আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সুনামগঞ্জে নির্বাচনি প্রচারে সরব প্রার্থীরা, গণভোটে নীরব

জসীম উদ্দিন, সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জে নির্বাচনি প্রচারে সরব প্রার্থীরা, গণভোটে নীরব

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি রাষ্ট্র সংস্কারসংক্রান্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশের মতো সুনামগঞ্জেও বইছে নির্বাচনি হাওয়া। প্রার্থীরা যাচ্ছেন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নেরও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে ভোটের দিনে গণভোট নিয়ে নীরব রয়েছেন প্রার্থীরা।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঁচটি আসন রয়েছে হাওবেষ্টিত সীমান্তবর্তী জেলা সুনামগঞ্জে। এ জেলায় সবকটি আসনেই প্রার্থীরা সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের ধারে ধারে যাচ্ছেন। প্রচারণার মাঠে, উঠান বৈঠক কিংবা পথসভায় নানা প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো প্রার্থীই গণভোটের উদ্দেশ্য, গুরুত্ব বা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে কথা বলছেন না।

তবে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে গণভোট নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি। অনেক ভোটারই জানেন না—গণভোটে কী বিষয়ে মতামত দিতে হবে, ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের তাৎপর্য কী, কিংবা এটি রাষ্ট্র পরিচালনায় কী প্রভাব ফেলবে। তবে এই নীরবতার মধ্যেও ব্যতিক্রম জামায়াতের প্রার্থীরা। সুনামগঞ্জের কয়েকটি আসনে জামায়াতের প্রার্থীদের গণসংযোগ ও বক্তব্যে রাষ্ট্র সংস্কার ও গণভোটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে দেখা গেছে। তারা ভোটারদের গণভোটে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছেন এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছেন।

সচেতন নাগরিকগণ জানিয়েছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। এখন সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত গণভোটের পক্ষে বয়ান তুলে ধরে হ্যাঁ জয়যুক্ত করা। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত না হলে গণঅভ্যুত্থান ব্যার্থ হবে বলে তারা মনে করছেন। অপরদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার বক্তব্য হচ্ছে, গণভোটের পক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রচারণা চালানো উচিৎ। এবং দলীয় প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের সাথে এসব বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করা উচিৎ। আমরা চাই গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হোক।

সুনামগঞ্জ ১ আসনের ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী আনিসুল হক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভোটের মাঠে কাজ করছি। হাওরে হাওরে ধানের শীষের গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। গণভোটের পক্ষেও হাওরে গণজোয়ার তুলব ইনশাআল্লাহ।

সুনামগঞ্জ- ২ আসনের প্রার্থী নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমরা গণভোটের পক্ষের লোক। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হোক সেটা আমরা চাই। এটা ঠিক এখনও গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইনি। তবে ২০ তারিখের পর ধানের শীষের ভোটের পাশাপাশি গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইব।

সুনামগঞ্জ- ২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, জুলাই বিপ্লবের একটা প্রত্যাশিত চাওয়া হলো গণভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত না হলে দেশে আর একশো বছরেও মানুষ পরিবর্তনে স্বপ্ন দেখবে না। অতএব আমরা অবশ্যই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্তের পক্ষে। আমরা চাই না ফ্যাসিবাদ আর ফিরে আসুক। আমি দাঁড়িপাল্লার ভোটের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে প্রচার করছি। এমনকি কর্মী সমর্থকরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকহারে গণভোটের প্রচার করছেন।

সুনামগঞ্জ- ৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ইয়াসীন খাঁন বলেন, আমরা চাই দেশে বার বার ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে। এজন্য গণভোটের আয়োজন করেছে সরকার। আমার নির্বাচনি প্রচারে দাঁড়িপাল্লার পাশাপাশি গণভোটের পক্ষে সরব আওয়াজ তুলছি। ইনশাআল্লাহ ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হবে।

একই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশে গত ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম ছিল। ছাত্র জনতার আন্দোলনে আমরা নতুন দেশ পেয়েছি। জুলাই আন্দোলনের সফলতা ফিরে পেতে হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য গণভোটের পক্ষে আওয়াজ তুলছি। সরকারিভাবে এসব প্রচার আরো বেশি করে করার দাবি জানান তিনি।

সুনামগঞ্জ- ৩ আসনে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম বলেন, আমার দল এবি পার্টি জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। আমি নিজেও একজন জুলাইযোদ্ধা। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে ফ্যাসিবাদের জন্ম নেবে।আমরা চাই দেশে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হোক। আমার প্রতীক ঈগল মার্কার পাশাপাশি গণভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইতে শুরু করেছি। রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সরকারিভাবে ব্যাপক প্রচার করা হলে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে।

সুনামগঞ্জ- ৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল বলেন, আমরা গণভোটের পক্ষের লোক। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে গণভোটের বিকল্প নেই। ইতিমধ্যে আমি ধানের শীষের পাশাপাশি গণভোটের জোয়ার তুলবো ভোটের মাঠে। আশা করি ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হবে।

সুনামগঞ্জ- ৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শামস উদ্দিন বলেন, আমি নির্বাচনি প্রচারণার পাশাপাশি গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত করার পক্ষে ভোট চাচ্ছি। আমার কর্মী সমর্থকরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণভোটের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি চাই ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিটি রাজনৈতিক দল একইভাবে ভোটের মাঠে গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো উচিৎ।

জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, ফ্যাসিবাদের মুলোৎপাটন ও জুলাই অভ্যুাত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পক্ষে ভোট ও জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ পক্ষে ভোট দিতে হবে।

সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ বলেন, বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে এই প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনের সাথে একইদিনে গণভোট আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা এখনো শুরু না হলেও প্রার্থীরা বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের পক্ষে ভোট চাওয়ার কৌশল অবলম্বন করছেন। কিন্তু গণভোটের বিষয়ে ভোটারদেরকে সচেতন করার কোনো উদ্যোগ এখনো উল্লেখ করার মতো চোখে পড়ছে না। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ যে কোনো একটি ভোট দেয়া বা কেন দিতে হবে এ বিষয়টি অনেক সচেতন ভোটারই অবগত নন। তাই গণভোট প্রয়োগ সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। নতুবা গণভোটের মুল স্পিরিট ভেস্তে যাবে বলে মনে করি।

এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সুবিপ্রবি) উপাচার্য ড. নিজাম উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, প্রার্থীদের শুধু নিজেদের জন্য প্রচারণা চালালে চলবে না। যেহেতু একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ওই নির্দিষ্ট বিষয়ে জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া প্রার্থীদের নৈতিক দায়িত্ব। গণভোটের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং নাগরিকের একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেশের নীতি নির্ধারণে কী প্রভাব ফেলবে, তা সহজ ভাষায় প্রচার করা উচিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন