বাংলাদেশের চাষি ও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে উৎপাদিত সফট শেল বা নরম খোলসের কাঁকড়ার চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমশ বাড়ছে, যদিও দেশের একটি জেলাতেই এই ধরনের কাঁকড়া উৎপাদনের সব কার্যক্রম বেশি চোখে পড়ছে।
খামারি ও মৎস্য কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও ইউরোপের অনেক দেশে ক্রমশ রপ্তানি বাড়ছে বাংলাদেশের নরম খোলসের কাঁকড়ার এবং এর প্রধান যোগানদাতা হলো সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা।
ওই এলাকায় অনেকে এখন এই কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন এবং সুন্দরবন ও আশপাশের নদী এলাকাগুলোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই শিল্পের আকারও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
কাঁকড়া চাষি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা ছাড়াও রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম ও মুনাফা দ্রুত আসার সুযোগ থাকায় অনেকে এখন চিংড়ির ঘেরের লোনা পানিতেই নরম খোলসের কাঁকড়া চাষ শুরু করছেন।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেছেন, গত অর্থবছরে তার জেলা থেকেই প্রায় সাড়ে সাতশ মেট্রিক টন ‘সফট শেল ক্র্যাব’ বা ‘নরম খোলসের কাঁকড়া’ বিদেশে রপ্তানি হয়েছে।
তিনি বলেন, “সাধারণত কাঁকড়ার চেয়ে খোলস নরম হওয়ায় এটি খেতে সুবিধা। সে কারণে দেশের মধ্যেও এর বাজার বড় হচ্ছে।”
খামারি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিশাল উপকূলীয় এলাকায় উন্নত চাষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নরম খোলসের কাঁকড়ার চাষ বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগ আছে।
সরকারি হিসেবে, বৃহত্তর খুলনা অঞ্চল থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৪৪ মেট্রিক টন নরম খোলসের কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছিল, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১৬৬ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।
বাংলাদেশে এখন মূলত দুইভাবে কাঁকড়ার চাষ হয়। একটি হলো ফ্যাটেনিং বা মোটাতাজাকরণ এবং অন্যটি নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন।
ছোট কাঁকড়া সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট নিয়মে প্রতিপালনের পর ওজন বাড়িয়ে তোলাকে ফ্যাটেনিং বলা হয়। অন্যদিকে নরম খোলসের কাঁকড়ার ক্ষেত্রে খোলস বদলানোর পর নতুন খোলস শক্ত হওয়ার আগেই কাঁকড়া সংগ্রহ করে রপ্তানির জন্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যমতে, নরম খোলসের কাঁকড়া চাষে প্রতি তিন ঘণ্টা পরপর দিন-রাত পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং নরম বা মৃত কাঁকড়াগুলো দ্রুত তুলে ফেলতে হয়। প্রতি দুই মাসে প্রতি একর পুকুর থেকে ২৫০০ থেকে ২৬০০ কেজি পর্যন্ত নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন সম্ভব।
বর্তমানে সুন্দরবনের নদী-খাল থেকে ছোট বা মাঝারি আকারের কাঁকড়া সংগ্রহ করে অগভীর লোনা পানিতে ভাসমান প্লাস্টিকের ছোট বাক্স বা খাঁচায় আলাদাভাবে রাখা হয়। সময়মতো এসব কাঁকড়াকে ছোট মাছ বা শামুক খেতে দেওয়া হয়।
খোলস বদলানো শুরু হলে নতুন খোলস শক্ত হওয়ার আগেই কাঁকড়া সংগ্রহ করে পরিষ্কার বা ঠান্ডা পানিতে রাখা হয়। পরে গ্রেডিং ও হিমায়িত করার মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হয়।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. লতিফুল ইসলাম বলেন, একটি কাঁকড়া যখন খোলস পাল্টায়, তখন থেকে পরবর্তী অন্তত ছয় ঘণ্টা তার বহিরাবরণ একেবারেই নরম থাকে।
তিনি বলেন, “ওই সময়েই শক্ত খোলস ছাড়া কাঁকড়াটি সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এটিই সফট শেল ক্র্যাব বা নরম খোলসের কাঁকড়া। সাধারণত ছোট কাঁকড়াগুলো দ্রুত খোলস পাল্টায়, কখনো কখনো সাত দিন বা তারও কম সময়ের মধ্যে।”
খামারি, মৎস্য কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, আগে শক্ত খোলসের কাঁকড়াই হাত-পা বেঁধে রপ্তানি করা হতো। তবে শক্ত খোলসের কারণে তা খেতে তুলনামূলক কঠিন ছিল।
এ ছাড়া প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করে রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ায় কিছু কাঁকড়া মারা যেত। আবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রপ্তানি করতে না পারলে বাজারদর কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকত।
এমন পরিস্থিতিতে ২০১৪-১৫ সালের দিকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন ও রপ্তানি শুরু হয়।
তবে বড় কাঁকড়ার তুলনায় ছোট কাঁকড়া দ্রুত খোলস পাল্টায় বলে বর্তমানে ছোট কাঁকড়া ধরার প্রবণতা বেড়েছে। এতে প্রাকৃতিক উৎসে কাঁকড়ার সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ড. লতিফুল ইসলাম বলেন, “এখন শতভাগ কাঁকড়াই প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক পোনা হ্যাচারি না থাকায় প্রাকৃতিক উৎসই প্রধান ভরসা।”
তিনি আরও বলেন, সফট শেল কাঁকড়া উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। কারণ এ ধরনের চাষে এক বা একাধিক ঘের, কাঁকড়া রাখার জন্য বিপুল সংখ্যক বাক্স এবং ওয়াশিং ও ফ্রিজিং সুবিধা দরকার হয়।
খামারিরা জানিয়েছেন, সুপার গ্রেডের নরম খোলসের কাঁকড়া আন্তর্জাতিক বাজারে কেজিপ্রতি ১৪ থেকে ১৫ ডলারে বিক্রি হয়।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের একটি নরম খোলসের কাঁকড়া রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় এই কাঁকড়া রপ্তানি করছেন।
তিনি বলেন, “সমস্যা হলো কাঁকড়া আহরণ করা যায় মাত্র চার থেকে পাঁচ মাস। আহরণের সময় বাড়ানো গেলে আরও বেশি কাঁকড়া সংগ্রহ ও রপ্তানি করা সম্ভব হতো।”
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, জেলার শ্যামনগরই নরম খোলসের কাঁকড়ার প্রধান উৎপাদন এলাকা। তবে আশপাশের এলাকাতেও এখন অনেক চাষি এই খাতে আগ্রহী হচ্ছেন।
তার মতে, জেলার নয়শর বেশি কাঁকড়াচাষির মধ্যে বর্তমানে ১২৬ জন নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।
তিনি বলেন, “এটি ক্রমবর্ধমান একটি খাত। চিংড়ির পাশাপাশি অনেকে এখন এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই এটি বিকশিত হচ্ছে।”
গত বছর নভেম্বরে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি কর্মসূচি বাংলাদেশের উদ্যোগে সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের নরম খোলসের কাঁকড়া চাষিদের জন্য জলবায়ু সহনশীল কাঁকড়া উৎপাদন এবং কাঁকড়া সংগ্রহকারীদের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
এতে প্রায় ২০০ খামারকর্মী অংশ নেন, যাদের মধ্যে ১৮৩ জনই ছিলেন নারী।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই খাতে সার্বক্ষণিক শ্রমের প্রয়োজন হওয়ায় বিপুল সংখ্যক নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। বিশেষ করে কাঁকড়া সংগ্রহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



ঈদের দিনে ১০ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২০
ইরান যুদ্ধ নিয়ে কাতারের আমিরের সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপ
হরমুজে টোল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করল ওমান