হারিয়ে যাচ্ছে সরাইলের চৌকস গ্রেহাউন্ড ডগ

হারিয়ে যাচ্ছে সরাইলের চৌকস গ্রেহাউন্ড ডগ

লম্বা কান ও লেজ, সাদা-বাদামি রঙ এবং তীব্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন সরাইলের গ্রেহাউন্ড ডগ। অ্যাথলেটিক দেহ কাঠামো, দ্রুতগামী এবং তীক্ষ্ণ শিকারি স্বভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে এই কুকুরের ব্যাপক সুনাম রয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য প্রাণীটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু জাত সংরক্ষণে যত্নশীল না হওয়া এবং লালন-পালনের সঠিক উদ্যোগের অভাবে সম্ভাবনাময় এই জাতের কুকুর আজ বিলুপ্তপ্রায়।

নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য দেশে কুকুরের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। এজন্য বিদেশ থেকে কুকুর আমদানি করছে সরকার। বর্তমানে র‌্যাবের ডগ স্কোয়াডে আছে আনা ল্যাব্রাডর রিট্রিভার ও জার্মান শেফার্ড। পাশাপাশি বিজিবিতেও আছে ডগ স্কোয়াড। এসব কুকুর গোপন বস্তু বা বিস্ফোরক খোঁজা, মাদকদ্রব্য শনাক্ত এবং কোনো বড় দুর্ঘটনা বা ধসে পড়া ভবনের নিচ থেকে মৃত অথবা আহত মানুষ খুঁজে বের করে থাকে। কুকুরের এমন ব্যবহার দিনদিন বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের চাহিদা পূরণ করে গ্রেহাউন্ড কুকুর বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এজন্য সরকারের উদ্যোগ জরুরি। গ্রেহাউন্ড কুকুর জার্মান শেফার্ডের বিকল্প হতে পারে। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের এই কুকুর এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এই বিরল জাতের কুকুরকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে এবং এর বাণিজ্যিক প্রসারের জন্য স্থানীয় প্রশাসন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। মূলত এই জাতের কুকুরের জন্য প্রজনন কেন্দ্র বাড়ানোর পরিকল্পনা এখন বেশি জরুরি।

এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক শাহজামান খান বলেন, ‘গ্রেহাউন্ড ডগ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তালিকার মধ্যে পড়ে না।’

যোগাযোগ করে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান জানান, নিরাপত্তার জন্য ডগ স্কোয়াড খুবই জরুরি। এটি একটি প্রচলিত পদ্ধতি। আদিকাল থেকে নিরাপত্তার জন্য কুকুর ব্যবহার হয়ে আসছে। বাংলাদেশে এর ব্যবহার বাড়ছে।

জানা গেছে, জার্মান শেফার্ডের বিকল্প হতে পারে গ্রেহাউন্ড ডগ বা সুখ্যাত ‘সরাইলের কুকুর’। নিরাপত্তাকাজে ব্যবহৃত হওয়া জার্মান শেফার্ড বিশ্বে ব্যাপক পরিচিত নাম। গ্রেহাউন্ড ডগের পাঁজর অত্যন্ত দৃঢ়, দেহ দীর্ঘ এবং মুখটি দেখতে কিছুটা শেয়ালের মতো হয়। চিতাবাঘ বা ঘোড়ার পরই এদের অন্যতম দ্রুতগামী প্রাণী বলা হয় এবং এরা ঘ্রাণের চেয়ে দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তির মাধ্যমে শিকার ধরতে বেশি পারদর্শী।

গ্রেহাউন্ড অত্যন্ত প্রভুভক্ত ও শান্ত প্রকৃতির হলেও অপরিচিতদের প্রতি ভীষণ হিংস্র ও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। শুধু আকৃতি বা দৈহিক গঠনের দিক থেকে গ্রেহাউন্ড অন্যান্য কুকুরের চেয়ে আলাদা নয়, আচরণের দিক থেকেও এদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এদের হাঁটাচলা বা দৌড় দেওয়ার ভঙ্গিও পৃথক। ঘুমের অভ্যাসও অন্য কুকুরের চেয়ে ভিন্ন। শুধু ঘ্রাণশক্তি নয়, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তির মাধ্যমে শিকার ধরা এদের অন্যতম গুণ।

সূত্র জানায়, জাত সংরক্ষণের অভাবে এই প্রজাতির কুকুর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় এই কুকুর দেখতে পাওয়া যেত। কিন্তু দিনদিন এরা হারিয়ে যাচ্ছে। এই জাতের কুকুর লালন-পালনেও হিমশিম খেতে হয় মালিকদের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ডগ লালন-পালন ব্যয়সাপেক্ষ। যারা বাণিজ্যিকভাবে এই জাতের কুকুর পালনে আগ্রহী, তারাও বিভিন্ন কারণে এদের যথাযথ পরিচর্যা করতে পারছেন না। কারণ, এই কুকুরের চিকিৎসাব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। এদের তাজা গরুর মাংস ও দুধ খাওয়াতে হয়। প্রচুর পরিচর্যা করতে হয়।

জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা সদরের বড় দেওয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান ঠাকুর ২০০১ সালে সরাইলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গ্রেহাউন্ড কুকুর প্রজননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তার সে উদ্যোগ টেকেনি। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যবাহী সরাইলের বিরল প্রজাতির মূল্যবান গ্রেহাউন্ড কুকুর বিলুপ্ত হতে চলেছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশিংয়ের বিভিন্ন শাখা ও উপশাখা তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশে মানুষের সমাগম বাড়ছে। নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য ডগ স্কোয়াডের চাহিদা বাড়ছে। র‌্যাবের পাশাপাশি বিজিবিও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করছে। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মাদক তল্লাশির জন্য কুকুর চেয়ে আবেদন করেছে।

সাধারণত এসব কুকুর আমদানি করা হয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে। আমদানি না করে এক্ষেত্রে দেশীয় জাতের এই গ্রেহাউন্ড ডগ হতে পারে বিকল্প। দেশের ভেতরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাকাজে যেমন এটির যথাযথ ব্যবহার করা যেতে পারে, পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করেও অর্জন করা যেতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা ও সুখ্যাতি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন