আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

খোলা ড্রামের বিষাক্ত ভোজ্যতেলে হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

এমরানা আহমেদ

খোলা ড্রামের বিষাক্ত ভোজ্যতেলে হুমকিতে জনস্বাস্থ্য
ফাইল ছবি

রাজধানীর পল্লবীর বাসিন্দা রহিমা (৩২) বাসাবাড়িতে ছুটা বুয়ার কাজ করেন। প্রতি মাসে তার সংসারে সাড়ে তিন লিটার সয়াবিন তেল লাগে। বাজার থেকে খোলা তেল কেনেন তিনি। বেশি দাম দিয়ে বোতলজাত তেল কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন রহিমা। তেজকুনিপাড়া এলাকার হোটেল মালিক রহমান মাসুদ।

বাজারে বিক্রি হওয়া খোলা তেলেই হোটেলের সব ধরনের রান্না ও ভাজার কাজ সারেন তিনি। এলাকার প্রায় সব হোটেলের রান্নাই খোলা তেল দিয়ে করা হয় বলে জানান রহমান মাসুদ। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, খোলা তেলের সুবিধা হলো, যখন যেটুকু প্রয়োজন ততটুকুই কেনা যায় এবং দামও তুলনামূলক কম।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেদার বিক্রি হচ্ছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেল। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মান নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং নকলের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল (সয়াবিন ও পাম) বিক্রি ২০২৩ সালের ১ আগস্ট থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। সাধারণ মানুষও সস্তার জন্য নিষিদ্ধ এ খোলা তেলের দিকেই ঝুঁকছেন। কেবল রাজধানী ঢাকাই নয়, সারা দেশের চিত্র একই ধরনের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খোলা সয়াবিন তেল মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ড্রামের খোলা ভোজ্যতেলে ভেজাল মেশানোর সুযোগ থাকে এবং নন-ফুড গ্রেডেড প্লাস্টিক ড্রাম বারবার ব্যবহারের ফলে তেল বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে। এছাড়া ড্রামে বাজারজাতকৃত ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ থাকে না অথবা সঠিক মাত্রায় পাওয়া যায় না। এসব কারণে জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং একই সঙ্গে শিশু ও নারীদের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতির প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। এসব তেল কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিই নয়; বরং দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, প্রায় দেড় বছর আগে সরকারের ঘোষণা ছিলÑ‘বাজারে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি করা যাবে না। সব ধরনের ভোজ্যতেল, বিশেষ করে সয়াবিন তেল বিক্রি করতে হবে প্যাকেটজাত করে। এর কোনো বিকল্প চলবে না।’ সরকারের সে সিদ্ধান্ত আজও বাস্তবায়ন হয়নি। বাজারে এখনো দেদার বিক্রি হচ্ছে খোলা ড্রামজাত সয়াবিন তেল।

জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ২০১৯-২০ অনুযায়ী, ৬-৫৯ মাস বয়সি শিশুদের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থাৎ দুটি শিশুর একটি ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিতে ভুগছে। সরকার ২০১৩ সালে আইন করে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ ব্যতীত ভোজ্যতেল বাজারজাত নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু ড্রামের অধিকাংশ খোলা ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ নেই বা পরিমিত মাত্রায় থাকে না। ফলে বিষয়টি ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩ বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি জনগণের অধিকার হলেও ড্রামে বাজারজাতকৃত খোলা ভোজ্যতেল জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)। জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ২০১১-১২-এর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি নারীদের (গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী ব্যতীত) মধ্যে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিতে ভুগছেন।

আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে মোট ভোজ্যতেলের ৬৫ শতাংশ ড্রামে বাজারজাত করা হয়, যার মধ্যে ৫৯ শতাংশই ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ নয় এবং ৩৪ শতাংশে সঠিক মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ নেই। মাত্র ৭ শতাংশ ড্রামের খোলা তেলে আইনে নির্ধারিত ন্যূনতম মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া গেছে। এসব ড্রামে কোনো ধরনের লেবেল এবং উৎস শনাক্তকরণ তথ্য যুক্ত না করায় তেল সরবরাহের উৎসও চিহ্নিত করা যায় না।

নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও খোলা তেল বিক্রির কারণ জানতে চাইলে কারওরান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, বাজারে এখনো অনেক ভোক্তা বা ক্রেতা আসেন, যারা খোলা তেল কিনতে চান। যেহেতু ক্রেতা চান, সেহেতু আমরাও সেটা বিক্রি করি। ক্রেতাদের এমন চাহিদার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে কামাল উদ্দিন জানান, খোলা তেলের নানাবিধ সুবিধা আছে। সেজন্যই ক্রেতাদের কাছে খোলা সয়াবিন তেলের চাহিদা বেশি। যেমন একজন ক্রেতা তার চাহিদা অনুযায়ী অনুযায়ী চাইলে যেকোনো পরিমাণ তেল কিনতে পারেন। কিন্তু প্যাকেটজাতের ক্ষেত্রে সে সুবিধা নেই। দ্বিতীয়ত, খোলা ভোজ্যতেলের দাম বোতলজাত তেলের তুলনায় কম। মূলত এসব কারণেই বাজারে এখনো খোলা তেলের বেশ চাহিদা রয়েছে।

এ বিষয়ে পুষ্টিবিজ্ঞানী ডা. আসলাম হোসেন বলেন, বাজারে যারা খোলা তেল বিক্রি করেন, তারা বেশি মুনাফার আশায় করছেন। অপরদিকে যারা তা কেনেন, তারা স্বাস্থ্য সচেতন নন বলেই কিনছেন। খোলা তেল বিক্রিতে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও রয়েছে। এক তেলের নামে অন্য তেল বিক্রি, নিম্নমান ও অস্বাস্থ্যকর তেল বিক্রির পাশাপাশি খোলা অবস্থায় তেল সংরক্ষণ ও বিক্রিতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে। শুধু তাই নয়, তেল রাখার কাজে ব্যবহৃত ড্রামগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আগে রাসায়নিক বা শিল্পপণ্য সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়, ফলে তেল দূষিত হয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। পাশাপাশি এসব ড্রামে কোনো লেবেল বা উৎসের তথ্য না থাকায় তেলের মান ও উৎস যাচাই করা সম্ভব হয় না।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কনসালট্যান্ট মুশতাক হাসান মুহাম্মদ ইফতিখার বলেন, ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতির কারণে শিশুদের অন্ধত্ব ও গর্ভবতী নারীদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। শিল্প মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাজারে ভিটামিনসমৃদ্ধ ও নিরাপদ তেলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, ভোজ্যতেল খাদ্যপণ্য বিধায় এটি নিরাপদভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার। ড্রামে খোলা ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এর ক্ষতি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...