চিকিৎসার মানচিত্রে অন্ধকারে উপজেলা

চিকিৎসার মানচিত্রে অন্ধকারে উপজেলা
আমার দেশ গ্রাফিক্স

হাসপাতাল আছে, চিকিৎসার সরঞ্জামও আছে, কিন্তু চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর বড় অংশের চিত্র এখন এমনই। ৪৯২টি কমপ্লেক্সে অনুমোদিত ১৬ হাজার ৭৮৪টি চিকিৎসক পদের অর্ধেকের বেশি শূন্য। এর মধ্যে ১০০টির বেশি কেন্দ্রে সংকট চরমে। কোথাও চিকিৎসক ঘাটতি ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

সার্জারি, গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞের অভাবে ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ৩৪৪টিতে বন্ধ রয়েছে অস্ত্রোপচার। অনেক কেন্দ্রে অব্যবহৃত পড়ে আছে অপারেশন থিয়েটার। এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজির মতো পরীক্ষার সুবিধাও নেই বহু হাসপাতালে। ফলে সাধারণ চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও রোগীদের ছুটতে হচ্ছে জেলা সদর কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে। এতে বাড়ছে চিকিৎসাব্যয় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বিজ্ঞাপন

এমন সংকটের মধ্যেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮,৫৬১ জন চিকিৎসক বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৪৫ জনের কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্ব নেই। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনুমোদিত ৬৯ হাজারের বেশি জনবল পদের প্রায় ২৫ হাজার শূন্য। চিকিৎসকসংকট মোকাবিলায় সরকার পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চিকিৎসক নিয়োগ বা অবকাঠামো সম্প্রসারণ নয়, মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামও নিশ্চিত করতে হবে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালে ৮৮ হাজার ৯০০ চিকিৎসক প্রয়োজন। এসব জায়গায় কর্মরত আছেন ৩০ হাজার ৩১১ জন; ঘাটতি ৫৮ হাজার ৫৮৯ জনের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ৪৯২টি উপজেলায় চিকিৎসকের ৮,৪৫২টি পদ শূন্য ছিল। খুলনা বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংকট তীব্র। অধিদপ্তরের হিসাবে, ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ৩৪৪টিতে অস্ত্রোপচার বন্ধ। ১০১টিতে এক্স-রে, প্রায় ২০০টিতে আলট্রাসনোগ্রাম এবং ৭৫টিতে ইসিজি সেবা চালু নেই। ৪০০টির বেশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট রয়েছেন মাত্র ১৪২ জন। ফলে অস্ত্রোপচারের অবকাঠামো থাকলেও বিশেষজ্ঞের অভাবে সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় দামি যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। বিভাগভিত্তিক শূন্য পদের চিত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন বিভাগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো চিকিৎসকসহ নানা ধরনের জনবল সংকটে রয়েছে। এর মধ্যেÑ

ঢাকা বিভাগ : ফরিদপুরের আলফাডাঙায় ৩৭টি পদের মধ্যে ২৪টি শূন্য; সালথায় ৩০টির মধ্যে ১৯টি, চরভদ্রাসনে ৩৫টির মধ্যে ২১টি, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ৩৮টির মধ্যে ২৪টি; ইটনায় ৩২টির মধ্যে ১৯টি, বাজিতপুরে ৩৪টির মধ্যে ২০টি, রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে ৩৮টির মধ্যে ২১টি; শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ২৮টির মধ্যে ১৫টি, জাজিরায় ৩৫টির মধ্যে ১৮টি, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ৭৩টির মধ্যে ৫৭টি, টুঙ্গিপাড়ায় ৬৮টির মধ্যে ৪৭টি, টাঙ্গাইলের গোপালপুরে ৩৯টির মধ্যে ২০টি এবং মাদারীপুরের রাজৈরে ৩৯টির মধ্যে ১৭টি পদ শূন্য।

বরিশাল বিভাগ : বরগুনার বামনায় ৩৫টি পদের মধ্যে ২৯টি শূন্য; বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে ৪৭টির মধ্যে ৩৯টি; ভোলার তজুমদ্দিনে ২৮টির মধ্যে ২২টি, পিরোজপুরের কাউখালীতে ২৫টির মধ্যে ১৭টি, ইন্দুরকানীতে ২৩টির মধ্যে ১৬টি, পটুয়াখালীর দশমিনায় ৩৬টির মধ্যে ২৬টি, গলাচিপায় ৪৭টির মধ্যে ৩৪টি এবং ঝালকাঠির রাজাপুরে ৩৮টির মধ্যে ২৯টি পদ শূন্য।

চট্টগ্রাম বিভাগ : বান্দরবানের রুমায় আটটি পদের মধ্যে চারটি শূন্য; থানচিতে ২২টির মধ্যে ১৪টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ২৪টির মধ্যে ১৪টি; রাঙামাটির জুরাছড়িতে ২৪টির মধ্যে ১৮টি, বরকলে ২৫টির মধ্যে ১৬টি, লংগদুতে ২৭টির মধ্যে ২০টি, বাঘাইছড়িতে ২৭টির মধ্যে ১৫টি, নানিয়ারচরে ২৪টির মধ্যে ১৫টি এবং বিলাইছড়িতে ২৬টির মধ্যে ১৪টি; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে ৩২টির মধ্যে ১৯টি, কক্সবাজারের উখিয়ায় ৩৬টির মধ্যে ১৯টি, কুতুবদিয়ায় ৩৫টির মধ্যে ২৪টি এবং নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ৩৮টির মধ্যে ২০টি পদ খালি। খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও গুইমারাতেও তীব্র সংকট রয়েছে।

খুলনা বিভাগ : কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ৩০টি পদের মধ্যে ২২টি শূন্য। মিরপুরে ৪২টির মধ্যে ২১টি এবং খোকসায় ৪০টির মধ্যে ২৬টি, নড়াইলের কালিয়ায় ৪৪টির মধ্যে ৩০টি; সাতক্ষীরার আশাশুনিতে ৩৩টির মধ্যে ২০টি, বাগেরহাটের চিতলমারীতে ৩৬টির মধ্যে ২৫টি, মোল্লাহাটে ৩৮টির মধ্যে ২৬টি, মোংলায় ৩৭টির মধ্যে ২৪টি, মোরেলগঞ্জে ৪৬টির মধ্যে ৩৩টি, রামপালে ৪০টির মধ্যে ২৫টি এবং শরণখোলায় ৩৬টির মধ্যে ২৬টি; চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে ২৮টির মধ্যে ২০টি, দামুড়হুদায় ২৯টির মধ্যে ১৭টি, যশোরের অভয়নগরে ৪০টির মধ্যে ১৭টি, ঝিনাইদহের শার্শায় ৩১টির মধ্যে ১৮টি এবং কোটচাঁদপুরে ৩৪টির মধ্যে ২১টি পদ শূন্য। খুলনার দাকোপে ৩৮টির মধ্যে ২০টি, কয়রায় ৩৮টির মধ্যে ২৫টি; মাগুরার মহম্মদপুর ও শালিখা, ঝিনাইদহের মহেশপুর এবং সাতক্ষীরার তালা, কলারোয়া, দেবহাটা ও শ্যামনগরেও জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে।

ময়মনসিংহ বিভাগ : নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে ২৫টি পদের মধ্যে ১৪টি, পূর্বধলায় ৩৭টির মধ্যে ২০টি, আটপাড়ায় ৩৮টির মধ্যে ২৩টি, বারহাট্টায় ৩০টির মধ্যে ১৬টি এবং কেন্দুয়ায় ৪৩টির মধ্যে ২৯টি পদ শূন্য। শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে ৩৭টির মধ্যে ২৪টি, শ্রীবরদীতে ৪১টির মধ্যে ২৭টি এবং নকলায় ৪০টির মধ্যে ২২টি পদ খালি। জামালপুরের বকশীগঞ্জে ৩১টির মধ্যে ২০টি, দেওয়ানগঞ্জে ৩৯টির মধ্যে ২৬টি, মাদারগঞ্জে ৬৫টির মধ্যে ৫০টি এবং সরিষাবাড়ীতে ৩৮টির মধ্যে ২০টি পদ শূন্য। ময়মনসিংহের ভালুকায় ৪২টির মধ্যে ১৬টি পদ খালি।

রংপুর বিভাগ : দিনাজপুরের বীরগঞ্জে ৩৯টি পদের মধ্যে ৩০টি, খানসামায় ২৯টির মধ্যে ১৯টি, চিরিরবন্দরে ৩৫টির মধ্যে ২৫টি এবং বিরামপুরে ৩৮টির মধ্যে ২৫টি পদ শূন্য। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৩৯টির মধ্যে ২৯টি, চিলমারীতে ৩৫টির মধ্যে ২৫টি এবং চর রাজিবপুরে ২৫টির মধ্যে ১৫টি পদ খালি। পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে ৩৭টির মধ্যে ৩১টি এবং দেবীগঞ্জে ৪১টির মধ্যে ৩১টি পদ শূন্য। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় ৪১টির মধ্যে ২৮টি, আদিতমারীতে ৩৯টির মধ্যে ২৮টি এবং নীলফামারীর ডোমারে ৩৯টির মধ্যে ২৫টি পদ খালি। রংপুরের তারাগঞ্জে ২৫টির মধ্যে ১৮টি, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে ২৯টির মধ্যে ২১টি এবং রাণীশংকৈলে ৩৯টির মধ্যে ২৭টি পদ শূন্য।

রাজশাহী বিভাগ : বগুড়ার আদমদীঘিতে ৩৬টি পদের মধ্যে ২৩টি, ধুনটে ৩৭টির মধ্যে ২১টি এবং নন্দীগ্রামে ২৫টির মধ্যে নয়টি পদ শূন্য। জয়পুরহাটের কালাইয়ে ৩৫টির মধ্যে ২১টি এবং আক্কেলপুরে ৩৬টির মধ্যে ২২টি পদ খালি। নওগাঁর মান্দায় ৪৪টির মধ্যে ২৬টি, মহাদেবপুরে ৩৬টির মধ্যে ২৩টি এবং পোরশায় ৩৬টির মধ্যে ২৬টি পদ শূন্য। সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে ২৮টির মধ্যে ১২টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে ৩৬টির মধ্যে ২৫টি এবং নাচোলে ৩৭টির মধ্যে ২৪টি পদ খালি।

সিলেট বিভাগ : সিলেটের কানাইঘাটে ৩৩টি পদের মধ্যে ২৩টি এবং জকিগঞ্জে ৩৮টির মধ্যে ৩১টি পদ শূন্য। সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরে ২৫টির মধ্যে ২০টি, ধর্মপাশায় ৪২টির মধ্যে ৩০টি এবং দিরাইয়ে ৪১টির মধ্যে ২৭টি পদ খালি। হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে ২৫টির মধ্যে ১৭টি, বাহুবলে ৩৪টির মধ্যে ২৩টি এবং মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ৩৩টির মধ্যে ২১টি, জুড়ীতে ২৯টির মধ্যে ১৫টি ও কমলগঞ্জে ৩২টির মধ্যে ১৯টি পদ শূন্য।

মাঠপর্যায়ের চিত্র ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য

সরেজমিন ও প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা গেছে, চিকিৎসক সংকটে বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে সিজারিয়ানসহ ছোট-মাঝারি অস্ত্রোপচার বন্ধ। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অস্ত্রোপচার কক্ষ পড়ে থাকছে অব্যবহৃত, নষ্ট হচ্ছে দামি সরঞ্জাম। সরকারি সেবা না পেয়ে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে; বাড়ছে ব্যয় ও ভোগান্তি।

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দুই লাখের বেশি মানুষের একমাত্র সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। ৩১ শয্যার হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও চিকিৎসক ও জনবল সংকট কাটেনি। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ সিজারিয়ানসহ ছোট অস্ত্রোপচার। গাইনি বিশেষজ্ঞ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রত্যন্ত এলাকার গর্ভবতী নারীরা। কনসালট্যান্ট ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞের অভাবে কমেছে স্বাভাবিক প্রসবও।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শাহনিমা তরফদার আমার দেশকে বলেন, হাসপাতালে আমিসহ পাঁচজন কর্মরত আছি। আরো দুজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন। অথচ পদ রয়েছে ৩১ জনের। চিকিৎসক সংকটের কারণে সিজারিয়ানসহ সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। হাসপাতাল ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও জনবল ৩০ শয্যারই রয়েছে। প্রায় ১৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। অতিরিক্ত চাপের কারণে আমাকেও রোগী দেখতে হয়।

একই জেলার বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় তিন বছর ধরে সিজারিয়ানসহ সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও প্রায় নয় মাস ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ। গাইনি, সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় সিজারিয়ান, অ্যাপেন্ডিক্স ও হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছে না। সরেজমিনে দেখা গেছে, অস্ত্রোপচার কক্ষে তালা ঝুলছে; ভেতরে পড়ে আছে দামি চিকিৎসা সরঞ্জাম।

খুলনা বিভাগের চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. শওকত আলী আমার দেশকে বলেন, চাহিদার তুলনায় চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল অনেক কম। ফলে অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে না। বিষয়গুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও সংকট প্রকট। ৫০ শয্যার হাসপাতালটির অনুমোদিত চিকিৎসক পদের ৬২ শতাংশ শূন্য। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষাগারের সীমাবদ্ধতায় রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে করাতে হচ্ছে। এতে প্রায় সাত লাখ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ভালুকার কাচিনা এলাকার বাসিন্দা স্বপন শিকদার আমার দেশকে বলেন, তার বাবার নাক দিয়ে অবিরাম রক্ত পড়লেও হাসপাতালে ঠিকমতো পরীক্ষা না করেই তাকে ময়মনসিংহে পাঠানো হয়। অন্য রোগীদেরও যথাযথ চিকিৎসা না দিয়ে ক্লিনিক বা জেলা সদরে যেতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। হাসপাতালে ওষুধও পাওয়া যায় না বলে তার দাবি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে রোগীদের সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।

ওএসডি ৮ হাজারের বেশি চিকিৎসক

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮,৫৬১ জন চিকিৎসক ওএসডি হিসেবে রয়েছেন। তাদের মধ্যে চার হাজারের বেশি বিভিন্ন কোর্সে অধ্যয়নরত এবং সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসক সংযুক্তিমূলক ওএসডি হিসেবে বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করছেন। অন্যদিকে ৮৪৫ জনের কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্ব নেই। তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করেও বেতন-ভাতা পাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চাকরির শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাজনৈতিক ও পদসংক্রান্ত জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে চিকিৎসকদের ওএসডি করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য কর্মসূচির অপারেশন প্ল্যান বাতিল হওয়ায় কয়েকটি পদ বিলুপ্ত হয়েছে। এসব পদে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের অনেকে এখনো বেতন-ভাতা পেলেও তাদের নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্ব নেই।

চিকিৎসক-সংকট মোকাবিলায় সাময়িক সংযুক্তির সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে সরকার। বর্তমানে অনুমোদিত ওএসডি পদের হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার কথা ভাবা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম আমার দেশকে বলেন, উপজেলা পর্যায়ে চাহিদার তুলনায় চিকিৎসকস্বল্পতা রয়েছে। অনেক জায়গায় সার্জন, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞসহ প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি কমাতে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ওএসডি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা চাকরিরই একটি নিয়ম। কিছু চিকিৎসক পড়াশোনার কারণে ওএসডিতে আছেন, আবার কেউ উপজেলা পর্যায় থেকে ঢাকায় আসার জন্য সংযুক্ত হয়েছেন। এ সংখ্যা কমিয়ে আনারও চেষ্টা চলছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতামত

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন আমার দেশকে বলেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসক এবং জনবলের ঘাটতি দীর্ঘদিনের। এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় রোগীদের শহরমুখী হতে হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে বড় বড় হাসপাতাল ভবন নির্মিত হলেও সেখানে চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই। ফলে এসব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ সাধারণ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। জেলা হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিয়ে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন স্তরকে সমন্বিতভাবে সাজাতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন