দেশজুড়ে গ্যাস সংকটে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে মানুষ। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছেন ভুক্তভোগীরা। গ্যাসের অভাবে কমেছে সিএনজিচালিত যান চলাচল। সংকটকে পুঁজি করে বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। দেশের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অধিকাংশ সিএনজি স্টেশন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর সামান্য পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার বিকালে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর মগবাজার ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আনোয়ার হোসেন (৫৪) বলেন, প্রায় চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। গাড়ি চালাতে পারি দিনে ১০ ঘণ্টা, সেখানে গ্যাস নিতেই যদি চার ঘণ্টা কেটে যায়, তাহলে ছয় ঘণ্টায় কীভাবে রোজগার করব।
হাজীপাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারগুলো সারিবদ্ধভাবে সড়কে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘ এই লাইনের শেষ মাথা গিয়ে ঠেকেছে রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে।
ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, পর্যাপ্ত গ্যাসের প্রেশার না থাকায় গাড়িতে স্বাভাবিক পরিমাণ গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু কম গ্যাস সরবরাহ হলেও গ্যাস গাড়িতে প্রবেশ করানোর জন্য ফিলিং স্টেশনের প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি চালাতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খরচ বাড়ছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন স্টেশন মালিকরা।
গ্যাস সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের সবকটি ফিলিং স্টেশন। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহন চালকরা। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোয় পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
এলএনজি সংকটের কারণে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল হক।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার-মদনপুর সড়কে কয়েকদিন ধরে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার প্রায় দ্বিগুণ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মদনপুর-আড়াইহাজার ভাড়া ৬০ টাকা হলেও এখন নেওয়া হচ্ছে ১০০-১৫০ টাকা। আর মদনপুর থেকে বিশনন্দী ফেরিঘাট পর্যন্ত ৯০ টাকার ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২০০ টাকা। বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে যাত্রীদের। এ নিয়ে চালকদের সঙ্গে যাত্রীদের বাগবিতণ্ডা, এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। গতকাল আড়াইহাজার-মদনপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। যাত্রীদের অভিযোগ, সড়কে সিএনজির পাশাপাশি যাত্রীবাহী বাসও কম চলাচল করছে। ফলে বিকল্প না থাকায় বাড়তি ভাড়া দিয়েই গন্তব্যে যেতে হচ্ছে তাদের।
গ্যাস সংকটে হাহাকার
রাজধানীতে ছুটির দিনেও বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলেনি। চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাদের। বেশির ভাগ এলাকায় গ্যাসের সংকট দেখা গেছে।
বাসাবাড়ির মালিকরা বলছেন, গ্যাসের এই সংকটের কারণে তিতাসের লাইন থাকার পরও ভাড়াটিয়াদের চাপে তারা বাধ্য হচ্ছেন এলপিজি লাইন তৈরি করতে। এতে একদিকে তিতাসের গ্যাস বিল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে সিলিন্ডার গ্যাসও কিনতে হচ্ছে। তাদের খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই রান্নার চুলা জ্বলছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। জেলা শহরে গ্যাস না পেয়ে বাসাবাড়িতে চলছে মাটির চুলায় রান্না। আবার কোথাও নির্ভর করতে হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর। দুদিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগের চিত্র এমনই।
চট্টগ্রামে সড়ক অবরোধ
চট্টগ্রামে গ্যাস না পেয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা। গতকাল সকালে নগরের ষোলশহর এলাকার ফসিল ফিলিং স্টেশনের সামনের সড়কে চালকরা অবস্থান নেন। এ সময় মুরাদপুর থেকে দুই নম্বর গেট পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশের অনুরোধে একপর্যায়ে সড়ক থেকে সরে যান তারা।
চালকদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষা করেও তারা গ্যাস পাচ্ছেন না। কখন গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষও কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারছে না।
বিক্ষুব্ধ চালক শাহীন হক বলেন, চট্টগ্রাম শহরের সব ফিলিং স্টেশনে একই অবস্থা। কোথাও গ্যাস নেই, আবার কোথাও গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইন। কর্তৃপক্ষ যদি সংকটের সমাধান করতে না পারে, তাহলে আমাদের রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
ফসিল ফিলিং স্টেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় সিএনজিতে গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমাদেরও কিছু করার নেই।
সিলেটে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ
গ্যাস সংকটে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোয় দীর্ঘ লাইন ও ভোগান্তির প্রতিবাদে সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ক্ষুব্ধ শ্রমিক ও চালকরা। গতকাল সকালে নগরের শিবগঞ্জ এলাকায় সুরমা অটো কেয়ার পাম্পের সামনে এ অবরোধ করা হয়। এতে কিছু সময়ের জন্য সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়।
এর আগে গ্যাস সংকটের কারণে ১৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত পাঁচ দিন সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ মালিকদের সংগঠন। তবে শুক্রবার সকাল ৮টার পর স্টেশন খোলার কথা থাকলেও অনেক পাম্পে গ্যাসের চাপ ছিল অত্যন্ত কম।
জালালাবাদ গ্যাস জানিয়েছে, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদের বিতরণ এলাকায় স্বল্প চাপ বিরাজ করছে। এ কারণে গ্রাহকদের গ্যাস ব্যবহার ৫০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।
সিলেট বিভাগীয় সিএনজি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম আদনান বলেন, আজকের (শুক্রবার) গ্যাস সংকটের কারণ মূলত সিএনজি অ্যাসোসিয়েশনের ভুল সিদ্ধান্ত। তারা যদি হঠাৎ বিক্রি বন্ধ না করে আগে ঘোষণা দিত তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এরপরও কিছু স্টেশন বিক্রি করেছে। আশাকরি দুয়েক দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।
পাম্প মালিকদের দাবি, নগরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্টেশন জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে খোলা রাখা হলেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস) মো. শোয়েব জানান, মহেশখালী এলাকায় বর্তমানে বাতাসের গতি প্রায় ৩৮ নট। নিরাপদে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতি ২০ নটের নিচে থাকা প্রয়োজন। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভেড়ানো সম্ভব হবে এবং গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হবে।
সম্পাদনা: আফজাল
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


