এবার ‘ডিসেম্বরেই নতুন বই’, রেকর্ড গড়তে চায় সরকার

এবার ‘ডিসেম্বরেই নতুন বই’, রেকর্ড গড়তে চায় সরকার

ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন শিক্ষাবর্ষের (২০২৭) পাঠ্যবই তুলে দিতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। এ নিয়ে সম্প্রতি সচিবালয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনা কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠক করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী ডিসেম্বরেই শিক্ষার্থীদের হাতে ৩১ কোটি পাঠ্যবই তুলে দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তাব্যক্তিরা।

এনসিটিবি জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রস্তুত করা মোট ১৩৭টি বইয়ের মধ্যে ১৩৩টির পরিমার্জন ও ইনডিজাইন কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পাশাপাশি খেলাধুলা, আমাদের সংস্কৃতি, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস এবং আমার কারিগরি শিক্ষা—এ চারটি নতুন বইয়ের কাজও শুরু হয়েছে, যা প্রথমবারের মতো আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে বই মুদ্রণের টেন্ডার প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যে শুরু করেছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

এনসিটিবি চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কাজ এগিয়ে চলেছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সব কার্যক্রম সম্পন্ন হলে ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো ডিসেম্বরেই প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই নিশ্চিত করা। সে কারণে আমরা নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করছি। ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই বই বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা যাবে বলে আমরা আশাবাদী।

তিনি আরো বলেন, পাঠ্যবই প্রস্তুতকরণে এবার স্বচ্ছতা, গুণগত মান ও সময় ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রয়োজনীয় পর্যালোচনার ভিত্তিতে বইগুলো পরিমার্জন করা হয়েছে।

পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের বিকৃতি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব দূর করার প্রশ্নে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বিশেষভাবে দৃঢ়তা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সাহসের জায়গা হলো বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী একটি নির্মোহ ও সত্য ইতিহাস চান, যেখানে আমাদের কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই। অতীতে যার যতটুকু অবদান, তাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বা কাউকে খাটো করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, এবার তা থেকে আমরা সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসছি। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা—যা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা হয়েছিল, তা পরিমার্জিত পাঠ্যবইয়ে যথাযথভাবে ও সত্যনিষ্ঠভাবে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

এনসিটিবির সচিব শাহ মুহাম্মাদ ফিরোজ আল ফেরদৌস আমার দেশকে বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে এবং এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা সার্বিক সহযোগিতা করছেন। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় সব শ্রেণির শতভাগ পরিমার্জিত বই পৌঁছে দেওয়ার রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি, যাতে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী নতুন বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে।

শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ডিসেম্বরের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে কাজ করছে সরকার, আর নভেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি মনিটর করছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, আর এ কাজ সরাসরি তদারকি করছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে এবং তার দপ্তরের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

এনসিটিবির সচিব জানান, টেন্ডার থেকে শুরু করে সব ধরনের কার্যক্রম নির্ধারিত সময়সূচির চেয়ে এক মাসের বেশি এগিয়ে আছে। অতীতের সব কালিমা মুছে এবার ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই বই সরবরাহ করে রেকর্ড গড়তে চান বলে জানান তিনি।

এদিকে আসন্ন ডিসেম্বরে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩১ কোটি নতুন পাঠ্যবই বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এসব পাঠ্যবইয়ে কোনো ধরনের রাজনীতি বা ইতিহাসের বিকৃতি থাকবে না; মানসম্মত বই আগেভাগে বিতরণের মূল লক্ষ্য হলো, বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা যেন শ্রেণিকক্ষে জ্ঞানার্জনে পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে পারে। কারিকুলামে সামান্য পরিমার্জন আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, ছাপাখানা-সংক্রান্ত সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও সরকার প্রস্তুত।

এনসিটিবি জানায়, বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী ২০৬ থেকে ২২০ দিনের সুনির্দিষ্ট দরপত্র সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী লট বিভাজন ও দরপত্র আহ্বান শুরু হয় গত ৩ জুন, এরপর ২৮ জুন দরপত্র দাখিল ও উন্মুক্তকরণ, ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে মূল্যায়ন, ২৭ আগস্টের মধ্যে অনুমোদন, ৩০ আগস্ট কার্যাদেশ জারি এবং ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হবে। এরপর ২৯ নভেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজ শেষ করে মাঠপর্যায়ে শতভাগ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে কারিগরি স্তর মিলিয়ে মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই মুদ্রণ করা হবে, যাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১,৬৪৩ কোটি টাকা। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জুলাই এনসিটিবি মাধ্যমিক ও কারিগরি স্তরের বই মুদ্রণের মান তদারকিতে পরিদর্শক নিয়োগের দরপত্র বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে।

নতুন চার বইয়ে বিশেষ নজর

গত ১২ জুলাই রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের চারটি নতুন পাঠ্যপুস্তকের কাঠামো চূড়ান্তকরণ কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষাসংক্রান্ত রূপকল্প, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটছে। বইগুলোকে শিক্ষার্থীদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রচলিত পাঠ্যবইয়ে লেখার আধিক্য থাকলেও ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষার বইয়ে ছবি, টেবিল, ডায়াগ্রাম ও ভিজুয়াল উপাদানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, বইয়ের শুরুতে একটি বিস্তারিত ভূমিকা অধ্যায় থাকা প্রয়োজন, যেখানে বইয়ের দার্শনিক ভিত্তি ও বাস্তব প্রয়োগ তুলে ধরা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হচ্ছে, যার মধ্যে চতুর্থ শ্রেণিতে থাকছে ‘খেলাধুলা’ ও ‘আমাদের সংস্কৃতি’ নামে দুটি বই। ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকছে লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস এবং আমার কারিগরি শিক্ষা। ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রমে আরো বিস্তৃত পরিমার্জন আনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রসঙ্গত, বিগত বছরগুলোতে (২০০৯-২০২৫) শতভাগ বই সরবরাহ করতে সাধারণত মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগেছে এনসিটিবির। তবে চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে সংস্থাটি গত পাঁচ বছরের মধ্যে দ্রুততম সময়ে, অর্থাৎ ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই শতভাগ বই সরবরাহ সম্পন্ন করে নতুন রেকর্ড গড়েছিল, যেখানে প্রাথমিক স্তরের শতভাগ বই আগের বছরের ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যেই পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই তুলে দিয়ে আরো দ্রুততম রেকর্ড গড়ার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।

সব মিলিয়ে বই প্রস্তুত, টেন্ডার কার্যক্রম, নতুন বিষয়ভিত্তিক বই প্রণয়ন এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সরাসরি তদারকির মাধ্যমে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে ঘিরে সরকার একটি সময়োপযোগী, পক্ষপাতমুক্ত ও মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে চাইছে, যাতে নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী নির্বিঘ্নে পাঠ গ্রহণে মনোনিবেশ করতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন