বঙ্গভবনের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক সরকারের

Noman
এম এ নোমান

বঙ্গভবনের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক সরকারের

বঙ্গভবনের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক এখন কেমন, তা নিয়ে বিভিন্ন কানাঘুষা চলছে। সম্পর্ক কি শীতল হয়ে পড়েছে—এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান এবং তার আগে-পরে বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সম্পর্ক অনেকটাই উষ্ণ দেখা গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সম্পর্কে বরফ জমার ইঙ্গিত মিলছে।

মূলত রাষ্ট্রপতির লন্ডন সফরের পর নাটকীয়ভাবে সরকারের সঙ্গে আগের তুলনায় সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়েছে। চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি কাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন, কী করেছেনÑএসব বিষয়েও বিভিন্ন আলোচনা আছে। প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে তার গতিবিধির বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে বঙ্গভবনের সঙ্গে সরকারের বিরাজমান সম্পর্কের বিষয়টি সাংবিধানিক ও স্বাভাবিক সম্পর্ক হিসেবে দেখছেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় বঙ্গভবনের সঙ্গে যতটুকু সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন, সরকারের পক্ষ থেকে তা পুরোপুরি রক্ষা করা হচ্ছে বলেও জানান তারা।

গত ২১ মার্চ সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিকসহ সর্বস্তরের মুসল্লি অংশ নেন। নামাজ শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হৃদ্যতাপূর্ণ কোলাকুলির ছবিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়।

এরপর গত ২৮ মে সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহে ঈদুল আজহার প্রধান জামাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। তবে আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাদের জন্য পাশাপাশি দাঁড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। রাষ্ট্রপতির দাঁড়ানোর জায়গার কিছুটা দূরে প্রধানমন্ত্রীর জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়। আর এ ব্যবস্থাকে সরকার ও বঙ্গভবনের শীতল সম্পর্কের ইঙ্গিত বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। বঙ্গভবনের দরবার হলের পরিবর্তে অতীতের প্রথা ভেঙে জাতীয় সংসদ ভবনের ঐতিহাসিক দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন ১৭ ফেব্রুয়ারি। শপথ অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাক্ষাতে তারা পরস্পর কুশল বিনিময় করেন। ওই সময় তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন।

গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি পতিত স্বৈরশাসককে ফ্যাসিস্ট হিসেবে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের অপশাসন ও দুঃশাসনের বর্ণনা তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে এ অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের কথাও তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, হাজার হাজার শহীদের রক্ত ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ শহীদ হয়েছেন। নারী-পুরুষ ও শিশুসহ কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়েছেন। পাঁচ শতাধিক মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি বলেন, ত্রয়োদশ সংসদের এ উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই গৌরবময় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং সব সংসদ সদস্যকে (এমপি) আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সময় টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারের এমন ব্যবচ্ছেদ ঘটে বাজেট অধিবেশনের দিন।

সংসদ ভবন সূত্র জানিয়েছে, গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ‍অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদে পৌঁছান। এরপর তিনি সংসদে উত্থাপনের জন্য প্রস্তুতকৃত অর্থবিলে স্বাক্ষর করেন। এ বিলে স্বাক্ষরের জন্য অর্থ সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানসহ সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট বক্সে যান। এরপর বেলা ৩টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তিনি সংসদ কক্ষের প্রেসিডেন্ট বক্সে উপস্থিত থাকলেও সংসদ নেতা, স্পিকার, হুইপসহ সরকারি সংসদীয় দলের কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে যাননি। বাজেট অধিবেশন শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারি দলের কেউ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে না আসায় তিনি দ্রুত সংসদ ত্যাগ করে বঙ্গবভনে চলে যান।

তার আগে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনে পৌঁছানোর পর নর্থ প্লাজার প্রেসিডেন্সিয়াল স্কয়ার দিয়ে তিনি সংসদ ভবনে প্রবেশ করেন । রীতি অনুযায়ী সংসদে বাজেট অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি এলে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তাকে স্বাগত জানিয়ে থাকেন। তারপর সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তাকে সঙ্গে নিয়ে চলন্ত সিঁড়িতে করে সংসদ কক্ষের (প্রেসিডেন্সিয়াল লবি) দিকে এগিয়ে যান। এরপর লবি থেকে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ ভবন কক্ষের নির্দিষ্ট প্রেসিডেন্ট বক্সে গিয়ে আসন গ্রহণ করেন।

নির্বাচনের পর সরে যেতে চেয়েছিলেন

ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নিজের পদ থেকে সরেও যেতে চেয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গত বছরের ১১ ডিসেম্বর তিনি এ পরিকল্পনার কথা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে জানান। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি চলে যেতে আগ্রহী। আমি (বঙ্গভবন থেকে) বেরিয়ে যেতে চাই।’

সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে ওই সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন না হয়, ততক্ষণ থাকা উচিত। আমি মূলত সংবিধানসম্মত পদমর্যাদা রক্ষা করার জন্যই এখানে আছি।’

আলোচনায় রাষ্ট্রপতির লন্ডন সফর

ফলোআপ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ৯ মে লন্ডন যান। লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন সূত্র আমার দেশকে জানায়, চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতি পরিবারসহ প্রথমে লন্ডনের বিলাসবহুল হোটেল হিলটনে ওঠেন। সেখানে দুদিন অবস্থানের পর ওঠেন ক্যামব্রিজের নিউ মার্কেট এলাকার বিলাসবহুল রিসোর্ট বেডফোর্ড লজে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে হৃদরোগের ফলোআপ চিকিৎসা নেন রাষ্ট্রপতি ও তার স্ত্রী রেবেকা সুলতানা।

লন্ডন হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, শুক্রবার জুমার দিন তারা (রাষ্ট্রপতির পরিবার) শপিংয়ের জন্য বের হন। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত রাষ্ট্রপতির প্রটোকল ও মুভমেন্টের জন্য হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সাতটি বিলাসবহুল গাড়ি ভাড়া করা হয়। এসব গাড়ি নিয়ে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ান রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গীরা।

রাষ্ট্রপতির ৯ দিনের বিলাসবহুল সফরে দুই ডজনের মতো সফরসঙ্গীর বিপুল ব্যয় নিয়ে সরকারি পর্যায়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। সেখান থেকে ১৮ মে তিনি দেশে ফেরেন। রাষ্ট্রপতির লন্ডন সফর নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ব্যাপক প্রশ্ন তৈরি হয়।

সূত্র জানিয়েছে, লন্ডন সফরকালে রাষ্ট্রপতির কোনো কোনো কার্যক্রম সরকারের মনঃপূত হয়নি।

অস্বস্তি থেকে স্বস্তিতে ফেরা

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সম্পর্ক খুব একটা সুখকর ছিল না বঙ্গভবনের। গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের আড়াই মাস পর একটি সংবাদপত্র রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘তিনি (রাষ্ট্রপতি) শুনেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন; কিন্তু তার কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই।’ এমন সংবাদ প্রকাশের পর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলন হয়। তারা কয়েক দিন বঙ্গভবন ঘেরাও করে রাখেন।

শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি সামনে আনায় রাষ্ট্রপতির বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও। ব্যাপক প্রতিক্রিয়া, আলোচনা ও সমালোচনার পর বঙ্গভবন থেকে বিষয়টি পরিষ্কার করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগকেন্দ্রিক মীমাংসিত বিষয়ে নতুন করে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিতর্ক সৃষ্টি করে অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল কিংবা বিব্রত করা থেকে বিরত থাকার জন্যও সবার প্রতি আহ্বান জানান।’

