বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশের স্বার্থই তার রাজনীতির একমাত্র অগ্রাধিকার, অন্য কোনো দেশের নয়। তিনি বলেন—দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠে নিজের প্রথম নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রচারকাজ শুরু করেন।
এই স্লোগানের মাধ্যমে জনসভায় তিনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে বিএনপি আগামী দিনে যে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে তার ইঙ্গিত দিলেন। এর আগে গত বুধবার রাতে দলের ঐতিহ্য হিসেবে নির্বাচনি প্রচার শুরুর আগে সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন।
এদিকে গতকাল সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শুরু হয়। সিলেট জেলা ও মহানগর এবং সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশ মঞ্চে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে তারেক রহমান উপস্থিত হন এবং প্রায় আধা ঘণ্টা বক্তব্য দেন তিনি। তার আসার আগেই সমাবেশস্থল লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে।
মঞ্চে উঠে বিএনপির চেয়ারম্যান হাত নেড়ে উপস্থিত নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানান। ক্যাজুয়াল পোশাকে নিজের নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেন তারেক রহমান। তার পরনে ছিল সাদা শার্ট, নীল রঙের জিন্স প্যান্ট ও কালো কেডস। এ সময় তার সঙ্গে স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। অন্যদের মধ্যে মঞ্চে সিলেট বিভাগের চার জেলার সংসদীয় আসনের বিএনপি মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। সভা সঞ্চালনা করেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী।
জনসভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন। এছাড়া স্থানীয় অনেক নেতা বক্তব্য দেন।
এর আগে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন আসনের নেতাকর্মীরা সকাল থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জনসভাস্থলে আসেন। তারা ধানের শীষ, বিএনপি, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নামে স্লোগান দেন। অনেকে মাথায় ধানের শীষের ছবিসংবলিত টুপি আর কপালে দলীয় পতাকা বেঁধে সভায় হাজির হন।
এসেছে ইলিয়াস আলী প্রসঙ্গ
সমাবেশে ব্যানার, ফেস্টুন, স্লোগানে বারবার উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের সময়ে ‘গুম হওয়া’ বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর নাম। সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনের সাবেক এ সংসদ সদস্য ঢাকার বনানী থেকে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ‘গুম’ হন।
সরেজমিন দেখা গেছে, সকাল থেকেই সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নেতাকর্মীরা মিছিলসহ সমাবেশস্থলে প্রবেশ করেন। মিছিলগুলোতে ইলিয়াস আলীর নামে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। কেউ ইলিয়াস আলীর গুমের বিচার দাবি করেন, আবার কেউ তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলেন। মাঠের এক পাশে গুম ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের বসার জন্য নির্ধারিত জায়গাও রাখা ছিল।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে ইলিয়াস আলীসহ সিলেট অঞ্চলের গুমের শিকার বিএনপির নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করেন। এছাড়া বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বক্তব্যে ইলিয়াস আলীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
সমাবেশে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, হাজার হাজার মানুষের গুম-খুনের বিনিময়ে আজ আমরা এখানে লাখো জনতা একত্রিত হয়েছি। গত ১৫ বছর একটি দল ক্ষমতার নামে আরেকটি দেশের গোলাম হয়ে গিয়েছিল। তাই আমি বলেছি—দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, গত ১৫ বছর উন্নয়নের নামে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। তার প্রমাণ ঢাকা থেকে সিলেটে আসতে যে সময় লাগে, লন্ডনে যেতে এত সময় লাগে না। তিনি বলেন, দেশের বেকারত্ব সমাধানে যুবকদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করতে চাই। সেটা হয় দেশের ভেতর, না হয় দেশের বাইরে। আমরা যুবক ভাইদের স্বাবলম্বী করতে চাই।
নির্বাচন সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দল ‘বেহেশতের কথা’ বলে জনগণের সঙ্গে মিথ্যাচার করছে বলে অভিযোগ করেন তারেক রহমান। তিনি সমাবেশস্থলে উপস্থিত একজনকে মঞ্চে ডেকে এনে পবিত্র ওমরাহ পালন করেছেন কি না, দোজখ ও বেহেশতের মালিক কে—প্রশ্ন রেখে জবাব শোনেন। তারেক রহমান বলেন, আপনারা সবাই সাক্ষী দিলেন। দোজখ, বেহেশত—এ পৃথিবী ও কাবার মালিক আল্লাহ। আরে ভাই যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগেই একটি দল এ দেব, ওই দেব, বলছে টিকিট দেব। বলছে না? যেটার মালিক মানুষ না, সেটার কথা যদি সে বলে সেটা শিরক করা হচ্ছে, হচ্ছে না? যার মালিক আল্লাহ, যার অধিকার শুধু একমাত্র আল্লাহর একমাত্র, সবকিছুর অধিকার উপরে আল্লাহর অধিকার।
