আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জামায়াতসহ ১১ দলের সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে

রকীবুল হক

জামায়াতসহ ১১ দলের সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটের আসন সমঝোতা অবশেষে চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে। কিছুদিন ধরে চলা নানা নাটকীয়তা ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আসন ভাগাভাগির কাজ শেষ করা হচ্ছে। এ নিয়ে গতকাল সোমবার রাতে লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হয়।

তবে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দলের মধ্যে কিছু আসনের সমঝোতার কাজ শেষ হয়নি। এ বিষয়ে আজ মঙ্গলবার আরেক দফা বৈঠক হবে তাদের। আজকের মধ্যেই সব দলের সমঝোতার পর আগামীকাল বুধবার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

এর আগে গতকাল সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান, আসন সমঝোতার বিষয়টি মঙ্গলবারের মধ্যেই একটা রূপ পাবে। মঙ্গলবার অথবা বুধবার এটার চূড়ান্ত ঘোষণা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জানা গেছে, আসন সমঝোতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গতকাল সোমবার রাতে। সেখানে কোন দল কোন কোন আসনে একক প্রার্থী দেবে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়। বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক হয় জামায়াত নেতাদের। ওই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই দলীয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ইসলামী আন্দোলনসহ শরিকরা। সবার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেই শীর্ষ নেতাদের সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা ঘোষণা দেওয়া হবে। তবে শেষ মুহূর্তে কোনো দল এতে রাজি না থাকলে তাদের বাদ রেখেই চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ গতকাল মধ্যরাতে জানান, আমাদের সঙ্গে জামায়াতের বৈঠক হয়েছে। আমাদের চাহিদা এখনো পূরণ হয়নি। মঙ্গলবার দুপুরে আবার বসব। এদিন চূড়ান্ত হলে বুধবার ঘোষণা হতে পারে।

একই ধরনের মন্তব্য করে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, এখনো বলার মতো কিছু হয়নি। আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন দলের প্রার্থীর সমঝোতা নিয়ে জটিলতা হচ্ছে। দেখা যাক কি হয়। এ বিষয়ে বুধবার ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও তিনি জানান।

সমঝোতা প্রক্রিয়ায় থাকা দলগুলো হলোÑজামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)।

এর আগে গতকাল দুপুরে দলীয় প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান, তার সঙ্গে সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবসের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে আগামী নির্বাচন ও সমঝোতার বিষয় নিয়ে কথা হয়।

তিনি বলেন, ওই আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট নিয়ে কথা হয়েছে। তারা জানতে চেয়েছেন, এই নির্বাচনে আমাদের দল এবং যাদের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে তাদের প্রস্তুতি কেমন, সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে কি না, না হলে কবে হবে? আমরা তাদের বলেছি, মঙ্গলবারের (আজ) মধ্যেই এটার একটা রূপ পাবে। আসন সমঝোতার চূড়ান্ত ঘোষণা কবে হবেÑসাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির আরো বলেন, আপনারা আগামীকালের (মঙ্গলবার) ভেতরে দাওয়াত পাবেন, না হলে পরশুদিন (বুধবার)। সবার সামনে আমরা একসঙ্গে আসব।

এর আগে আট দলের দীর্ঘদিনের তৎপরতার ধারাবাহিকতায় আরো দুটিকে (এনসিপি ও এলডিপি) যুক্ত করে গত ২৮ ডিসেম্বর ১০ দলীয় সমঝোতার ঘোষণা দেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। এটি নির্বাচনি সমঝোতা হলেও জোটের চেয়ে শক্তিশালী বলে তিনি সেদিন মন্তব্য করেন। পরে এতে এবি পার্টি যুক্ত হয়ে ১১ দলীয় সমঝোতায় রূপ নেয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সাব সেক্টর কমান্ডার ও বীর বিক্রম কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এবং জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল ওই সমঝোতায় আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

তবে ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময়ের আগে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়ায় সব দলই বাড়তি আসনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেন। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। এমনকি কোন দল কতটি আসন পাবেÑতা চূড়ান্ত হওয়ায় সবার মাঝেই অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তাছাড়া ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের চাহিদা অনুযায়ী আসন পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন নেতাকর্মীরা। সমঝোতায় থাকা না থাকা নিয়েও ওইসব দলে আলোচনা চলে। তবে চূড়ান্ত আলোচনার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন সবাই।

সূত্র মতে, এতদিন ধরে চলা আলোচনায় ছিল জামায়াতে ইসলামী ১৯০টির বেশি আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের প্রত্যাশা বেশি থাকলেও কয়েক দফায় বাড়িয়ে তাদের ৪০টির কিছু বেশি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া এনসিপিকে ৩০টির মতো আসন নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৩, খেলাফত মজলিস ৮, এলডিপি ৭, এবি পার্টিকে তিনটি আসন দেওয়ার আলোচনা হয়।

তবে কয়েকটি দলের চাহিদা অনুযায়ী গতকালের বৈঠকে কিছু আসন বাড়ানোর আভাস পাওয়া গেছে। এছাড়া কয়েকটি দল প্রার্থিতা ছাড়াই সমঝোতায় থাকতে পারে। দেশে এর আগেও জোটের রাজনীতিতে এমন নজির আছে বলে জানা গেছে।

আসন সমঝোতার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমদ গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকের ভিত্তিতেই বোঝা যাবে, আসন সমঝোতা কেমন হচ্ছে। আমাদের বিষয়টি চূড়ান্ত না হলেও ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। তবে সমঝোতার সম্ভাবনা ধরে নিয়েই জামায়াত আমির আজ মঙ্গলবার বা আগামীকাল বুধবারের মধ্যে চূড়ান্ত ঘোষণার কথা বলেছেন।

এদিকে গতকাল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হকের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। মামুনুল হকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে বিশেষ করে চলমান ১১ দলীয় সমঝোতার কৌশল নির্ধারণ, পারস্পরিক বোঝাপড়া জোরদার করা এবং সমন্বিত রাজনৈতিক উদ্যোগের বিভিন্ন দিক নিয়ে ফলপ্রসূ মতবিনিময় হয়।

বৈঠকে জাতীয় স্বার্থ, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের ক্ষেত্রে একীভূত রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলা এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’- এর পক্ষে জনমত গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।

এর আগে গত রোববার জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন নাহিদ ইসলাম। সেখানে এনসিপির আসন চূড়ান্তসহ নানা সিদ্ধান্ত হয় বলে জানা গেছে।

১১ দলীয় আসন সমঝোতা প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ গতকাল বিকেলে জানান, আসন সমঝোতার উদ্দেশ্য হলো-জিতে আসা। যে আসনে যে প্রার্থী জিততে পারবেন, সেখানে তিনি দাঁড়াবেন। তিনি আরো বলেন, আসন নিয়ে ইসলামী আন্দোলনসহ সবার সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে। কয়েকটি দলের চাহিদা বেশি থাকলেও বেশি বাড়ার সুযোগ নেই। বাকিদের চাহিদা স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না ইনশাল্লাহ।

জামায়াতের শীর্ষ আরেক নেতা গতকাল বিকালে জানান, সোমবার রাতের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে আসন চূড়ান্ত করার কথা থাকলেও তা চূড়ান্ত হয়নি। সমঝোতা না হলে কোনো আসন উন্মুক্ত রাখা হবে কি না, সেটাও আলোচনা করা হয়। প্রয়োজনে আরো দুয়েকটি আসনে ইসলামী আন্দোলনকে জামায়াত ছাড় দেবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...