গত বছরের চেয়ে প্রায় আড়াই লাখ টন বেশি সার আমদানি করেও সংকট মোকাবিলা করতে পারছে না সরকার। কারণ দেশীয় উৎপাদন কমার পাশাপাশি বিপণন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃত্তিম সার সংকট দেখা দিয়েছে। এতে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে কৃষি খাতে। বিসিআইসি বলছে, ডিলারের গুদামে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু কিছু এলাকায় কেন কৃষক সার পাচ্ছে না; সেই প্রশ্ন তাদেরও। অন্যদিকে সার ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন করে ডিলার দেওয়ার প্রক্রিয়া এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেনি সরকার। এটিও সাপ্লাই চেইন নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ।
বিসিআইসি সূত্র জানায়, বছরে দেশে মোট ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন বিভিন্ন ধরনের সারের চাহিদা রয়েছে। চলতি অর্থবছরেও ৬৮ থেকে ৬৯ লাখ টন সারের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা সম্পন্ন সার ইউরিয়া। বছরে যার চাহিদা ২৬ থেকে ২৭ লাখ টন। ডিএপি ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন, টিএসপি সাত থেকে আট লাখ ও এমওপি সার লাগে ৯ থেকে ১০ লাখ টন। এর মধ্যে ১১ থেকে ১২ লাখ টন ইউরিয়া আর এক লাখ টন ডিএপি সার বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। বাকি সারের চাহিদা আমদানি করেই পূরণ করা হয়।
তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর সার আমদানি বেড়েছে। দেশীয় উৎপাদন কিছুটা কমলেও তা সংকট তৈরি হওয়ার মতো নয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সারের দাবিতে বিক্ষোভ, দোকানে হামলা, গুদামে লুটের মতো ঘটনা ঘটছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সূত্র বলছে, মূলত বিপণন ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার কারণেই সার নিয়ে অরাজকতা শুরু হয়েছে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনেও বিপর্যয় নামার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান, বর্তমানে খরিপ-২ মৌসুম চলছে। অক্টোবরের ১৬ তারিখ থেকে শুরু হবে রবি মৌসুম। এতে সারের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। নাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ফসলের উৎপাদন। কারণ বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ডোজে সার প্রয়োগ করতে হয়।
তিনি বলেন, শুধু কম নয়; বেশি সার প্রয়োগও ফসলের উৎপাদনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ধানের চারা রোপণের ২ সপ্তাহ পর যে সার দেওয়া প্রয়োজন সেটা ২০ দিন পর দেওয়ার সুযোগ নেই। আবার ১০ দিন বয়সে দিলেও হবে না। তাই সারের ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। প্রয়োজনে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে হলেও এই খাতে শৃঙ্খলা আনা উচিৎ বলে জানান তিনি।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের ১৯ তারিখ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কাস্টমস দিয়ে মোট সার এসেছিল ২৪ লাখ ৮৬ হাজার টন। চলতি বছরের এই সময়ে যার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ লাখ ২৪ হাজার টনে। যা গত বছরের চেয়ে প্রায় আড়াই লাখ টন বেশি। এর বাইরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিসিআইসির অধীনস্ত দেশের সাতটি কারখানা সম্মিলিতভাবে সার উৎপাদন করেছিল ১২ লাখ ২৯ হাজার টন । যার মধ্যে ৬৮ হাজার টন ডিএপি এবং বাকি সব ইউরিয়া সার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশীয় কারখানা থেকে উৎপাদন হয়েছে দুই লাখ ৯ হাজার টন ইউরিয়া। তবে ডিএপির হিসেবটা পাওয়া যায়নি। ইউরিয়ার গড় উৎপাদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশীয় উৎপাদনও অনেকটা স্বাভাবিক রয়েছে।
বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্য) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, আমদানি ও উৎপাদনে কোনো ঘাটতি নেই। বিসিআইসি কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে সার বিতরণ করছে। বিএডিসি কিংবা ডিলারের গুদামেও সারের কোনো সংকট নেই। যে এলাকায় বিশৃঙ্খলা হচ্ছে, সেখানে প্রতিনিধি পাঠালে সারের কোনো ঘাটতি পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে বিশৃঙ্খলতাটা কেন হচ্ছে সেটা আমাদেরও প্রশ্ন। বাজার মনিটরিংয়ে কোনো ঘাটতি আছে কি না; সেটা বলতে পারব না। কারণ বাজার মনিটরিং বিসিআইসির কাজ নয়।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মুখপাত্র ও সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, সম্প্রতি চট্টগ্রাম দিয়ে সার আমদানি কিছুটা কমেছে। কিন্তু মোংলাসহ অন্যান্য কাস্টমসে বেড়েছে। প্রতিটি কাস্টম হাউসেই কৃষিপণ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে খালাস করার ব্যবস্থা করে। সার বোঝাই কোনো জাহাজ এলে সেটাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং দেওয়াসহ ডকুমেন্টেশনের কাজগুলো গুরুত্বসহকারে করে দেওয়া হয়। সেদিকে কাস্টমস কর্মকর্তারা সচেতন আছেন বলেও জানান তিনি।
কৃষকের কাছে ভর্তুকির সার সরাসরি, সময়মতো ও নির্ধারিত দামে পৌঁছানো এবং সার বিতরণ ব্যবস্থার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর জন্য নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৩০ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়। আগের ব্যবস্থায় একটি ইউনিয়নে সাধারণত দুইজন ‘মাস্টার ডিলার’ ছিল। নতুন নীতিমালায় প্রতি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় তিনজন করে ডিলার রাখার বিধান করা হয়েছে। সম্প্রতি এই প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে। এতে বিভিন্ন এলাকায় নতুন সার ডিলারের জন্য আবেদন করা ব্যবসায়ীরা বাজারে ঢোকার চেষ্টা করছে। এতে পুরোনো ডিলারদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে মাঠ পর্যায়ে সার বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। যার প্রভাব খুচরা বাজারের ওপর পড়তে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান কপিল উদ্দিন জানান, নতুন করে ডিলার নিয়োগের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এখানে রাজনীতিকরণের অভিযোগ আছে। আগেও বিভিন্ন সময়ে যে সব ডিলার নিয়োগ হয়েছে সেখানেও রাজনৈতিক সুপারিশ প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু এবার বড় পরিসরে ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে ডিলারের সংখ্যা তিনগুণ হবে। সব এলাকায় কিন্তু এত ডিলারের চাহিদা নেই। কোনো কোনো এলাকায় একজন ডিলারের জন্য বরাদ্দ করা সার-ই বিক্রি হয় না। আবার এক এলাকার ডিলার চাইলেও অন্য এলাকায় সার সরবরাহ করতে পারেন না। ফলে সিস্টেমের মধ্যে একটু জটিলতা রয়েছে। এতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে পুরো সেক্টরে।
এর বাইরে প্রতি মৌসুমের শুরুতে কৃষি বিভাগ থেকে বিভিন্ন এলাকার সারের চাহিদাপত্র পাঠানো হয়। সেখানে পরিসংখ্যানগত অনেক ভুল থাকে। এসব কারণে এলাকাভিত্তিক সার সংকট তৈরি হয়। কিন্তু এবারের চিত্রটা একটু আলাদা। অনেক এলাকায় সার আছে; কিন্তু আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কারণ সংকট যতটা তার চেয়ে অপপ্রচার বেশি হয়েছে। একটি পক্ষ সরকারকে বিপদে ফেলতে এই ধরনের অপপ্রচার করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এসব অপপ্রচার রোধে প্রশাসনের যতটুকু সক্রিয় থাকার কথা ততটুকু দেখা যাচ্ছে না। ফলে গুদামে সার থাকলেও মানুষ সারের দাবিতে বিক্ষোভ করছে। কিছুদিন আগের জ্বালানি তেলের মতো অনেক কৃষকের মধ্যে সারের ক্ষেত্রেও প্যানিক বায়িং প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

