ভারত থেকে ইলিশ আমদানি কেন

ভারত থেকে ইলিশ আমদানি কেন
ফাইল ছবি

পত্রিকার খবর, ভারত থেকে ইলিশ বাংলাদেশে আসছে। এ খবর বাংলাদেশের প্রায় সব দৈনিক, বিবিসিসহ অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। সারমর্ম হচ্ছে, গত দুই মাসে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে আরো ১৫০ থেকে ২০০ টন আসার কথা রয়েছে। ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া এই ইলিশের প্রায় পুরোটাই গুজরাট থেকে আসছে। এই খবরের মূল সূত্র হচ্ছে হাওড়া হোলসেল ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ। বিবিসির খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের বেনাপোল বন্দর দিয়ে গত দুই মাসে প্রায় ৭ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৩ লাখ কেজির (৩৫০ টন) বেশি ইলিশ বাংলাদেশে আমদানি করেছে ১৯টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।

বিজ্ঞাপন

এই আমদানির অনুমতি কীভাবে দেওয়া হলো, এমন কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়েছে কি না, পত্রপত্রিকার খবরে জানা যায়নি। তবে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুল মামুন বিবিসিকে বলছেন, মৎস্য অধিদপ্তর থেকে যথাযথ অনুমতি নিয়েই কিছু প্রতিষ্ঠান ইলিশ আমদানি করছে; কিন্তু কেন এই আমদানি করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। অন্যদিকে, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তারা সীমিত পরিসরে ইলিশ আমদানির কিছু অনুমতি দিয়েছেন।

ইলিশ আহরণে ঘাটতি হচ্ছে বলে অনেক খবর প্রচারিত হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে, বিশেষ করে ২০২৪-২৫ সালে ইলিশ আহরণ কম হতে দেখা যায়। এর আগে ২০২০-২১ সালে ইলিশের আহরণ অনেক ভালো ছিল, প্রায় ৫৬৫,১৮৩ টন। কিন্তু এরপর থেকে ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেতে শুরু করেছে; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আহরণ ছিল ৫১২,৮৫৮ টন। এ বছর আহরণ কত হয়েছে, তা এখনো জানা না গেলেও মৎস্যজীবী ও যারা মাছ ধরতে গেছেন, তারা ভালো খবর দিতে পারেননি।

সাগর ও নদীতে ইলিশের আহরণ হ্রাস হঠাৎ করে ঘটেনি। এর পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে ইলিশের প্রাপ্যতা, মূল্য ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু তথ্য উপস্থাপন করেছিল। বলা হয়েছিল, ইলিশের টেকসই আহরণ নিশ্চিত করতে প্রাকৃতিক মাইগ্রেশন রুটগুলো, যেমন মেঘনাÑতেঁতুলিয়া মোহনা, অক্ষুণ্ণ রাখা অত্যন্ত জরুরি। ভোলা-নোয়াখালী ও ভোলা-পটুয়াখালীর মধ্যবর্তী মোহনা ইলিশের বৃহত্তম প্রজনন এবং মাইগ্রেশন পথ হিসেবে বিবেচিত। তবে এই মোহনায় অসংখ্য চর ও ডুবোচর রয়েছে, যেগুলোর অনেকের বয়স ২০-৩০ বছর। জোয়ারের সময় এগুলো চার-পাঁচ হাত পানির নিচে থাকে এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে, যা নদীর নাব্য ও প্রজনন পরিবেশের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। ডুবোচরে পলি জমার কারণে নদীর গভীরতা নদীর গভীরতা ০.৫ থেকে ৭৫ ফুট (MSL) পর্যন্ত পরিবর্তনশীল হয়ে থাকে, যা নদীর নাব্য সংকটের স্পষ্ট প্রমাণ।

দেশের ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার পেছনে শুধু প্রাকৃতিক নয়, মানবসৃষ্ট কারণও অনেক বেশি দায়ী। ইলিশ আহরণের অন্যতম প্রধান বাধা হচ্ছে অবৈধ জাল এবং স্থায়ী ফাঁদ জালের ব্যবহার। অবৈধ জালের মধ্যে কারেন্ট জাল (ফিক্সড ইনজিন), মশারি জাল, ফিক্সড ইঞ্জিন/ফাঁদ জাল ইত্যাদির ব্যবহার বেড়েছে/ যার ফলে বিপুল পরিমাণ জাটকা ধরা হচ্ছে। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী কারেন্ট জাল ও ফিক্সড ইঞ্জিন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এই আইন প্রয়োগে জেলা প্রশাসন, মৎস্য দপ্তর, নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ড যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ জাল ও জাটকা জব্দ করছে। তবু সম্পূর্ণভাবে অবৈধ আহরণ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি জাল, বেহুন্দি জাল, ট্রলারে সোনারের ব্যবহার, ট্রল ডোর ইলিশসহ সব মাছের পোনাসহ ধ্বংস হচ্ছে। তাছাড়া নদীতে অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণ, বাঁধ ও কালভার্ট নির্মাণ ইলিশের পরিভ্রমণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে শিল্প-কারখানার বর্জ্য অবাধে পড়ছে এবং শীতলক্ষাসহ মেঘনা নদী দূষণ করছে। ফলে ইলিশের খাদ্যপ্রাপ্তিতে সমস্যা হচ্ছে। তবে এসব সমস্যা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়। এটিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বিশেষ করে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়Ñএমনকি বিদ্যুৎ, জ্বালানিবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ যারা জড়িত, ইলিশ রক্ষার জন্য জাতীয় আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করার প্রয়োজন হতে পারে।

ডেইলি স্টার (১৪ সেপ্টেম্বর) একটি প্রতিবেদনে ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার পেছনে শিল্পবর্জ্য এবং প্লাস্টিকদূষণের কথা উল্লেখ করেছে। তাছাড়া পটুয়াখালী এবং বরগুনায় স্থাপিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ইলিশের প্রজনন এবং বৃদ্ধিতে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করছে। দেশের অন্যতম বৃহত্তম ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আন্ধারমানিক নদীতে ইলিশের প্রজননক্ষেত্র এবং প্ল্যাঙ্কটনসমৃদ্ধ পানি দূষিত হওয়ার কারণে প্রায় ৪৫ শতাংশ আহরণ কমেছে।

তবে ইলিশ আহরণ কম হলেও কমপক্ষে পাঁচ লাখ টন হতে পারে বলে মনে করছেন ইলিশের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা। সেখানে ভারত থেকে ৫০০ বা ৭০০ টন ইলিশ এনে কী ঘাটতি মেটানো হবে, নাকি এই আমদানিকে কেন্দ্র করে নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি হবে, সেটাই দেখার বিষয় নীতিনির্ধারকদের।

বিশ্বের মাত্র ১১টি দেশে ইলিশ পাওয়া যায়, যার মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে। এখানে ইলিশ পুরো মৎস্য খাতের একটি বড় জায়গাজুড়ে আছে। ইলিশ (Tenualosa ilishia) প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া মাছ, যার কোনো উৎপাদন করতে হয় না, শুধু ব্যবস্থাপনা করতে হয়। ইলিশ মাছ স্বাদের জন্যই বেশি সমাদৃত, তবে এর পুষ্টিগুণও কম নয়। উচ্চমাত্রায় আমিষ, চর্বি ও খনিজ পদার্থ পাওয়া যায়। কাজেই পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ইলিশের মূল্য আছে। ইলিশকে জাতীয় মাছ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তার মূল কারণ এর অর্থনৈতিক অবদান। এককভাবে ইলিশ জিডিপিতে ১ শতাংশ অবদান রাখে। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবেও এর স্বীকৃতি মিলেছে। উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছের অবদান হচ্ছে ৪২ শতাংশ; তার মধ্যে প্রায় ১২ শতাংশ ইলিশ থেকে আসে। ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয় এবং ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। পাঁচ লাখ জেলে সরাসরি এবং ২০-২৫ লাখ মানুষ ইলিশ সম্পদের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত আছেন।

ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে ইলিশ পাওয়া গেলেও স্বাদের দিক থেকে ইলিশের জন্য বেশি বিখ্যাত হয়ে গেছে পদ্মার ইলিশ, যমুনার ইলিশ, মেঘনার ইলিশ। ইলিশ মাছের স্বাদ এসব নদীর মাছেই বেশি। ইলিশ মাছের মূল খাদ্য শৈবাল, বালি এবং ধ্বংসাবশেষসহ ২৭ প্রজাতির উদ্ভিদকণা এবং ১২ প্রজাতির প্রাণীকণা রয়েছে। এগুলো প্রাকৃতিক উৎস থেকে আসে এবং আমাদের পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় এর প্রাপ্যতা বেশি। ভারতের গুজরাটের ইলিশের স্বাদ কখনোই বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা-যমুনার ইলিশের স্বাদের মতো হবে না। এমনকি গঙ্গার ইলিশের স্বাদও এর ধারে-কাছে নয়। সে কারণে দেখা যায়, প্রতিবছর পূজার সময় পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের ইলিশ নেওয়ার জন্য ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করে দেন।

এই প্রথম বাংলাদেশে ইলিশ আমদানি করা হচ্ছে, এটা শুধু আমাদের ব্যর্থতা নয়, লজ্জার বিষয়। অথচ এ বিষয়টি ঘটাচ্ছেন দুই দেশের ব্যবসায়ীরা। তারা দেশের মানুষের ইলিশ খাওয়ার সমস্যা মেটানোর চেয়ে নিজেদের ব্যবসা ও মুনাফার দিকটিই বেশি বিবেচনায় রেখেছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। তারা একসময় দেশের ইলিশ বিদেশে রপ্তানির জন্য তোড়জোড় করেন, অন্য সময় আহরণের ঘাটতির কথা বলে আমদানি করার জন্য মরিয়া হয়ে যান। এটা শুভ লক্ষণ নয়। ইলিশের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাছের ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানি উভয়ের ক্ষেত্রেই জাতীয় নীতি মেনে চলতে হবে। কিছু ব্যবসায়ীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুমোদন দেওয়ার বিষয় নয়। দেশে কত ঘাটতি হলে আমদানি করা যাবে, সে বিষয়ে কি কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে? মাত্র ৫০০ বা ৭০০ টন ইলিশ দিয়ে ঘাটতি মিটবে না, কিন্তু একটি অশুভ ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে, যা আমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।

বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০১২ সালের ৩১ জুলাই থেকে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে স্বল্প পরিসরে, শর্তসাপেক্ষে ভারতে ইলিশ রপ্তানি শুরু হয়, যা শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পন্ন হচ্ছিল এবং এটি তৎকালীন সরকারের বিশেষ ‘উপহার’ হিসেবে দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু ইলিশের প্রাপ্যতা কম থাকায় অনুমোদিত পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি করতে রপ্তানিকারকরা সবসময় সক্ষম হননি। যেমন ২০২৫ সালের দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ১,২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৬ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে মাত্র প্রায় ৮২ টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। অর্থাৎ অনুমোদন এবং প্রকৃত রপ্তানি এক না হলেও এর বিরূপ প্রভাব কিন্তু থেকেই যায়। বাংলাদেশে ইলিশের দাম বেশি হলে ব্যবসায়ীরা বিদেশে রপ্তানি করে লাভবান হচ্ছেন না।

তাই বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নয়, ব্যবসায়ীদেরও নয়। দেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিচয়বহনকারী পণ্যের উৎপাদন ও আহরণের চিহ্নিত সমস্যা দূর করার জন্য জাতীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। আমার বিশ্বাস, এসব সমস্যা দূর করতে পারলে ইলিশ আবার স্বগৌরবে ফিরে আসবে বাংলাদেশের মানুষের পাতে।

[এই লেখায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।]

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...