ভোলায় নদীতীর সংরক্ষণ ও বাঁধ

দুর্নীতির শঙ্কায় ফেরত প্রকল্পই আবার একনেকে উঠছে

দুর্নীতির শঙ্কায় ফেরত প্রকল্পই আবার একনেকে উঠছে

মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া এলাকা রক্ষায় প্রকল্পটি আগের একনেক সভায় মান নিয়ন্ত্রণ, বোল্ডারের হিসাব ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে অনুমোদন পায়নি। সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো সেই প্রকল্পই এবার নতুন করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠছে।

আজ মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম একনেক সভার বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনার সময় নদীতীর সংরক্ষণ কাজে ব্যবহৃত বোল্ডারের মান, সংখ্যা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসব উপকরণের কার্যকর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে পানিতে কত বোল্ডার ফেলা হচ্ছে এবং তার হিসাব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা জানতে চাওয়া হয়। এ ধরনের কাজের মান নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের কয়েকটি খাতে প্রস্তাবিত ব্যয় কমানোর কথা বলা হয়।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে জানানো হয়, বোল্ডারের মান বুয়েটের কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। তবে বৈঠকে বলা হয়, পরীক্ষার আওতার বাইরে বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াতেও মান নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বৈঠকে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও বোল্ডারের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিভিন্ন পক্ষ থেকে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ফেরত দেওয়া হয়।

অবশ্য পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার তখন জানিয়েছিলেন, প্রকল্পটি বাতিল হয়নি, সংশোধনের জন্য ফেরত দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয় ২০২২ সালের রেট শিডিউল ধরে প্রাক্কলন করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের নতুন রেট শিডিউল চূড়ান্ত হলে সেই অনুযায়ী ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করে প্রকল্পটি আবার উপস্থাপন করা হবে।

এর আগে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিও (পিইসি) প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে ৫০৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাবকে অত্যধিক মনে করে তা পুনঃযাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে কয়েকটি খাত বাদ দিয়ে নদীতীর সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ব্যয় পুনর্বিন্যাস করা হয়। বাঁধ পুনর্বাসন, ঢাল সংরক্ষণ, পানি নিষ্কাশন কাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্রয় পরিকল্পনাতেও সংশোধন আনা হয়।

তখনকার সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্পের আওতায় চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ছয় কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, ৫.২০ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ এবং দুটি পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণের কথা বলা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পাউবো। চলতি বছর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত এর বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, মেঘনার ভাঙনে ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ও ধনিয়া এবং দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া এলাকার প্রায় চার কিলোমিটার অরক্ষিত অংশে তীব্র ভাঙন চলছে। পাশাপাশি অতিজোয়ার ও ঘূর্ণিঝড়জনিত জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ছয় কিলোমিটার মাটির বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পোল্ডারের ভেতরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। এতে কৃষিজমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকিতে রয়েছে।

পাউবো জানায়, প্রকল্প এলাকায় নদীর স্কাওয়ার গভীরতা মাইনাস ৩৩ মিটার এবং পানি প্রবাহের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩.০৬ মিটার। এ কারণে স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ৫০ থেকে ৭০ মিটার অ্যাপ্রন এবং প্রতি মিটারে ৯৫ ঘনমিটার ডাম্পিং ভলিউম প্রয়োজন। এর মধ্যে অর্ধেক জিওব্যাগ এবং বাকি অর্ধেক কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। সংস্থাটির মতে, এর চেয়ে কম উপকরণ ব্যবহার করলে স্থায়ীভাবে ভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।

পিইসির নির্দেশনায় দৌলতখানের মেদুয়া ইউনিয়নের ৮০০ মিটার বাঁধে কংক্রিট ব্লকের পরিবর্তে টার্ফিংসহ মাটির বাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন কাঠামোর ব্যয় ৩১ কোটি টাকার মধ্যে রাখা এবং বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সাত কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে তিন কোটি ৬১ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছিল।

আইডব্লিউএমের ২০২৩ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি প্রকল্পটির অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ১.৫৬ বেনিফিট-কস্ট রেশিও (বিসিআর) এবং ১৭.৮৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আইআরআর) পাওয়া গেছে। পরিকল্পনা কমিশনের হিসাবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩,৮০৪ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা এবং প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর কৃষিজমি জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আগেরবারের প্রশ্ন ও সংশোধন শেষে এবার প্রকল্পটির ভাগ্য নির্ধারণ হবে একনেকের আজকের সভায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...