পড়াশোনা ও সহশিক্ষায় জোর দিয়েও কেন পিছিয়ে পড়ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা

পড়াশোনা ও সহশিক্ষায় জোর দিয়েও কেন পিছিয়ে পড়ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা

সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানো, ভালো ফল করানো, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো কিংবা খেলাধুলা ও অন্যান্য কার্যক্রমে এগিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু মৌলিক দক্ষতা শেখানোর বিষয়টি উপেক্ষা করছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সে পৌঁছেও অনেক তরুণ রান্না করা, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার রাখা, বাজার করা কিংবা নিজের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার মতো সাধারণ কাজে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারছে না। দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত মেলিসা স্ক্যালানের প্রতিবেদনে এমন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

স্ক্যালান নিয়মিত ষষ্ঠ ফর্মের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তার অভিজ্ঞতায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া অনেক শিক্ষার্থীর কাছে পড়াশোনা বা আবাসনের চেয়ে দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার বিষয়টিই বেশি উদ্বেগের। তারা কীভাবে রান্না করবে, কাপড় ধোবে, বাজার করবে কিংবা পড়াশোনা, সামাজিক জীবন ও নিজের যত্ন—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে।

বিজ্ঞাপন

সমস্যাটি কেবল শিক্ষার্থীদের অদক্ষতা নয়; এর পেছনে রয়েছে অভিভাবকত্বের একটি পরিবর্তিত ধরন। সন্তানদের একাডেমিক সাফল্য, পরীক্ষার ফল, খেলাধুলা ও বিভিন্ন অতিরিক্ত কার্যক্রমে সফল করার জন্য পরিবারগুলো প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় করে। কিন্তু ঘরের ছোটখাটো কাজ শেখানোর বিষয়টি অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় না। ফলে সন্তানেরা এমন বয়সে পৌঁছে যায়, যখন তাদের স্বাধীনভাবে থাকার কথা, অথচ নিজেদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর মৌলিক দক্ষতাই পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কিংবা কাপড় ধোয়া নিছক গৃহস্থালির কাজ নয়—এগুলো আত্মনির্ভরতার অংশ। একজন তরুণ যখন প্রথমবার পরিবারের বাইরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা অন্য কোথাও বসবাস শুরু করে, তখন নিজের খাবার তৈরি করা, কাপড় পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা এবং নিজের বাসস্থান গোছানো তার দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে। এসব দক্ষতার অভাব তাই শুধু অসুবিধা নয়, মানসিক চাপ ও উদ্বেগেরও কারণ হতে পারে।

এসব দক্ষতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার ঠিক আগে কয়েক সপ্তাহে শেখানোর বিষয় নয়। শৈশব ও কৈশোর থেকেই ধীরে ধীরে সন্তানকে নিজের কাজ নিজে করার সুযোগ দেওয়া উচিত। বয়স অনুযায়ী ঘরের কাজে অংশ নেওয়া, নিজের কাপড় গোছানো, সহজ খাবার তৈরি করা, বাজারের তালিকা তৈরি করা কিংবা নিজের ঘর পরিষ্কার করার মতো কাজের মাধ্যমে আত্মনির্ভরতা তৈরি হতে পারে।

একজন অভিভাবকের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠীদের সহযোগিতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছিল। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, ঘাটতি থাকলেও তরুণরা শেখার সক্ষমতা রাখে। তবে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুটা তাদের জন্য অনেক সহজ হতে পারে।

সন্তানের ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি মানেই শুধু ভালো ফল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কিংবা কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা নয়। একজন তরুণকে নিজের জীবন নিজে পরিচালনা করার সক্ষমতাও অর্জন করতে হয়। একাডেমিক যোগ্যতার পাশাপাশি রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কাপড় ধোয়া, বাজার করা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং নিজের যত্ন নেওয়ার মতো ব্যবহারিক দক্ষতাও তার স্বাধীন জীবনের ভিত্তি।

অভিভাবকদের জন্য তাই বার্তাটি স্পষ্ট—সন্তানের হয়ে সব কাজ করে দেওয়া ভালোবাসার প্রকাশ হতে পারে, কিন্তু সবসময় তা তাকে আত্মনির্ভর করে না। বরং বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া এবং ভুল করতে ও শিখতে সুযোগ দেওয়াই ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য বেশি কার্যকর প্রস্তুতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্তে নয়, কৈশোর থেকেই এই জীবনদক্ষতার শিক্ষা শুরু হওয়া উচিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন