সার বিতরণে অনিয়ম ঠেকাতে মাঠে গোয়েন্দারা

সার বিতরণে অনিয়ম ঠেকাতে মাঠে গোয়েন্দারা
ছবি: সংগৃহীত

দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ থামছে না কৃষকদের। কোথাও ডিলারের গুদামে সার না থাকলেও অন্যত্র অতিরিক্ত দামে সেই সার মিলছে। নানা স্থানে সার অবৈধভাবে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির ঘটনাও ধরা পড়ছে। সার বিতরণ ব্যবস্থার অনিয়ম, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার।

সার সংকটের কারণ অনুসন্ধান ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২৫ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং কৃষি মন্ত্রণালয় দুটি কমিটি গঠন করে। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ কমিটি সার বিতরণ ও ডিলার ব্যবস্থাপনা নিয়ে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কমিটি সারা দেশে ডিলারদের বরাদ্দ, উত্তোলন ও বিতরণের তথ্য সংগ্রহ করে অনিয়ম শনাক্তের কাজ করছে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসন, কৃষি বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ কমিটির সদস্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু আমার দেশকে বলেন, সারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে সরেজমিন কাজ করা হচ্ছে। ডিসি, কৃষি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতা বাদ দেওয়ার বিষয়ে আমাদের ভুল একটা ইনফরমেশন গিয়েছিল। এ আশঙ্কাও দূর করা হয়, তাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি বলেন, প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন করে অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে কিছু কিছু ডিলার আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়ায় কোনো কোনো এলাকায় সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠছে। যারা সার সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করছে, তাদের ক্লোজ মনিটরিং করা হচ্ছে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের লাইসেন্স বাতিলসহ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী আরো বলেন, সামনে রবিশস্যের সার অনেক কৃষক মজুত করছেন। বর্তমানে কিছু জায়গায় সার নিয়ে প্যানিক সৃষ্টি হওয়ায় এ সমস্যা হচ্ছে। এসব বিষয় কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের কাছে গিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। আশা করি, দ্রুতই এ সমস্যা কাটিয়ে উঠবে।

সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের বিষয়ে সরকারের অবস্থান কঠোর উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কেউ অনিয়ম করলে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। নানা এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেটদের মাঠে গিয়ে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সার সংকট নিয়ে রাজনৈতিক কারসাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে ত্রাণমন্ত্রী দুলু বলেন, সংকটের বেশিরভাগ অভিযোগ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে আসছে। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে কেউ করছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে বিভিন্ন জেলা থেকে গোয়েন্দা রিপোর্ট আসছে। সেসব রিপোর্ট যাচাই করে দেখা হবে।

সরকারি মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ

সরকারের পর্যাপ্ত মজুতের দাবির বিপরীতে দেশের নানা অঞ্চলে কৃষকদের সার কিনতে ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। ঝিনাইদহে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ দরে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি টিএসপির দাম ২৭ টাকা হলেও বিভিন্ন বাজারে তা ৫০-৫২ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

হরিশঙ্করপুর ইউনিয়নের ডিলার আশরাফুল আলম টিটোর ডিলার পয়েন্টে ক্যাশ মেমো ছাড়াই নির্ধারিত মূল্যের বেশি দরে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সেখানে প্রতি কেজি ইউরিয়া ২৭ টাকার পরিবর্তে ৩২ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকার পরিবর্তে ৫০-৫২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্য একটি দোকানে সরকার নির্ধারিত ২০ টাকার এমওপি বিক্রি হচ্ছে ২৮-৩৫ টাকায়। ২১ টাকা কেজি দরের ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়।

সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের কৃষক গোলাম নবী বলেন, চার বিঘা জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করেছেন। টিএসপি প্রয়োজন হওয়ায় ডিলারের কাছে সরকারি দামে সার চাইলে তাকে বলা হয় সার শেষ। পরে অন্য এক কৃষকের মাধ্যমে একই সার ৫০ টাকা কেজি দরে কিনতে হয়।

শৈলকুপার রাণীনগর গ্রামের কৃষক ইসহাক আলী বলেন, ডিলারের কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও সরকারি দামে সার পাওয়া যায় না। বেশি টাকা দিলে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যায়। কৃষি অফিসে বিষয়টি জানিয়েও কার্যকর প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ তার।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করছে। কয়েকজন ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন জানান, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে।

গুদামে অবৈধ মজুত, বিপুল জব্দ

সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের চিত্র মিলছে প্রশাসনের অভিযানে। গত বৃহস্পতিবার রাজশাহীর দুর্গাপুরে এক বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৬৭০ বস্তা সার জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। বাড়িতে বিপুল সার মজুতের ঘটনায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, অবৈধভাবে সার মজুতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনাজপুরের খানসামায় বৃহস্পতি ও শুক্রবার পৃথক তিনটি অভিযানে অবৈধ ও অনুমোদিত সীমার বাইরে মজুত করা ১,৫৭৭ বস্তা সার জব্দ করেছে প্রশাসন। এসব ঘটনায় দুই ডিলারকে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বরাদ্দ শেষ, মেটেনি কৃষকের চাহিদা

কুড়িগ্রামের রাজারহাটে আমন মৌসুমে সারের চাহিদা ও সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। নাজিমখান ইউনিয়নের এক বিসিআইসি ডিলারের সেপ্টেম্বর মাসের ৪৪ টন ইউরিয়া মাত্র ১০ দিনেই শেষ হয়ে গেছে। একই সময়ে উমর মজিদ ইউনিয়নের এক ডিলারকে বরাদ্দের অতিরিক্ত আরো ১০ টন উপবরাদ্দ দেওয়ার পরও কৃষকদের চাহিদা শেষ হয়নি। ফলে প্রয়োজনের সময়ে সার না পেয়ে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরছেন কৃষকরা। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফেরার অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে দেশে সারের মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক আছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ১১ লাখ ৯৩ হাজার টন সার মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া তিন লাখ ৯৪ হাজার টন, টিএসপি তিন লাখ ৩০ হাজার টন, ডিএপি দুই লাখ ৯৪ হাজার টন এবং এমওপি এক লাখ ৭৫ হাজার টন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সারের মজুত পরিস্থিতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশে মোট মজুত ছিল ১১ লাখ ৯ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এবার মজুত বেড়েছে প্রায় ৯২ হাজার টন।

এদিকে সার বিতরণব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কমিটি। কমিটির সদস্য সম্প্রসারণ অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, সারা দেশের কৃষি বিভাগের উপপরিচালকদের সঙ্গে প্রত্যেক জেলার জন্য একজন করে কর্মকর্তা যুক্ত করে দেওয়া হয়। তারা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন।

তিনি বলেন, ডিলাররা নির্ধারিত সময়ে বরাদ্দ পাওয়া সার উত্তোলন করছেন কি না, উত্তোলনের পর তা যথাযথভাবে বিতরণ করছেন কি না—এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যদি কোনো সমস্যা বা অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

গতকাল শনিবার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, তাই সার নিয়ে কৃষকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে সার মজুতের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। তবে একটি অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশে সার মজুতের চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মাঠের গোয়েন্দা রিপোর্ট, প্রশাসনের সরেজমিন তদারকি, মোবাইল কোর্ট এবং কৃষি বিভাগের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অনিয়মের উৎস চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সার বিতরণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি কিংবা নির্ধারিত মূল্যের বেশি দরে বিক্রির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কৃষকদের ভোগান্তি কমাতে মাঠপর্যায়ে এসব উদ্যোগের দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন