অব্যাহত রাখার বিষয়েও পর্ষদ সভায় সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত আসবে।

কমিশন বৃদ্ধি

পেনশন স্কিমের মাঠ পর্যায়ে প্রচার ও নিবন্ধনের গতি দ্রুততর করার জন্য মাঠকর্মী এবং মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানো হচ্ছে। প্রতিটি নিবন্ধনের বিপরীতে এতদিন ইউডিবিসিকে যে ১৫ টাকা কমিশন দেওয়া হতো, তা বাড়িয়ে ২৫ টাকায় নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংক, ডাক বিভাগ ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ (এমএফএস) অনুমোদিত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একই হারে কমিশন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও কর্মীরা সাধারণ মানুষকে পেনশন স্কিমে উদ্বুদ্ধ করতে আরো বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঝুঁকি মোকাবিলায় ফান্ড গঠন

জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক বা দেশি অর্থনীতিতে মুনাফার হার পরিবর্তনজনিত যেকোনো ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি বিশেষ রিজার্ভ বা কন্টিনজেন্সি ফান্ড গঠনের প্রস্তাবও পর্ষদ সভায় তোলা হচ্ছে। ফান্ডটি গঠিত হলে যেকোনো অপ্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সংকটেও পেনশন স্কিমের তহবিল সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে এবং গ্রাহকদের লভ্যাংশ বা মুনাফা প্রাপ্তিতে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. সুরাতুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে গতিশীল করতে আগামী পরিচালনা পর্ষদের সভায় বেশকিছু প্রস্তাবনা দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবনাগুলো পাস হলে স্কিমে গতি ফিরবে। বিশেষ করে ইসলামিক ভার্সন চালুকরণ, পেনশনদাতার মৃত্যুর ক্ষেত্রে নমিনিকে (স্বামী/স্ত্রী) আজীবন পেনশন প্রদান, আইন অনুযায়ী ঋণ কার্যক্রম পুনরায় চালু, ঝুঁকি মোকাবিলায় ফান্ড গঠন, এক্সিট প্ল্যান, পেনশনের বয়সসীমা পুনর্নির্ধারণ এবং স্বাস্থ্যবীমা অন্তর্ভুক্তি হলে গতি ফিরবে বলে মনে করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন