নিবন্ধন পেতে ইসিতে নামসর্বস্ব দলের তৎপরতা

গাজী শাহনেওয়াজ

নিবন্ধন পেতে ইসিতে নামসর্বস্ব দলের তৎপরতা

নবগঠিত নির্বাচন কমিশন নতুন দলের নিবন্ধনের জন্য এখনো কোনো নির্দেশনা না দিলেও নামসর্বস্ব কিছু দল নিবন্ধন পেতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে। এর মধ্যে একটি দলের নিবন্ধন ফাইল পুনঃতদন্তের জন্য নির্দেশনা মিলেছে। নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে, অনেক দল ইসিতে আসছে-যাচ্ছে। পদত্যাগী আউয়াল কমিশনের সময়ে কয়েকটি দল নিবন্ধন পেয়েছে। কিন্তু নতুন দলের নিবন্ধনের জন্য এখনো কমিশন থেকে কোনো নিদের্শনা পাওয়া যায়নি; আর এ বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়নি।

কমিশনের সূত্রমতে, অতীতে আওয়ামী লীগ ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তাদের আজ্ঞাবহ কমিশন ‘কিংস পার্টি’খ্যাত দলকে নিবন্ধন দিয়ে নেতিবাচক সমালোচনার নজির সৃষ্টি করেছিল। বর্তমান কমিশন কারো প্রেসক্রিপশনে বিগত কমিশনের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে নতুন করে বিতর্ক তৈরির আশঙ্কা রয়েছে বলে কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন। তবে এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে কোনো কর্মকর্তাই কথা বলতে রাজি হননি। এর মধ্যে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন দল গঠন ও ইসির নিবন্ধন নিয়ে সমালোচনা করে কথা বলেছেন। ওই বক্তব্যের জেরে ভুঁইফোঁড় দল নিবন্ধন নিয়ে বর্তমান কমিশন আলোচনায় উঠে আসতে পারে- এমন আশঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান, সদ্য বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) সাবেক কমিশন সচিব শফিউল আজিসের সময়ে দুটি দল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তড়িঘড়ি করে নিবন্ধন পেয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এক রকম জোরপূর্বক তারা ইসির নিবন্ধন আদায় করে নেন। কমিশন সচিব তার চেয়ার রক্ষার্থে নিবন্ধনের কিছু ত্রুটি সত্ত্বেও আপত্তি তোলেননি। তথ্য সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরই ৯ আগস্ট দুটি দল গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) ও নাগরিক ঐক্য নিবন্ধন পায়। এই নিবন্ধনে সাবেক কমিশন সচিবের হাত ছিল বলে জানান ইসির অন্তত তিনজন কর্মকর্তা। তবে নিবন্ধনের জন্য গণঅধিকার পরিষদ নামে ২০২২ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দলটির আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া আবেদন করেন। তখন দলের সদস্য সচিব ছিলেন নূর হোসেন নুর।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিব শফিউল আজিম আমার দেশকে বলেন, কারোর নিবন্ধন সচিবের দেওয়ার ক্ষমতা নেই। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আওয়ালের নেতৃত্বাধীন পুরো কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে দল দুটিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। সচিব এক্ষেত্রে শুধু রুটিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি বলেন, গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব ছিল। একদিকে ভিপি নুরুল হক নুর, অন্যদিকে তাদের পার্টির প্রধান ড. রেজা কিবরিয়া। পরে এই দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয় রেজা কিবরিয়ার। বর্তমানে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর এবং দলটির কাগজপত্রে ছোটখাটো ত্রুটি সত্ত্বেও তার দলটিকে নিবন্ধন দিয়েছিল সাবেক কমিশন। আর নাগরিক ঐক্য সম্ভবত আদালতের রায়ে নিবন্ধন পান।

এ ব্যাপারে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সেলফোন নম্বরে কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। এদিকে রেজা কিবরিয়ার গণঅধিকার পরিষদ গত ২৭ নভেম্বর তার দলের নিবন্ধন পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছেন। তারা ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর আবেদন করেছিলেন। দলের সদস্য সচিব ফারুক হাসান আমার দেশকে বলেন, ভিপি নূর কোনো আবেদন করেননি, কিন্তু তিনি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর জোরপূর্বক নিবন্ধন নিয়েছেন। কমিশনের তৎকালীন সচিব এ ব্যাপারে তাকে সহযোগিতা করেন।

বিপ্লবের পর আদালতের নির্দেশনার আলোকে গণসংহতি ও এবি পার্টি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পেয়েছে। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দু-একটি দল নিবন্ধন পেলেও আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আগে নতুন দলের নিবন্ধনের জন্য কমিশন থেকে কোনো নিদের্শনা নেই। এমনকি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেননি কমিশন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অতীতের মতো নতুন দল নিবন্ধন পেতে থাকলে বর্তমান কমিশন সমালোচনার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ আমার দেশকে বলেন, অনেক দল ইসিতে আসছে-যাচ্ছে। পদত্যাগী তৎকালীন কমিশনের সময়ে কয়েকটি দল নিবন্ধন পেয়েছে। কিন্তু নতুন দলের নিবন্ধনের জন্য এখনো কমিশন থেকে তিনি কোনো নিদের্শনা পাননি এবং গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়নি। এর বেশি তার কিছু জানা নেই বলে জানান প্রশাসন সার্ভিসের এই অতিরিক্ত সচিব।

বিগত হাসিনা সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন তার দলের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী, কিংস পার্টিখ্যাত নামসর্বস্ব দলকে নিবন্ধন দিয়ে সব নীতি লঙ্ঘন করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, বিএনপির বিকল্প অধিকসংখ্যক রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনমুখী করে আন্তর্জাতিক মহলে নির্বাচনের বৈধতা অর্জন করা। কিন্তু কয়েকটি দলকে নিবন্ধন দিয়েও দেশে-বিদেশে অর্জন করতে পারেনি নির্বাচনের বৈধতা।

বিতর্কিত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনের ১৫১ জন এমপির বিনা ভোটের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতের ভোটের সাক্ষী কে এম নুরুল হুদার অধীন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সর্বশেষ পদত্যাগী কাজী হাবিবুল আওয়াল কমিশনের নেতৃত্বাধীন ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ড্যামি (আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগের দলীয় ড্যামি প্রার্থী) নির্বাচন বৈধতা পায়নি।

বিগত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা সরকারের একতরফা নীলনকশার নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দেয় বিএনপি-জামায়াতসহ সমমনা দলগুলো। দলের সংখ্যা বাড়াতে কাজী রকিব উদ্দীনের কমিশন বিএনএফ নামে একটি ভুঁইফোঁড় দলকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার জোর তদবিরে ও পদত্যাগী সরকারের পরামর্শে নিবন্ধন দেয়। অথচ দলটির নিবন্ধনের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল না। একতরফা নির্বাচনে একবার এমপি হওয়ার পর ওই দলের নেতার ও দলের অস্তিত্ব বলা চলে বিলুপ্ত।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের আগে নামসর্বস্ব কয়েকটি দলকে নিবন্ধন দেওয়ার উদ্যোগ নেয় কমিশন। এমনকি ৭০টি দলের তথ্য চূড়ান্ত করে। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে আসায় ভুঁইফোঁড় দলের কদর আওয়ামী লীগ ও কমিশনের কাছে ফিকে হয়ে আসে। এরপর সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে শমশের মোবিন চৌধুরী ও তৈমুর আলম খন্দকারের কিংস পার্টিখ্যাত তৃণমূল বিএনপি নামে দলটিকে নিবন্ধন দেয়। অথচ দলটি একটি আসনও পায়নি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা গদিচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য রাষ্ট্রব্যবস্থা ও তার অধীনস্থ সরকারি-বেসরকারি, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় সুশাসন নিশ্চিত করে প্রাপ্যতানুযায়ী সেবা প্রদান করা।

কিন্তু নতুন কমিশনের কার্যক্রমে প্রশ্ন উঠেছে যে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন কি বিগত সরকারের মদতপুষ্ট কমিশনের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে যাচ্ছে কি না। ইসির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশ লেবার পার্টি নামে একটি নামসর্বস্ব দলকে নিবন্ধন পেতে সহায়তা করছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। এর মধ্যে দলটির পুরোনো নথি পর্যালোচনা শুরু করেছে ইসির নিবন্ধন শাখা। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। দলটির নিবন্ধন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ইসির নিবন্ধন শাখার উপসচিব মাহবুব শাহ আমার দেশের কাছে এ সংক্রান্ত বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। কিন্তু ৫ আগস্টের পর বিগত সময়ে ন্যায়বিচার না পাওয়ার অভিযোগ তুলে ধরে কিছু দল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে জানান তিনি।

দল নিবন্ধনের বিষয়ে জানতে চাইলে, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান আমার দেশকে বলেন, আমার দলের তথ্যে কিছু ঘাটতি ছিল। সেগুলো কমিশনকে পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ করেছিলাম; তার আলোকে কমিশন মাঠপর্যায়ে তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছে। সেটা পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে এবং আমাদের যে অফিসসহ অনুষঙ্গিক ঘাটতি ছিল সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা করছি। নিবন্ধন পেতে একটু সময় লাগতে পারে। বিগত সরকারের সময়ে নিবন্ধন পাননি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সরকারের অ্যান্টি ছিলাম। কেন আমাদের নিবন্ধন দেবে আপনিই বলেন।

এক-এগারো সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ড. শামসুল হুদা কমিশনের নেতৃত্ব প্রথম রাজনৈতিক দলকে জবাবদিহির আওতায় আনতে নিবন্ধন প্রথা চালু করা হয়। নামসর্বস্ব শতাধিক দল থেকে মাত্র ৩৯টি দলকে নিবন্ধন প্রদান করেছিল কমিশন।

দল নিবন্ধনের শর্তে ৪ (ক) ধারায় বলা আছে, নতুন একটি দলের ইসির নিবন্ধন পেতে চাইলে তিনটি শর্তের যে কোনো দুটি পূরণ করতে হবে। শর্তের মধ্যে রয়েছে- ‘দরখাস্ত দাখিল করিবার তারিখ হইতে পূর্ববর্তী দুইটি সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক লইয়া কমপক্ষে একটি আসন লাভ, বা উপরোক্ত সংসদ নির্বাচনের যে কোন একটি দরখাস্ত দল কর্তৃক নির্বাচনে অংশগ্রহণকৃত আসনের প্রদত্ত মোট ভোটের শতকরা পাঁচ ভাগ ভোট লাভ; বা দলের সাংগঠনিক কাঠামোর স্থিতি হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ, উহা যে নামে অবহিত হোক না কেন একটি সক্রিয় দপ্তর এবং অন্যূন ১০০ উপজেলা বা ক্ষেত্রমতো মেট্রোপলিটন থানার প্রতিটিতে কার্যকর দপ্তরসহ ন্যূনতম ২০০ ভোটার সদস্য হিসেবে দলের তালিকাভুক্তি।

আওয়ামী লীগ মদতপুষ্ট কমিশন নিবন্ধন শর্তের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেনি, যা নিয়ে সে সময়ে চলছিল জোর সমালোচনা। অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বর্তমান কমিশনও যদি আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ কমিশনের মতো একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নামসর্বস্ব কিংস পার্টিখ্যাত দলকে নিবন্ধন দিতে শুরু করে, তাহলে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আস্থা হারাতে পারে- এমন আশঙ্কা কর্মকর্তাদের। এর মধ্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভুঁইফোঁড় বা কিংস পার্টির তৎপরতা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক দল গঠিত হলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন