রাজউকের অনুমোদিত রামপুরা খেলার মাঠ দখল করে রাতের আঁধারে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে। ‘শিগগিরই রাজউকের অনুমোদন পাওয়া যাবে’—এমন দাবি করে গত দুই বছর ধরে মাঠটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্মাণকাজ চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রামপুরার একমাত্র খেলার মাঠটি টিনের প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। মাঠের ভেতরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী। রাতের বেলায় বড় বড় ট্রাকে করে আনা হচ্ছে বিভিন্ন সামগ্রী। ভবন নির্মাণের জন্য সেখানে প্রকৌশলীও নিয়োগ হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, হাতিরঝিল প্রকল্প এলাকার মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) আওতাভুক্ত জায়গায় কীভাবে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মাঠটি বন্ধ থাকায় এলাকার শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগ কমে গেছে। এতে তাদের স্বাভাবিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে তমা কনস্ট্রাকশনের মার্কেটিং কর্মকর্তা জাকারিয়া দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই তারা কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে হোক কিংবা দিনে—কাজ করবই, ভবনও হবে।’
তবে রাজউক চেয়ারম্যান জানান, ওই প্রকল্পের ছাড়পত্র বাতিল করা হয়েছে। নকশা বাতিলের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ ছিল, তবে আবার কাজ শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত রাজউকের পরিদর্শক ও সহকারী অথরাইজড অফিসারকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হবে।
সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠ দখল ও নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে তারা রাজউক, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এরপরও কীভাবে তমা কনস্ট্রাকশন মাঠ দখল করে নির্মাণকাজ চালানোর সুযোগ পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে তারা বলেন, হাতিরঝিল প্রকল্প এলাকার ওই অংশে খেলার মাঠ ছাড়া অন্য জায়গায় আবাসিক ভবনের অনুমোদনের নিয়ম রয়েছে। সেখানে খেলার মাঠ দখল করে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ কীভাবে নেওয়া হলো, তাতে তারাও অবাক হয়েছেন।
বাসিন্দাদের দাবি, তমা গ্রুপের নির্মাণকাজের বিষয়ে রাজউক সদর দপ্তরও পুরোপুরি অবগত নয়। কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি কাজের সুযোগ পেল, সে বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনাবিদদের কাছেও স্পষ্ট তথ্য নেই বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকায় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য কোনো মাঠ ছিল না। জনসাধারণের প্রয়োজন ও দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার ২০১৬ সালে প্রায় সাড়ে চার একর জমি খেলার মাঠ হিসেবে নির্ধারণ করে। রামপুরা টিভি ভবনের বিপরীতে একরামুন্নেছা বয়েজ হাই স্কুল সংলগ্ন জায়গাটি প্রস্তাবিত হাতিরঝিল বিশেষ ড্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গত কয়েক এক বছর ধরে খেলার মাঠের নির্ধারিত জায়গায় কোম্পানিটি কোনো অদৃশ্য ক্ষমতাবলে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এজন্য তারা জায়গাটিতে বহুদিনের বেড়ে ওঠা নারিকেল, আমসহ ৫০ থেকে ৬০টি বড় গাছ কেটে ফেলেছে।
এলাকাবাসী জানায়, খেলার মাঠের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ফলে এলাকার খেলার মাঠের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে এবং শিশুরা খেলাধুলার সুযোগ হারিয়েছে। এ ছাড়া বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে শব্দদূষণ-বায়ুদূষণসহ পরিবেশগত বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা খেলার মাঠের জায়গা বহুতল ভবন নির্মাণ থেকে রক্ষার দাবি জানিয়েছেন। মাঠটি এলাকার মানুষের জন্য সংরক্ষণে রাজউক, পরিবেশ ও বন উপদেষ্টা এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টার কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন করেছেন তারা। একই সঙ্গে ওই স্থানে শিশু একাডেমির ভবন নির্মাণের দাবিও জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম রিজু আমার দেশকে বলেন, তমা গ্রুপ কীভাবে রাজউকের জায়গায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সুযোগ পেল, সে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। আমরা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বিষয়টি জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি।
রাজউকের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে হাতিরঝিল বিশেষ ড্যাপের আওতায় আরবান রেসিডেন্সিয়াল জোন, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত ছিল। কিন্তু এরপর আর মাঠের প্রকল্পের ব্যাপারে সরকার উদ্যোগ নেয়নি। এ অবস্থায় মাঠের জায়গাটি গত ৯ বছর ধরে খালি অবস্থায় পড়ে ছিল।
২০১৯ সালে রাজউকের উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ শাহনেওয়াজ হকের স্বাক্ষরিত আবাসিক ভবনের ছাড়পত্রে হাতিরঝিল বিশেষ ড্যাপের ভূমি ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এতে আরবান রেসিডেন্সিয়াল জোন, খেলার মাঠ ও সড়কসহ নির্ধারিত জায়গাগুলো বাদ দিয়ে ভবন নির্মাণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে শাহনেওয়াজ হক বলেন, রামপুরার ওই জায়গায় কোনোভাবেই বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই। এমনকি কাউকে ছাড়পত্রও দেওয়া হয়নি। সেখানে কোনো কনস্ট্রাকশন গ্রুপ কীভাবে একটি খেলার মাঠের মধ্যে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সুযোগ পেল—সে বিষয়ে আমার জানা নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


