আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গুম কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন

হত্যায় অনীহা দেখানো র‍্যাব সদস্যদের ‘কাপুরুষ’ বলে ধমকাতেন জিয়াউল

আবু সুফিয়ান

হত্যায় অনীহা দেখানো র‍্যাব সদস্যদের ‘কাপুরুষ’ বলে ধমকাতেন জিয়াউল

র‍্যাবে নিয়মিত টহল ও তথাকথিত ‘এনকাউন্টার’-এর পাশাপাশি একটি গোপন অভিযান চলত, যা ‘গলফ অপারেশন’ নামে পরিচিত ছিল। এতে চোখ ও হাত বাঁধা, দুর্বল ও নোংরা পোশাক পরা আটক ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হতো। একাধিক ঘটনায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান (পরে মেজর জেনারেল) নিজে গুলি করতেন এবং হত্যার পর উপস্থিত সদস্যদের এমন কাজ কীভাবে করতে হয়, তা ‘শেখার’ নির্দেশ দিতেন। নিহতরা সবাই তরুণ বয়সি মনে হতো এবং তাদের দেখে বোঝা যেত, দীর্ঘদিন আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছিল।

হত্যার পর প্রমাণ মুছে ফেলতে কখনো লাশ রেললাইনে ফেলে দুর্ঘটনার মতো দেখানো হতো, কখনো সেতু বা ট্রলার থেকে নদীতে ফেলা হতো, আবার কখনো সিমেন্টের বস্তায় ভরে বুড়িগঙ্গায় নিক্ষেপ করা হতো। শব্দ কমাতে মাথায় পিস্তল চেপে গুলি করা হতো, গভীর পানিতে ফেলার আগে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে দেওয়া হতো, কুশনের ভেতর দিয়ে গুলি ও পেট কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করা হতো।

বিজ্ঞাপন

এসব প্রত্যক্ষ বর্ণনা গুম-সংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শতাধিক গুম-খুনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু হয়েছে।

সে প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, একাধিক অভিযানে এক রাতেই ধারাবাহিকভাবে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। লাশ গোপনে সরাতে নির্মম ও পদ্ধতিগত কৌশল ব্যবহার করা হতো। এসব কাজকে র‍্যাবের ভেতরে ‘দায়িত্ব’ বা ‘দক্ষতা’ হিসেবে দেখানো হতো। যারা আপত্তি করত বা দ্বিধা দেখাত, তাদের ভর্ৎসনা করা হতো বা অপদস্থ করা হতো। এসব অপারেশনে অংশ নেওয়া অনেক সদস্যের মধ্যে গভীর মানসিক বিপর্যয় ও ট্রমার চিহ্ন দেখা গেছে।

একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আটক একজনকে একটি মাইক্রোবাস থেকে নামানো হয়। তার চোখ ও হাত বাঁধা ছিল, কাপড় নোংরা, সাধারণ চেহারা। তাকে একটি ব্রিজের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জিয়া স্যার নিজ হাতে পিস্তল দিয়ে তাকে গুলি করেন। গুলি করার পর তার চোখের পট্টি ও হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। তারপর তাকে ব্রিজের রেলিং থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। এ পুরো কাজে জিয়াউল আহসানকে র‍্যাব ইন্টেলিজেন্সের অন্য সদস্যরা সহযোগিতা করেন। গুলি করে নিচে ফেলার পর জিয়াউল আহসান আমাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি আমাদের তীব্র ভর্ৎসনা করেন এবং বলেন, ‘তোমরা কাপুরুষ। তোমরা র‍্যাবে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য। তোমরা সেনাবাহিনীর কলঙ্ক। শেখো কীভাবে এই কাজ করতে হয়।’

তিনি বলেন, ওইদিন যাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, তাদের সবার চোখ ও হাত তোয়ালে বা কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। সবাইকে তরুণ বয়সী মনে হচ্ছিল। তাদের খুব দুর্বল দেখাচ্ছিল। সবার পোশাক ছিল নোংরা এবং তারা ছিলেন যেন প্রাণহীন। তাদের দীর্ঘদিন ধরে কোথাও আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় বলে মনে হয়েছিল।