তারেক রহমান বলেন, ‘তারা আপনাদের ঠকাচ্ছে। নির্বাচনের পর তাহলে কেমন ঠকান ঠকাবে আপনারা বোঝেন। শুধু ঠকাচ্ছেই না, মানুষকে তারা শিরক করাচ্ছে, নাউজুবিল্লাহ।
এ সময় জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, কেউ কেউ বলে অমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি, এবার একবার আমাদের দেখেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে লাখো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমি, সেই মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি। যাদের ভূমিকার কারণে এ দেশের লাখ লাখ ভাইয়েরা শহীদ হয়েছেন; এ দেশের লাখ লাখ মা-বোনের সম্মানহানি হয়েছে। কাজেই তাদের তো বাংলাদেশে মানুষ এরই মধ্যে দেখেই নিয়েছে। আমি বলব, এ কুফরির বিরুদ্ধে, এ হঠকারিতার বিরুদ্ধে, এ মিথ্যার বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
এর আগে শহরতলীর বিমানবন্দর এলাকায় একটি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে প্রায় শতাধিক তরুণ শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে ‘দ্য প্ল্যান : ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শীর্ষক নীতি সংলাপে ১৯টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থান বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেন।
তাদের প্রটোকল বিএনপির চেয়েও তিনগুণ করে দিন
দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে সিলেট থেকে রওনা হয়ে সড়কযোগে তারেক রহমান মৌলভীবাজার শেরপুর আইনপুর মাঠে জনসভায় যোগ দেন। সেখানে তিনি প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় তারেক রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টাদের উদ্দেশে বলেন, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে, লাখো জনতার পক্ষ থেকে আমি অনুরোধ করব—তাদের যদি প্রটোকল দরকার হয়, তাহলে তা তিন ডাবল করে দিন। বিএনপির চেয়েও তিনগুণ বেশি করে দিন। তিনি বলেন, ‘কারণ তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। মানুষ এখন সেটা বুঝতে পারছে। আমরা চাই না মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের কিছু করে বসুক। সেজন্য সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে—তাদের প্রটোকল তিন গুণ বাড়িয়ে দিন।’ এরপর সড়কপথে রওনা হয়ে সন্ধ্যা ৬টা২০ মিনিটে হবিগঞ্জে নির্বাচনি জনসভায় তিনি কথা বলেন।
তাহাজ্জুদ পড়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েই কেন্দ্রে উপস্থিত থাকার আহ্বায়ন জানান তারেক রহমান। নির্বাচনি সফরকালে গতকাল হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা পরিষদের মাঠে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে সেখানে মঞ্চে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন তারেক রহমান। পরে হবিগঞ্জের চারটি আসনের এমপি প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে জনগণকে বলেন, আপনারা তাদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন। বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে এ চারজনের মাধ্যমে এলাকায় সব উন্নয়ন হবে ইনশাআল্লাহ।
শরিকদের জন্য ভোট চাইলেন তারেক রহমান
এদিকে হবিগঞ্জে সমাবেশ শেষে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে তারেক রহমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের কুট্টাপাড়া ফুটবল খেলার মাঠে জনসভায় বক্তব্য দেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেখানে শরিক দলের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চান তিনি। যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। দুই প্রার্থীই এবার নিজ নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সমাবেশে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ধানের শীষের ভাই। আমাদের কঠিন সময়ে তারা পাশে ছিলেন। তাই আপনারা মাথাল মার্কায় ভোট দেবেন।’ এরপর তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবের জন্য খেজুরগাছ প্রতীকে ভোট চান।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনি সমাবেশ শেষে তারেক রহমান কিশোরগঞ্জের ভৈরব স্টেডিয়াম, নরসিংদীর পৌরপার্ক এবং নারায়ণগঞ্জের গাউসিয়ায় নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য দেন। এসব জনসভায় তিনি সংশ্লিষ্ট আসনগুলোর বিএনপি মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে জনতার সঙ্গে পরিচয় করান।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আমার দেশ-এর নারায়ণগঞ্জ স্টাফ রিপোর্টার আবু সাঈদ মাসুদ, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি ইদ্রিস আলী, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি কামরুল হাসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি মফিজুর রহমান লিমন, নরসিংদী প্রতিনিধি শরীফ ইকবাল রাসেল, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান খান সোহেল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে এত সহজ নয়
জিয়া, তালপট্টি এবং অমীমাংসিত ইতিহাস
ভোটের মাঠে দুই রহমান এবং নির্বাচন কমিশন