প্রতিহিংসা নয়, বরং বিচার ও মানবিকতার রাজনীতি দিয়ে দেশ গড়ার অঙ্গীকার করে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন’— এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে তিনি চার কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র মেরামতের এক সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তুলে ধরেছেন।
আসন্ন সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ প্রত্যয়ে এই ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে ইশতেহারে পাঁচ ভাগে মোট ৫১ দফাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া দলটি। এ সময় দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিও তুলে ধরা হয়।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। আসন্ন নির্বাচনে তারেক রহমান দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এটিই তার প্রথম ইশতেহার। কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া শেষে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করে তারেক রহমান বলেন, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে তারা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে; সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে; আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
ইশতেহার ঘোষণাকালে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে মনে করি যারাই সরকার গঠন করবেন, আমরা যদি দুর্নীতি, আইনের শাসন ও জবাবদিহি— এ তিনটির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তাহলে কোনো পরিকল্পনাই সফল করে গড়ে তুলতে পারব না। এখানে দাঁড়িয়ে দলের পক্ষ থেকে আমি এতটুকু বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আগামী ১২ তারিখে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইনশাআল্লাহ সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে এ তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা। দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাÑএ বিষয়গুলোকে যেকোনো মূল্যে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেব।
তারেক রহমান বলেন, ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই বিএনপি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। দুর্নীতি দমনে বিএনপি সরকারের কঠোর পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায়। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব শেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে, তার অনেক আগেই বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের অপবাদ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতাÑএই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
বিএনপি বলছে, এবারের ইশতেহারের তিনটি মৌলিক ভিত্তি হলো শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্র দর্শন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা।
বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়, দলটির রাজনীতি স্লোগাননির্ভর নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাভিত্তিক। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাপক সামাজিক পরিকল্পনা মানুষের কর্মসংস্থান, সুশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, সুষম উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আইনের শাসন এবং সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে বাস্তব উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান ঘোষিত ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’-এর আলোকে বিএনপি একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করবে।
বিএনপির ৯ প্রতিশ্রুতি
ইশতেহারে প্রধান ৯টি বিষয়ের মধ্যে রয়েছে— প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা; কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা; দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা; মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগপ্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা; আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা।
এ ছাড়া তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা; ক্রীড়াকে পেশা এবং জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা; পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা; ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা; ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।
পাঁচ ভাগে ৫১ দফা প্রতিশ্রুতি
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে পাঁচটি ভাগে ৫১ দফা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম ভাগে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের অংশে গণতন্ত্র ও জাতি গঠন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান, সাংবিধানিক সংস্কার, সুশাসন ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে দলের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে। ইশতেহারে গণতন্ত্র ও জাতি গঠনে অঙ্গীকারে বলা হয়, জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি জবাবদিহিমূলক, দায়বদ্ধ এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
৩১ দফা ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে বলা হয়, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ যেসব বিষয়ে যে আঙ্গিকে ঐকমত্য স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সেভাবে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইশতেহারে বলা হয়, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল। বিএনপি জাতীয় ও স্থানীয় সব ধরনের নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের ভোটের ভিত্তিতে আয়োজন নিশ্চিত করতে চায়। জনগণের ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং নির্বাচনব্যবস্থা ও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
ইশতেহারে বলা হয়, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতা ও আদর্শকে সমুন্নত রেখে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় বিএনপির মূলমন্ত্র হবে ন্যায়পরায়ণতা। এ ছাড়া রাষ্ট্রের প্রত্যেক স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত এবং মুক্ত ও নিরাপদ মতপ্রকাশ, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং বাধাহীন চিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিষয়ে বিএনপির প্রতিশ্রুতি হলো, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। এতে বলা হয়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বিকৃত করেছিল। শিক্ষা কারিকুলামে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সব শহীদের তালিকা প্রস্তুত করে নিজ নিজ এলাকায় তাদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ করা হবে। শহীদ পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে পঙ্গু ও চোখ হারানোদের স্বীকৃতি, সুচিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানে সহায়তা করবে বিএনপি। এছাড়া সরকার গঠন করতে পারলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের দেখভালের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির প্রতিশ্রুতি হলো, জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতার লক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও অন্য পেশাজীবীদের সমন্বয়ে সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করা হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো নিম্নকক্ষের অর্জিত আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবে।
জুলাই অভ্যুত্থানকালে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত এবং ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিতকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে। সেই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে বিএনপি। এছাড়া ন্যায়পাল নিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে দলটির।
সুশাসনের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে ইশতেহারে বলা হয়, বিএনপি জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার। দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হয়রানি ও জটিলতা নিরসনে সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, ওয়ান স্টপ সার্ভিস এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর্মপ্রবাহ তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে ঘুস বা অবৈধ লেনদেন বন্ধে সরাসরি শারীরিক যোগাযোগের পরিমাণ কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইশতেহারে বলা হয়, বিএনপি আইনের শাসন বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে আইনের শাসনের নামে কোনো ধরনের কালাকানুনের শাসন কিংবা বেআইনি নিপীড়ন গ্রহণযোগ্য হবে না। সে কারণে ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪’ বাতিল করা হবে।
জনপ্রশাসন সংস্কারে বিএনপির প্রতিশ্রুতি হলো, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ করা হবে। মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়া জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গঠন, শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পেশাদারিত্ব বাড়ানো ও দলীয়করণ রোধে কাজ করবে বিএনপি। পাশাপাশি বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, মামলার জট কমানো ও বিচার পাওয়া হয়রানিমুক্ত করা, দুর্নীতিমুক্ত বিচারসেবার আধুনিকায়ন, ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠন এবং ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বিএনপি।
ইশতেহারে বলা হয়, সেবাবান্ধব পুলিশ গঠনের লক্ষ্যে আইন ও বিধি অনুযায়ী পুলিশের ওপর বিচার বিভাগীয় তদারকি নিশ্চিত করে জবাবদিহি, দায়িত্বশীল ও কল্যাণমূলক পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা হবে। এছাড়া দেশব্যাপী থানাগুলোয় অনলাইন পদ্ধতিতে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ সৃষ্টি করে ফৌজদারি বিচারপ্রার্থীদের আইনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সুগম করা হবে। সেই সঙ্গে ‘পুলিশ কমিশন’ আইন পুনঃনিরীক্ষণ করা হবে।
স্থানীয় সরকারের বিষয়ে ইশতেহারে বলা হয়, ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে গ্রাম ও শহরের স্থানীয় নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হলে জনমুখী, কার্যকর ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। উন্নয়ন কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কার্যক্রমসহ জনগণের জন্য পরিষেবা দিতে স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে ক্ষমতায়িত করে স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধান করা এবং জনগণকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা প্রদানই বিএনপির লক্ষ্য। সেই সঙ্গে সরকারি বরাদ্দের অপ্রতুলতা এবং বৈষম্য নিরসনে জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের একটি উল্লেখ্যযোগ্য অংশ স্থানীয় সরকারের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।
দ্বিতীয় ভাগে বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের অঙ্গীকার তুলে ধরে বিএনপি। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশের চার কোটি ১৭ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের কবলে নিপতিত। এজন্য বিএনপি মানবিক, ন্যায়সংগত ও মর্যাদাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করছে, যেখানে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে। বিএনপি পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে দেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের দেবে ‘কৃষক কার্ড’। এছাড়া সমাজের অবহেলিত গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে (তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী, বেদে ইত্যাদি) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হবে।
নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে ইশহেতারে বলা হয়, দেশের উন্নয়ন নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া অসম্পূর্ণ। বিএনপি নারীদের তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সুরক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সমাজে তাদের সম্পৃক্ততা এবং ক্ষমতাকে দৃঢ় করবে। দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য বিএনপি সব কর্মকাণ্ডে নারীসমাজকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত করবে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। সেই সঙ্গে কর্মস্থলে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র (ডে কেয়ার) স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি গার্মেন্টসহ সব শিল্পকারখানা ও অফিস-আদালতে কর্মরত মায়েদের জন্য ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষক, কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে ইশতেহারে বলা হয়, বিএনপি কৃষি খাতের মৌলিক রূপান্তরে অঙ্গীকারবদ্ধ। দলটির লক্ষ্য হলোÑআত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক একটি আধুনিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উৎপাদন ও বিপণন হবে ডেটা-চালিত, কৃষক হবেন ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা এবং কৃষি খাত জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে। এছাড়া বরেন্দ্র প্রকল্প পুনঃচালুকরণ ও আম সংরক্ষণে বিশেষ হিমাগার স্থাপন করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়।
ইশতেহারে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ পুনঃবাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এর মাধ্যমে দেশে হারিয়া যাওয়া ৫২০টি নদী, হাজার হাজার খাল এবং তাদের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার ও সেচ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো হবে।
বিএনপি বলছে, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ নীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন তাদের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। ধারাবাহিকভাবে, দেশের অর্থনীতির সার্বিক সংস্কার, খাত ও অঞ্চলভিত্তিক অর্থনীতিকে চাঙা করে এবং শিল্প-বাণিজ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেশব্যাপী এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা হবে। এ ছাড়া বিএনপি তরুণ ও যুবকদের এমনভাবে যোগ্য করে গড়ে তুলতে চায়, যেন তারা আত্মবিশ্বাসী, উৎপাদনশীল ও দায়িত্ব বোধসম্পন্ন নাগরিক হয়ে দেশের অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখতে পারে। এ জন্য কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোক্তা উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দেবে দলটি।