তিনি বলেন, স্যার আমাকে গাড়ির পেছনের ট্রাংক খুলতে বলেন। তখন শীতকাল ছিল এবং চারপাশে অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দেখি ভেতরটা একদম ঠান্ডা, আমি ভয় পেয়ে যাই। ঠান্ডা লাগায় মনে হয়, সাপ হতে পারে। পরে বুঝতে পারি, এটা একজন মানুষ। তাকে চেনার কোনো উপায় ছিল না। এটি ছিল একজন মানুষের অনাবৃত লাশ। তার গায়ে ছিল হাফ হাতা গেঞ্জি। দৃশ্যটি দেখে আমি এতটাই আতঙ্কিত হই, মনে হয় প্রাণ চলে যাবে।

এরপর আমরা লাশটি রেললাইনের পাশে রেখে গাড়িতে উঠি। গাড়িতে ওঠার পর দেখি, সেখানে থাকা অন্যরা লাশটি টেনে রেললাইনের ওপর সোজা করে ফেলে দেয়। ট্রেন এসে লাশটি কেটে যাওয়ার পর আমরা সেখান থেকে চলে যাই। ট্রেন পার হওয়ার পুরো সময় আমরা গাড়ির ভেতরেই বসেছিলাম।

সেখান থেকে চলে আসার পর সত্যি বলতে, পাঁচ থেকে সাতদিন আমি কিছু খেতে বা পান করতে পারিনি, ঘুমও হয়নি। শুধু ভাবতে থাকি আমি কী করেছি, আমি কোন জায়গায় এসে পড়েছি আর আমি কীভাবে এর সঙ্গে মানিয়ে নেব।

আরেকটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, স্যার একটি টার্গেট নিয়ে গাড়ি থেকে নামেন। তার সঙ্গে মেজর নওশাদ আরেকটি টার্গেট নিয়ে নামেন। এরপর জিয়াউল স্যার তার টার্গেটের লুঙ্গি খুলে নগ্ন করেন। খুব কাছ থেকে টার্গেটটির মাথায় দুবার গুলি করে তাকে ব্রিজ থেকে নিচে ফেলে দেন। আমি কিছু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি দেখেছি, দেহটি ব্রিজ থেকে পানিতে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মেজর নওশাদ স্যারের গুলির শব্দ শুনি এবং আরেকটি টার্গেটকেও একইভাবে নগ্ন অবস্থায় পানিতে পড়তে দেখি। তারপর আমি গাড়ির দিকে এগিয়ে যাই।

আরেক বর্ণনায় তিনি বলেন, একটি মাইক্রোবাস থেকে দুজন র‍্যাব সদস্য প্রথমে একজন মানুষকে নামান। তার হাত ও চোখ বাঁধা ছিল। তাকে একটি ট্রলারে তুলে দ্বিতীয় কামরায় নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে একে একে চারজন মানুষকে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ট্রলারে তোলা হয়। এ পুরো সময় আমার দায়িত্ব ছিল আশপাশে কোনো মানুষ আছে কি না—তা দেখা।

স্যার সিগন্যাল দিলে হাত ও চোখ বাঁধা একজন মানুষকে কামরা থেকে বাইরে আনা হয়। ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের চারজন সদস্য তাকে ঘিরে দাঁড়ান। তাদের একজন আগে থেকেই শক্ত হয়ে যাওয়া একটি সিমেন্টের বস্তা ভুক্তভোগীর শরীরের সঙ্গে বেঁধে দেন। আরেকজন ভুক্তভোগীর মাথার কাছে একটি কুশন ধরে রাখেন এবং কুশনের মধ্য দিয়েই মাথায় পিস্তল দিয়ে গুলি করেন। গুলি করার পর তৃতীয় একজন ভুক্তভোগীর পেট নাভী বরাবর কেটে দেন। চতুর্থ একজন তার হাত কাটা স্থানের ভেতরে ঢুকিয়ে কাটাটি কতটা গভীর হয়েছে, তা নিশ্চিত করেন। লাশ ফেলার আগে তারা শেষবারের মতো পানির গভীরতা পরীক্ষা করে নেয়। এরপর দেহটি পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন