দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষের চলতি বছরে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এমনকি হুমকিতে রয়েছে দেশের নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা। তবে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এ প্রেক্ষাপটে আজ শুক্রবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও গুরুত্ব দিয়ে ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস’ পালনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এবার বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য—‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’। দিনটি উপলক্ষে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ১৯৪৫ সালে ১৬ অক্টোবরকে বিশ্ব খাদ্য দিবস ঘোষণা করলেও ১৯৭৯ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষক মজুর সংহতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীম বলেন, বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য—দুটোই ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিনিয়ত কৃষিজমি কমায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার অনুপাতে বাড়ছে না খাদ্যশস্য উৎপাদন। নকল ও নিম্নমানের বীজে সয়লাব বাজার। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জমিতে এসব বীজ বপনের পরও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাচ্ছেন না কৃষক। খরচ বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে উৎপাদিত হচ্ছে না নিরাপদ ফসল।
গত ৪ সেপ্টেম্বর এফএওর প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাত লাখ ৮৭ হাজার মানুষ জরুরি পরিস্থিতিতে (আইপিসি ফেজ-৪) পড়তে পারেন।
চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য এ সংকট আরো সংবেদনশীল। প্রতি বছর চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার (অসময়ে বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি) কারণে উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলের বিশাল এলাকার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বজায় রেখেছে। চাল, মাছ, সবজি ও ধান উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ সারির দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত। তা সত্ত্বেও জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব, ফসলি জমি হ্রাস এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতার কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে সার্বক্ষণিক ঝুঁকিমুক্ত রাখা এখন বড় এক চ্যালেঞ্জ।
জাতীয় কর্মসূচি ও রাজধানীতে আয়োজন
বিশ্ব খাদ্য দিবস উদযাপন উপলক্ষে দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিস্তারিত কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় রাজধানীর ফার্মগেটের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল আলোচনা সভা ও সেমিনার হবে।
অনুষ্ঠানে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন-উর রশীদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মাসুদ রানা উপস্থিত থাকবেন।
এছাড়া বাংলাদেশে জাতিসংঘের এফএও প্রতিনিধি ড. জিয়াওকুন শি এবং ইফাদের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ভ্যালেন্টাইন আচানচো অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান।
কেন্দ্রীয় আয়োজনের বাইরেও সারা দেশের আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয় এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কৃষক সমাবেশ, র্যালি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া গণসংহতি আন্দোলনের (জিএসও) উদ্যোগে রাজধানীর হাতিরপুলে ‘বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি : রাষ্ট্রের দায় ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
খাদ্য সংকট উত্তরণে করণীয়
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য খাদ্য সংকট স্থায়ীভাবে মোকাবিলা এবং দেশের ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম আমার দেশকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এমন নতুন উচ্চ ফলনশীল ও পুষ্টিকর ফসলের জাত উদ্ভাবনে গবেষণা বাড়াতে হবে। তিনি আরো বলেন, কৃষকের জন্য ফসলের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমিয়ে বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্যের মূল্য সাশ্রয়ী রাখতে হবে। এছাড়া মাটির উর্বরতা রক্ষা ও রাসায়নিকের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে জৈব কৃষি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ব খাদ্য দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি ক্ষুধামুক্ত, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি সচিব সেলিম খান। তিনি আমার দেশকে বলেন, সরকার, গবেষক, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং দেশের মেহনতি কৃষকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এসব সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে। একই সঙ্গে টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি সুরক্ষিত জাতি গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


