যুক্তরাজ্যে কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি

যুক্তরাজ্যে কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি

যুক্তরাজ্যে কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার সংকট মোকাবিলায় নারীদের কারাগারে পাঠানোর প্রবণতা কমানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু কারাগারে নতুন জায়গা তৈরি করা বা নারী কারাগারের কিছু অংশ পুরুষ বন্দিদের জন্য ব্যবহার করা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং অপরাধের মূল কারণ মোকাবিলা করে নারীদের কারাগারে যাওয়া ঠেকানো এবং মুক্তির পর তাদের সমাজে পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ভিকটিমস কমিশনার ক্লেয়ার ওয়াক্সম্যান কারাগার সংকটের সঙ্গে আদালতের দীর্ঘসূত্রতার সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। তার মতে, অনেক বন্দি এখন বিচার শুরুর অপেক্ষায় কারাগারে রয়েছেন। প্রায় প্রতি পাঁচজন বন্দির একজন বিচার শুরুর অপেক্ষায় আছেন। মামলার শুনানি দীর্ঘায়িত হওয়ায় কেউ কেউ এত দীর্ঘ সময় রিমান্ডে থাকছেন যে সাজা ঘোষণার সময় পর্যন্ত তারা কার্যত নিজেদের সম্ভাব্য সাজা ভোগ করে ফেলছেন। এতে ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার এবং জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নারীদের জন্য পৃথক সহায়তাকেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন হলওয়ে উইমেনস বিল্ডিং কালেকটিভের পলি ক্রিড। তার মতে, নারী কেন্দ্র এমন একটি জায়গা হতে পারে, যেখানে একই ছাদের নিচে আবাসন, পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলা, কর্মসংস্থান, শিশুযত্ন ও মানসিক সহায়তার মতো বিভিন্ন সেবা দেওয়া হবে। অর্থাৎ নারীর জীবনের একটি মাত্র সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে তার সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হবে। লেখায় উইমেন ইন প্রিজনের একটি হিসাবের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নারী কেন্দ্রে প্রতি ১ পাউন্ড বিনিয়োগে ২.৭৫ পাউন্ড সাশ্রয় হতে পারে।

ক্রিডের মতে, নারী কেন্দ্র শুধু কারাগারে নারীর সংখ্যা কমাতে সাহায্য করে না; শিশুদের রাষ্ট্রীয় পরিচর্যায় যাওয়ার ঝুঁকিও কমাতে পারে এবং জরুরি সেবার ওপর চাপ কমায়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনের সাবেক হলওয়ে কারাগারের জায়গায় এমন একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। সেখানে নির্মাণকাজ শুরু হলেও অর্থায়ন এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।

নারী কারাগার থেকে মুক্তির পরের পরিস্থিতিও বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেছেন ন্যাক্রোর প্রধান নির্বাহী এনভার সলোমন। তার মতে, কারাগার থেকে বের হওয়ার পর নারীদের মধ্যে গৃহহীনতার ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় বেশি। অনেক নারী আবার সন্তানদের কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এসব সামাজিক ও পারিবারিক চাপের কারণে তাদের পুনরায় কারাগারে ফেরার ঝুঁকিও বাড়ে। ন্যাক্রোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে কমিউনিটিতে মুক্তির পর তত্ত্বাবধানে থাকা প্রতি চারজন নারীর মধ্যে একজনকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে; পুরুষদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ছিল প্রতি পাঁচজনে একজন।

সলোমনের মতে, সব ক্ষেত্রে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর প্রয়োজন ছিল এমন নয়। জননিরাপত্তার জন্য কিছু ক্ষেত্রে তা প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে যথাযথ কমিউনিটি সহায়তা দেওয়া গেলে নারীদের কারাগারে ফেরত পাঠানো এড়ানো সম্ভব। তাই সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদে নারী বন্দির সংখ্যা কমাতে চায়, তাহলে কারাগার থেকে মুক্তির পর নারীরা যাতে আবার অপরাধে না জড়ান এবং সমাজে টিকে থাকতে পারেন, সেই সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।

ব্রিস্টলের পরীক্ষামূলক নারী আদালতের উদ্যোগটিকেও লেখায় সম্ভাবনাময় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই আদালত শুধু অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে অপরাধের পেছনে থাকা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে। পারিবারিক সহিংসতা, মাদকাসক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও গৃহহীনতার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ট্রমা-সচেতন ও সমস্যা-সমাধানমূলক পদ্ধতিতে বিচার পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অপরাধের জন্য নারীদের জবাবদিহির আওতাতেও রাখা হচ্ছে।

এই ধরনের পদ্ধতি স্বল্পমেয়াদি কারাদণ্ড, মুক্তি এবং পুনরায় অপরাধের চক্রের তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ কারাগারে যাওয়া নারীদের অনেকেই মা বা পরিবারের প্রধান পরিচর্যাকারী। তাদের কারাবাস শুধু তাদের নিজেদের জীবন নয়, সন্তান ও পরিবারের জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলে। তাই নারীদের ক্ষেত্রে অপরাধ দমনের পাশাপাশি পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর কারাবাসের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সফল কারা-নীতির মাপকাঠি শুধু আরো কতগুলো কারাকক্ষ তৈরি করা হয়েছে, তা হওয়া উচিত নয়। বরং কতটা কার্যকরভাবে কারাগারে যাওয়ার প্রয়োজন কমানো গেছে, অপরাধের মূল কারণ মোকাবিলা করা গেছে এবং মুক্তির পর মানুষকে পুনরায় সমাজে ফিরিয়ে আনা গেছে—সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড। নারী বন্দিদের ক্ষেত্রে এই নীতি আরো গুরুত্বপূর্ণ বলে লেখাটিতে মত দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন