ভোলার লালমোহন ইসলামিয়া কামিল মাদরাসায় সেলিম রেজা ও নূর মোহাম্মদ নামে দুই শিক্ষকের অস্তিত্ব নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দুই যুগ ধরে মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কেউই তাদের নিয়মিত দেখেননি; এমনকি নিয়োগ বোর্ডের সদস্যদেরও তারা চেনেন না। মাদরাসার হাজিরা খাতা, ক্লাস রুটিন ও পাঠদান কার্যক্রমেও নেই তাদের নাম। অথচ তারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে হয়েছেন এমপিওভুক্ত ।
শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, অনিয়ম, জালিয়াতি ও ঘুসবাণিজ্যের মাধ্যমে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মাদরাসার অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন। আরো অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবেই অধ্যক্ষের প্রভাব ছিল। এছাড়া গণজাগরণ মঞ্চেও ছিল তার বিশেষ ভূমিকা।
এদিকে তাদের নিয়োগ-সংক্রান্ত রেজুলেশন, নিয়োগপত্র ও যোগদানপত্রের কপিও মাদরাসায় পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক-কর্মচারী ও অভিভাবকদের প্রতিবাদের পর জেলা প্রশাসনের তদন্তেও অভিযোগগুলোর সত্যতা উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
শিক্ষক, কর্মচারী, কমিটি, অভিভাবকদের অভিযোগ এবং জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে তদন্ত রিপোর্টসহ সরেজমিনে জানা যায়, ভোলার লালমোহন উপজেলার ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মোশারফ হোসেন তৎকালীন আওয়ামী সংসদ সদস্য নূর নবী চৌধুরী শাওনের আস্থাভাজন লোক। এ সুবাদে মাদরাসার গভর্নিং বডির সভাপতি তৎকালীন ইউএনও এবং সাবেক অধ্যক্ষের স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতি করে হাদিস বিভাগে দুজন প্রভাষক নিয়োগ দিয়েছেন।
২০০৩ সালে নিয়োগ দিয়েছেন সেলিম রেজাকে এবং ২০০৭ সালে নিয়োগ দিয়েছেন নুর মোহাম্মদকে। যোগদানের তারিখ দেখানো হয়েছে ২০০৩ সালের ১ জানুয়ারি ও ২০০৭-এর ১ নভেম্বর। প্রায় দুই যুগ আগে নিয়োগ দিলেও তারা এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন ২০২৪ সালে। এমপিওভুক্তির পর জানা যায় তারা এই মাদরাসার শিক্ষক। তাদের ইনডেক্স নং সেলিম রেজা গ০০৬২৬৫২ ও নুর মোহাম্মদ গ০০৬২৬৫১। অবশ্য চাপের মুখে এবং তদন্ত রিপোর্টের আলোকে বর্তমানে তাদের বেতন-ভাতা উত্তোলন বন্ধ রয়েছে।
২০২৫ সালে দুই দফা এবং চলতি বছরের জুলাইয়ে ২৯ শিক্ষক-কর্মচারী, অভিভাবক ভিন্ন ভিন্নভাবে এ নিয়ে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে লালমোহন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ আজিজের পক্ষ থেকে তদন্ত করেন লালমোহন সরকারি কলেজের প্রভাষক মো. মুসা।
তদন্ত রিপোর্টে তিনি উল্লেখ করেন, ২৯ শিক্ষক-কর্মচারী একত্রিত হয়ে যে অভিযোগ দিয়েছেন, তার সত্যতা পাওয়া গেছে। যে দুজন শিক্ষকের নিয়োগের বিষয়ে তদন্ত করেছি, তারা কোনো মূল কপি দেখাতে পারেননি। ফটোকপি দেখিয়েছেন, যার সত্যতা মেলেনি ।
অপরদিকে দীর্ঘ দুই যুগেও তারা প্রতিষ্ঠানের কোনো কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন না এবং কোনো শিক্ষক তাদের কোনোদিন প্রতিষ্ঠানে দেখেননি। আমি বাস্তবে যা পেয়েছি, তা-ই রিপোর্ট দিয়েছি।
তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত বক্তব্যে মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৮ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত সেলিম রেজা ও নূর মোহাম্মদ নামে আরবি প্রভাষক পদে কোনো শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। এটি সম্পূর্ণ জাল-জালিয়াতি।
প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক সদস্য নাজিম উদ্দিনসহ একাধিক শিক্ষক জানান, বর্তমান অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন তৎকালীন সংসদ সদস্য নূর নবী চৌধুরী শাওনের ঘনিষ্ঠজন এবং গণজাগরণ মঞ্চের সম্মুখ সারির নেতা ছিলেন। যার প্রভাবে সম্পূর্ণ অন্যায় ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ওই দুজন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইতঃপূর্বেও তিনি মাদরাসা অধিদপ্তরের আব্দুল লতিফের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে জাকির হোসেন নামে একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিলেন, যা ২০২১ সালের ৩ আগস্টে ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় বেতন-ভাতা বাতিল করা হয়।
এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, মাদরাসার বর্তমান অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন আমার কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে নিয়োগ দিয়েছেন; এখন আর খোঁজ-খবর নিচ্ছেন না। অপর শিক্ষক নূর মোহাম্মদ সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে আর কথা বলতে রাজি হননি।
মাদরাসার অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন আমার দেশকে জানান, আমি কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে সরাসরি বা ফোনে কথা বলি না। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে, তা তদন্তে যা হয় হবে।
এ বিষয়ে মাদরাসার গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক ইকবাল হোসেন আমার দেশকে বলেন, দুজন শিক্ষক নিয়োগে জাল-জালিয়াতির সব অভিযোগেরই সত্যতা পাওয়া গেছে। তারা কোনোদিনই এ প্রতিষ্ঠানে আসেননি। কেউ তাদের দেখেননি এবং তৎকালীন তাদের নিয়োগ কমিটির কাউকেই তারা চেনেন না। এমনকি তৎকালীন সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকেও তারা চেনেন না। এ ব্যাপারে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান অধ্যক্ষ আওয়ামী রাজনীতি ও গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