ইশতেহারে বলা হয়, বিএনপি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী এবং সময় উপযোগী করে গড়ে তুলবে। এ লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা, বিনা মূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়া, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের শিক্ষা উন্নয়ন এবং সর্বোপরি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আনা ও রোগীর চিকিৎসার পূর্বাপর পরিস্থিতির উল্লেখসহ প্রত্যেক নাগরিককে একটি (ই-হেলথ) কার্ড দেওয়া হবে। পাশাপাশি গরিবের স্বাস্থ্যসেবায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিষয়ে ইশতেহারে বলা হয়, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় একটি আধুনিক, পেশাদার ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্রের অপরিহার্য ভিত্তি। বিএনপি জানায়, সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদা পূরণে স্বনির্ভর ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা হবে। সেই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে বিএনপি।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে ইশতেহারে বলা হয়, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শনÑ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বিএনপি বিশ্বাস করেÑ‘বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে বন্ধু আছে, কোনো প্রভু নেই।’ পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণ করবে।
তৃতীয় ভাগে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে বিএনপির প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। ইশতেহারে বলা হয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের পাশাপাশি দেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে চায় বিএনপি। এর অংশ হিসেবে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার চেষ্টা চালাবে দলটি। সেই সঙ্গে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহসহ লজিস্টিক হাব উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানির বৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, নীতি ও কাঠামোগত বাধা দূর করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা হবে।
পুঁজিবাজারের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে ইশতেহারে বলা হয়, এই খাতের সংস্কারকল্পে ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। পাশাপাশি গত ১৫ বছরে পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে। অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই সঙ্গে শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা আনতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক পরিচালনা বোর্ডে যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন প্রসঙ্গে ইশতেহারে বলা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা এবং সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণ করা হবে। এছাড়া ক্যাপাসিটি চার্জসহ রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় কমিয়ে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। সেই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ২০ শতাংশে উন্নীত করতে প্রচেষ্টা জোরদার করা হবে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে বিএনপির বিশেষ অগ্রাধিকার উল্লেখ করে ইশতেহারে বলা হয়, বাংলাদেশকে বৈশ্বিকপর্যায়ে একটি অন্যতম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হাব এবং হার্ডওয়্যার উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। সেই সঙ্গে উদ্ভাবন এবং আইসিটি পরিষেবা রপ্তানিকে সর্বোচ্চ উৎসাহিত করার মাধ্যমে দেশের জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
সুনীল অর্থনীতি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বিএনপি বলছে, দেশের অপার সম্ভাবনাময় সমুদ্রসম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করবে তারা। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন করার লক্ষ্যে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রভিত্তিক শিল্প ও প্রযুক্তির উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে গুরুত্বারোপ করা হবে। ‘জাতীয় সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ’ এবং শিক্ষা ও শিল্প খাতে মেরিটাইম ইনোভেশন ফান্ড প্রতিষ্ঠা করা হবে। এছাড়া করের বোঝা না বাড়িয়েই ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপির অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
চতুর্থভাগে দেশের সব অঞ্চলের সবার জন্য সমতা-ভিত্তিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বিএনপি। তাদের দাবিÑদেশের যে অঞ্চল যেই অর্থনৈতিক ও শিল্প উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত, বিএনপি সে অঞ্চলে সেই উপযুক্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে অগ্রাধিকার দেবে। এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি, এই অঞ্চলকে কর্মসংস্থানের হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
পঞ্চম ভাগে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে বিএনপি। ইশতেহারে নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। সেই সঙ্গে ইসলামী গবেষণা সম্প্রসারণ, মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে।
ইশতেহারে বলা হয়, খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা হবে। এছাড়া জাতীয় স্পোর্টস রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, ‘স্পোর্টস ইকোনমি’ সম্প্রসারণ এবং ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’ গুরুত্বারোপ করবে বিএনপি। দেশে স্থাপন করা হবে আধুনিক ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়।
গণমাধ্যমকর্মীদের কাজের সুরক্ষা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিএনপি কাজ করবে জানিয়ে ইশতেহারে বলা হয়, সাংবাদিকদের কল্যাণে নানামুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে; গঠন করা হবে ‘জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড’।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের পরিচালনায় ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেনÑ স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়াম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, ড. মাহদী আমিন, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, সদস্য আতিকুর রহমান রুমন, শায়রুল কবির খান প্রমুখ।
এ ছাড়া শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, অধ্যাপক আ ন ম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক কামরুল আহসান, অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