বঙ্গভবনের এ বিবৃতির পর আন্দোলন স্তিমিত হলেও সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের দূরত্ব আর ঘোচেনি। রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে তার প্রেস বিভাগও সরিয়ে নেওয়া হয়। সেইসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস, কনস্যুলেট ও হাইকমিশন থেকে তার প্রতিকৃতিও সরিয়ে ফেলা হয়। যেটা রাষ্ট্রপতি রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও উল্লেখ করেছেন।

রাষ্ট্রপতি ওই সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির প্রতিকৃতি সব কনস্যুলেট, দূতাবাস আর হাইকমিশনে ছিল। এক রাতে সেগুলো হঠাৎ তুলে ফেলা হয়েছে। এতে জনগণের কাছে ভুল বার্তা যায়- হয়তো রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এতে আমি গভীরভাবে অপমানিত বোধ করেছি। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি লিখেও কোনো প্রতিকার পাইনি।’

আমার দেশকে যা বলেছেন রাষ্ট্রপতি

শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর আমার দেশ-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের বেশকিছু আগ্রহ আর ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। রাত আটটা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টার এ আলাপচারিতায় বেরিয়ে আসে শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের নানা ঘটনাপ্রবাহ। জুলাই আন্দোলনের শেষের দিনগুলোতে বঙ্গভবনের সঙ্গে শেখ হাসিনার উন্মত্ত আচরণ ও জরুরি অবস্থা জারির জন্য পীড়াপীড়ির বিষয়টিও উঠে আসে আলাপচারিতায়। হাসিনার সঙ্গে নানা বিষয়ে তার মতবিরোধের কথা বলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। কী নিয়ে সেই মতবিরোধ? সেসব কথাও অকপটে আমার দেশকে বলেন তিনি।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ৩ আগস্ট থেকে দেশের শাসনভার কার্যত আওয়ামী লীগ সরকারের হাতের বাইরে চলে যায়। এটার প্রেক্ষাপটও আপনারা সবাই জানেন। মূলত রংপুরে আবু সাঈদকে হত্যা করার বিষয়টি দেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং সবাইকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে গুলি করে হত্যা করাটা কোনোভাবেই দেশের মানুষ মেনে নিতে পারেনি। আন্দোলন দমাতে গিয়ে সরকার ভুল পথে হেঁটেছে বলেও মনে করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গভবন থেকে পত্রপত্রিকা ও মিডিয়ার সুবাদে যতটুকু তথ্য পেয়েছি, তাতেও মনে হয়েছে, সরকার টিকতে পারবে না। কারণ আন্দোলনে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ততদিনে রাজপথ পুরোটাই সরকারের বিপক্ষে চলে গেছে।

শোনা যাচ্ছিল, শেখ হাসিনা পলায়নের দুইদিন আগে আপনাকে দেশে জরুরি অবস্থা জারির পরামর্শ দিয়েছিলেন। আপনি এ পরামর্শ রাখলেন না কেন? আমার দেশ-এর এ প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি যতটুকু তথ্য রাখতাম, তাতে মনে হয়েছিল, জরুরি অবস্থা জারি করেও ছাত্র-জনতার উত্তাল ঢেউ রোখা কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও পদত্যাগপত্র নিয়ে একটি বিতর্ক উঠেছিল। আপনার বক্তব্য একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশের পর এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। ছাত্ররা আপনার পদত্যাগও দাবি করেছিল। এগুলোকে আপনি কীভাবে নিয়েছেন? জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, শেখ হাসিনার পতন, পদত্যাগ ও পালিয়ে ভারতে আশ্রয়গ্রহণÑ এগুলো সবই মীমাংসিত বিষয়। এখানে কোনো ধরনের বিতর্ক কিংবা সন্দেহ সৃষ্টির সুযোগ নেই। যেখানে নতুন সরকার নিয়োগ হয়েছে, শপথ হয়েছে, উপদেষ্টাদের দপ্তর বণ্টন হয়েছে, কার্যক্রম চলছে। আগের সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কাজেই এসব বিষয় নিয়ে বিন্দুমাত্র বিতর্কের সুযোগ নেই।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি কর্মজীবনের পুরোটাই আইন নিয়ে কাজ করেছি। কাজেই আমি মনে করেছি, শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নেওয়া সমীচীন। কারণ, সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার একমাত্র প্রতিষ্ঠান। বঙ্গভবন থেকে সব বিষয় ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরেই সুপ্রিম কোর্টের মতামত চাওয়া হয়েছে। আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পক্ষে সর্বসম্মতভাবে মতামত দিয়েছে। এ মতামত না নিলেও কোনো অসুবিধা ছিল না। তারপরেও আমি কোনো অধ্যায় বাকি রাখতে চাইনি। আমি সেটা করেছি রাষ্ট্র, জনগণ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ সুরক্ষার তাগিদ থেকে।

বঙ্গভবনে এখন কেমন আছেন, কবে নাগাদ পদ ছাড়তে চান? এমন প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে। জবাবে স্মিত হেসে বললেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ পদে আছি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকে রাষ্ট্রের কল্যাণে যতটুকু করার সর্বোচ্চটা করার চেষ্টা করেছি। এখন সম্মানের সঙ্গে যেতে চাই। সরকার যখন বলবে, আমি বঙ্গভবন ছাড়তে প্রস্তুত।

সরকারের স্বাভাবিক কৌশলÑবলছেন বিশ্লেষকরা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ আমার দেশকে বলেন, একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও কাঙ্ক্ষিত মানের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। সংবিধান ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার পাশাপাশি তাদেরও একটি রাজনৈতিক কৌশল অবশ্যই থাকবে। এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়।

আর সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে বিএনপি সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকারে এসেছে। রাষ্ট্রপতি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োজিত হলেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তাকে সম্মান করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই বঙ্গভবনের সঙ্গে সরকারের সাংবিধানিক সম্পর্ক রাখতে হবে।

সাংবিধানিক সম্পর্কের কথা বলছেন নীতিনির্ধারকরা

বঙ্গভবনের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক শীতল হওয়ার প্রেক্ষাপট নিয়ে আমার দেশ প্রশ্ন করে মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সিনিয়র সদস্যের কাছে। বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে প্রশ্ন ছিল- লন্ডন সফরের পর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারের সম্পর্কে কোনো ধরনের শীতলতা তৈরি হয়েছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদ বলেন, বঙ্গভবন কিংবা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক সাংবিধানিক। আমরা কনস্টিটিউশনাল রিলেশনটা রেখেই কাজ করে চলছি।

একই প্রশ্ন ছিল আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে। জবাবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বঙ্গভবনের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন আমার দেশকে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতনের পর দেশে একটি কার্যকরী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এ গণতন্ত্র পেয়েছি। এ প্রক্রিয়ায় দেশে অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জননেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াই সাংবিধানিক বিধি-বিধানের ভিত্তিতে সুসম্পন্ন হয়েছে। এ কারণে আমরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছেও শুকরিয়া আদায় করছি।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, একদিকে গণঅভ্যুত্থান, আরেকদিকে জুলাইয়ের হাজারো শহীদের রক্ত, সবকিছুই ধারণ করেছে আমাদের সংবিধান। সেই কারণেই বঙ্গভবন সংবিধানের রক্ষক হিসেবে স্বৈরাচারের পতনের পর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের সর্বসম্মত মতামতের ভিত্তিতে একটি সরকার গঠন করেছে। এই মুহূর্তে দেশে একটি কার্যকরী সংসদ রয়েছে। এ সংসদের অভিভাবক হচ্ছে রাষ্ট্র। আর সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের অভিভাবক হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি। সরকার এখন বঙ্গভবনের সঙ্গে সাংবিধানিক ও ওয়ার্কিং রিলেশন (স্বাভাবিক সম্পর্ক) চর্চা করছে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন