বাংলাদেশ কি স্ক্যামিংয়ের নতুন ঘাঁটি হয়ে উঠছে

বাংলাদেশ কি স্ক্যামিংয়ের নতুন ঘাঁটি হয়ে উঠছে

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে অনলাইন প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের (স্ক্যামিং) বিরুদ্ধে যখন অভিযান জোরদার হচ্ছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক। চট্টগ্রামের খুলশীর একটি ফ্ল্যাটে দেড় মাস ধরে অবস্থান করে তারা অনলাইন প্রতারণা চালাচ্ছিলেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।

প্রশ্ন উঠেছে লাওস, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশে যখন স্ক্যামিংবিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছে, তখন কি সেই চাপের কারণেই তাদের কার্যক্রমের নতুন ঘাঁটি এখন বাংলাদেশে? এসব নাগরিকের বেশিরভাগই লাওস, ভিয়েতনাম, চীনসহ বিভিন্ন দেশের।

বিজ্ঞাপন

পুলিশের ভাষ্য, লাওস, ভিয়েতনাম, নেপাল ও চীনে স্ক্যামিংবিরোধী অভিযান জোরদার হওয়ায় বাংলাদেশকে তারা কার্যক্রমের নতুন ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে বাংলাদেশকে এই চক্রের ‘হেডকোয়ার্টার’হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। তাদের বাংলাদেশে আসার পথ, স্থানীয় সহযোগী, আগের ঠিকানা এবং বিদেশের স্ক্যামিং চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ—সবই খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, লাওস, ভিয়েতনাম, নেপাল ও চীনে স্ক্যামিংয়ের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান চলছে। এ কারণে বাংলাদেশ তাদের প্রধান কার্যক্রমের ঘাঁটি হয়েছে। তারা সবাই এখানে এসে স্ক্যামিং করতে চেয়েছিলেন।

তবে বাংলাদেশকে এই চক্রের ‘হেডকোয়ার্টার’ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি এখনো পুলিশের তদন্তাধীন। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রত্যেকের ভূমিকা এবং তারা স্বেচ্ছায় প্রতারণায় যুক্ত হয়েছিলেন, নাকি কোনো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল—সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

৬৩ বিদেশিকে ঘিরে তদন্তের মধ্যে সামনে এসেছে কক্সবাজারের আরেকটি ঘটনা। এক সপ্তাহ আগেই সেখানকার একটি হোটেল থেকে ১,৯৩৮টি আইফোনসহ ছয় চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তাদের সঙ্গে চট্টগ্রামে আটক ৬৩ জনের যোগসূত্র থাকার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তবে এই তথ্যের বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, কক্সবাজারে গ্রেপ্তার ছয় চীনা নাগরিকের সঙ্গে আটক ৬৩ জনের সংযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

লাওসে স্ক্যামবিরোধী অভিযান

চট্টগ্রামে ৬৩ বিদেশির অবস্থানের পেছনে লাওসের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কোনো প্রভাব ছিল কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশটিতে অনলাইন প্রতারণা, টেলিকম জালিয়াতি ও অবৈধ অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।

লাওসের সরকারি সংবাদ সংস্থা লাওস নিউজ এজেন্সি (কেপিএল) গত ১৮ জুন জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশটিতে ২০টি ইলেকট্রনিক প্রতারণার কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছিল। এ সময় ২,৬৫২ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ১৪ দেশের নাগরিক ছিলেন। দেশটির জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয় তখন হোটেল, গেস্ট হাউস, ভাড়া বাসা ও বিনোদনকেন্দ্রেও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছিল।

লাওশিয়ান টাইমসের ৬ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা ও অবৈধ জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪,৪৮২ জনকে আটক করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, আগস্টের শেষ সপ্তাহেও ভিয়েনতিয়েনে দুটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে ৬৮ জনকে আটক করে লাওসের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় ৩২২টি মোবাইল ফোন, ২৪ ল্যাপটপ, ৪৫ আইপ্যাড ও ৬০ সিমকার্ড জব্দ করা হয়।

ভিয়েতনামেও স্ক্যামিং চক্র

ভিয়েতনামেও অনলাইন প্রতারণা ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী বিশেষ প্রচার ও অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এই কর্মসূচির আওতায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণা ও মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীচক্র শনাক্ত ও ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগেই জুনে ভিয়েতনামের পুলিশ বড় ধরনের একটি স্ক্যাম সেন্টার গড়ে তোলার চেষ্টা ঠেকায়। তারা হ্যানয়, লাও কাই ও ফু থোতে রিসোর্ট, ফার্মস্টে ও ভিলা ভাড়া করে কয়েক ডজন মানুষকে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাদের অনেকেই এর আগে কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করেছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া যায়। সেখান থেকে কম্পিউটার, শত শত মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সরঞ্জামও জব্দ করে পুলিশ।

বাংলাদেশ কেন?

লাওস ও ভিয়েতনামের সাম্প্রতিক অভিযানের সঙ্গে চট্টগ্রামে আটক ৬৩ বিদেশির অবস্থানের সরাসরি কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এখন সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা এর আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাড়া বাসায় থেকেছেন। অর্থাৎ খুলশীর ফ্ল্যাটটি তাদের প্রথম বা একমাত্র ঠিকানা নয়।

এই তথ্য সামনে আসার পর পুলিশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে— তারা কখন বাংলাদেশে এসেছেন, কে তাদের এনেছেন, কোন ভিসায় এসেছেন। কারা তাদের বাসা ভাড়া করে দিয়েছেন, আগের ঠিকানাগুলো কোথায় এবং লাওস বা ভিয়েতনামে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. শামীম হোসে আমার দেশকে বলেন, এতসংখ্যক বিদেশি একটি আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান করলে তাদের বাসা, ইন্টারনেট, যোগাযোগ, যাতায়াত, খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতা প্রয়োজন হওয়ার কথা। কারা এসব সহায়তা দিয়েছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

১৯১ ডিভাইসে মিলতে পারে ক্লু

খুলশীর ফ্ল্যাট থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন ও ৫৭টি ল্যাপটপসহ মোট ১৯১টি ব্যবহৃত ডিভাইস জব্দ করেছে পুলিশ। এর সঙ্গে রয়েছে একটি ট্যাব, সিপিইউ, মনিটর, প্রিন্টার, পেনড্রাইভ ও চারটি সিমকার্ড।

পুলিশ বলছে, এসব ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। কোন ডিভাইস কে ব্যবহার করতেন, কোন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা হয়েছে, কোন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায় কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।

চট্টগ্রামের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ সাইবার এক্সপ্রেসের প্রধান নির্বাহী রিদুয়ান হৃদয়ের মতে, এসব ডিভাইসের তথ্যই হয়তো বলে দিতে পারে, খুলশীর ফ্ল্যাটটি কেবল একটি স্থানীয় অপারেশন ছিল, নাকি এর সঙ্গে লাওস, ভিয়েতনাম, চীন, পাকিস্তানসহ অন্য দেশের পুরোনো যোগাযোগ ছিল।

বিশেষ করে লাওসে যখন চলতি বছর হাজার হাজার সন্দেহভাজনকে আটক করে ধারাবাহিক অভিযান চলছে। ভিয়েতনামও জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনলাইন প্রতারণা ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবপাচারের বিরুদ্ধে বিশেষ কর্মসূচি নিয়েছে। তখন চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশির আগের চলাচল ও যোগাযোগের তথ্য তদন্তে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

খোঁজ নেপথ্যের নেটওয়ার্কের

পুলিশের মামলায় ৬৩ বিদেশির বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সংঘবদ্ধ আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং অননুমোদিত ই-ট্রানজেকশনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, তাদের দেশীয় সহযোগীদের শনাক্ত করা হয়েছে। কয়েকজন এখনো পলাতক বলেও জানানো হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, দেশীয় যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। আরো ভেতরে যেতে চান তারা। এরপর তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন শুধু ৬৩ বিদেশি কী করছিলেন—তা নয়; বরং তাদের বাংলাদেশে কে এনেছিল। কোথায় কোথায় তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত, কারা স্থানীয়ভাবে সহায়তা করেছে। লাওস-ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের স্ক্যামিং চক্রের সঙ্গে তাদের পুরোনো কোনো যোগাযোগ ছিল কি না।

খুলশীর ফ্ল্যাট থেকে জব্দ করা ১৯১টি ডিভাইসের ফরেনসিক তথ্য এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের চলাচল ও যোগাযোগের তথ্যই হয়তো সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন