সব ধরনের জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সর্বত্র। বেড়েছে বাস ভাড়া, পণ্য পরিবহনকারী ট্রাক-লরি ভাড়া এবং সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। শিল্পোৎপাদন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়েছে অস্বাভাবিক চাপ। অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ায় রাস্তাঘাটে ঝগড়া-বিবাদও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে গণপরিবহন ও কাঁচা বাজারগুলোতে বিবাদ বেশি দেখা গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গণপরিবহনের চালক-হেলপার, কাঁচাবাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে দেখা গেছে ক্ষোভ ও হতাশা। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না কেউই। কারওয়ান বাজারের টং দোকানি বাবলু শেখ বলেন, ‘তেলের দাম বাইড়া যাওয়ায় গত দুইদিন ধইরা বিক্রি অনেক কোইমা গ্যাছে। মানুষ মনে হয় চা খাওয়াও ছাইড়া দিছে!’
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাসের ভাড়া কিলোমিটার (কিমি) প্রতি ১৭ পয়সা করে বাড়ানো হয়েছে। গতকাল সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তখন বাসের ভাড়া কিমিপ্রতি ১১ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এবার বাড়ানোর আগে পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া কিমিপ্রতি ছিল দুই টাকা ৫৩ পয়সা। নতুন ভাড়া হবে দুই টাকা ৭০ পয়সা। আর মিনিবাসের ভাড়া দুই টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে হবে দুই টাকা ৫৯ পয়সা।
রাজধানীর ফার্মগেট থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে সাইনবোর্ডের দূরত্ব ১৪.৪০ কিমি। নতুন নির্ধারিত কিমিপ্রতি ২.৭০ টাকা পয়সা হিসাবে এ পথের ভাড়া হবে ৩৮.৪৪ টাকা। এই রুটের লাব্বাইক পরিবহনে আগেই নেওয়া হতো ৪০-৪৫ টাকা। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পর থেকে নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। ফার্মগেট থেকে মালিবাগ পর্যন্ত এতদিন ভাড়া ছিল ১০ টাকা, এখন নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা।
অন্যদিকে দূরপাল্লার পথে ৫২ আসনের বাসে কিমিপ্রতি ভাড়া এতদিন ছিল দুই টাকা ২৩ পয়সা। বর্ধিত ভাড়া হবে দুই টাকা ৪০ পয়সা। যদিও রাজধানীর প্রায় প্রতিটি রুটেই তেলের দাম বৃদ্ধির পর থেকে যাত্রীপ্রতি ৫-২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। আর ঢাকার বাইরে দূরত্ব ও বাসভেদে ভাড়া বেড়েছে যাত্রীপ্রতি ৫০-৩০০ টাকা পর্যন্ত। বর্ধিত ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে চালক-হেলপারের তর্ক-বিতর্ক ক্রমেই ঝগড়া-বিবাদে রূপ নিচ্ছে।
কাঁচাবাজারে প্রভাব
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কাঁচাবাজারে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে জানিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতারা বলছেন, সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ৫-১৫ টাকা বেড়েছে। ৬০-৭০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ সবজির দাম এখন ৭০-৮০ টাকা। সবচেয়ে কম দামি সবজি আলু ও পেঁপের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২৫-৪০ টাকায়। বেগুনসহ কিছু সবজির দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেলের দাম আগে থেকেই বেশি। এখন পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে ক্রেতার হাঁসফাঁস অবস্থা। এ নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতারা প্রতিনিয়ত বিতর্কে লিপ্ত হলেও সমাধানের কোনো সূত্র তারা বের করতে পারছেন না। পাইকারি বিক্রেতাদের দাবি, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সবজি সংগ্রহের ক্ষেত্রে পারিবহন খরচ দূরত্ব ও ট্রাকভেদে ২০০০-৬০০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বেশি চাপে রাইড শেয়ারকারীরা
ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের হাত থেকে রক্ষা পেতে লাখ লাখ শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত যুবক রাইড শেয়ারিং তথা মোটর সাইকেলে যাত্রী পরিবহন করে জীবনযাপনের পথ বেছে নিয়েছেন। অকটেন-পেট্রোলের দাম বাড়ায় চরম বেকায়দায় পড়েছেন তারা। রাইড শেয়ারার আলাউদ্দিন বলেন, তেলের দাম বাড়ছে, কিন্তু মোটর সাইকেলের ভাড়া বাড়েনি। যাত্রী কম হওয়ায় একটি ট্রিপের (যাত্রা) জন্য কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে ৮০০-৯০০ টাকা আয় করাই মুশকিল হয়ে পড়েছে।
শিল্পোৎপাদনে গতি কমবে
বিভিন্ন পর্যায়ের শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে তাদের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিকসহ সব রকম কারখানায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিজেল প্রয়োজন উল্লেখ করে উদ্যোক্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নতুন করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে পণ্যের উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসবে।
বেড়েছে ট্রাক ভাড়াও
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে ট্রাক ভাড়া বেড়ে গেছে। দূরত্ব, পরিবহনের আকার ও পণ্যভেদে প্রতি ট্রিপে ভাড়া বেড়েছে ২০০০-৮০০০ টাকা। জ্বালানির পাশাপাশি টায়ার, যন্ত্রাংশের মূল্য এবং ফেরি ভাড়া বৃদ্ধির কারণেও ট্রাকের ভাড়া বেড়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বাড়তি খরচ সামলাতে না পেরে অনেকে ট্রাক বের করছেন না বলেও জানা গেছে। বেনাপোল থেকে ঢাকায় আগে ট্রাক ভাড়া ছিল ২০-২১ হাজার টাকা। গতকাল সেই ভাড়া নেওয়া হয়েছে ২৫-২৬ হাজার টাকা। ট্রাক ভাড়া বৃদ্ধি ও ট্রাক সংকটের অজুহাতে ট্রাক ভাড়া বৃদ্ধি করায় বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে অনেকে আমদানি করা মালামাল খালাস করতে সমস্যায় পড়েন। তারা জানান, প্রতিদিন যেখানে ৪০০-৬০০ ট্রাক পণ্য লোড-আনলোডিং হতো, এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার দাবি
কোনো আলোচনা, গণশুনানি, জনপরামর্শ ও অংশীজনের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা কিংবা মূল্যবৃদ্ধির সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রকাশ্য মূল্যায়ন ছাড়াই আকস্মিকভাবে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে গবেষণা ও নীতি সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা ও রাজস্ব চাপের অজুহাতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনস্বার্থবিরোধী, অপরিণামদর্শী ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্তরায় মন্তব্য করে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আদিল খান জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরকারের এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান।
বিদ্যুতের দামও কী বাড়বে?
বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভর্তুকি কমাতে এমনিতেই বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়াতে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপ অব্যাহত আছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। কারণ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্রমেই জ্বালানি তেলের ব্যবহার বাড়ছে। তাদের অনুমান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভর্তুকি কমাতে শিগগিরই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ালেও সমস্যা, কমালেও সমস্যা উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যয় কমাতে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানোর চিন্তা করা হয়, সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান লোডশেডিং আরো বাড়বে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য, কৃষির উৎপাদন, শিল্পোৎপাদন— সবই বাড়বে জানিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে কারখানার পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। কারখানা থেকে পণ্যের সরবরাহ ব্যয়ও বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, এমনিতেই নিম্নআয়ের মানুষ তীব্র চাপে আছেন। তার ওপর জ্বালানি তেলের দাম নতুন করে বাড়ানোয় পরিবারের মাসিক বাজেটে আরো বড় চাপ তৈরি করতে পারে। এর ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বৈষম্য আরো বেড়ে যাওয়ার মতো অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখতে হতে পারে।
বারবার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ালে দেশে দারিদ্র্য বেড়ে যাবে আশঙ্কা করে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইতিমধ্যে দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় বলা হয়েছে। এমতাবস্থায় সরকারের ব্যয় কমানোর দিকে নজর দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



