সুতা আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে, হুমকিতে দেশি উদ্যোক্তারা

সুতা আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে, হুমকিতে দেশি উদ্যোক্তারা
আমার দেশ গ্রাফিক্স

দেশে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানি দিন দিন বাড়ছে। এর বিপরীতে ৩২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা দেশি উদ্যোক্তাদের প্রায় অর্ধেক সক্ষমতাই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদন লাইন বসে থাকায় পুরো ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হুমকিতে রয়েছেন দেশি প্রাথমিক বস্ত্রশিল্পের উদ্যোক্তারা। এ কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক মনে করছেন তারা। পাশাপাশি স্থানীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইলশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অটোমেটেড সিস্টেম ফর কাস্টমস ডেটা (অ্যাসাইকুডা) অনুযায়ী দেশে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানি দুবছরের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসব পণ্যের আমদানি ছিল ৩৫০.৮ মিলিয়ন কেজি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯৭.১ মিলিয়ন কেজিতে। ওই বছরের আমদানি করা সুতার মূল্য ছিল প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট সুতা আমদানির বিল প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতার অংশ ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ, স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো যখন উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে সংকটে, তখন একই সময় তুলনামূলক সস্তা বিদেশি সুতা দেশের বাজারে দ্রুত প্রবেশ করেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এর ফলে দেশি মিলের উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

সরকারি বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, একটি প্রতিবেশী দেশ থেকে এইচএস হেডিং ৫২০৫-এর আওতায় সুতা আমদানি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রায় ২১ কোটি কেজি থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫৩ কোটি ১২ লাখ কেজিতে পৌঁছেছে। দুবছরের ব্যবধানে এ বৃদ্ধির হার প্রায় ১৫৬ শতাংশ। এই দ্রুত প্রবৃদ্ধিই দেশি সুতা উৎপাদকদের উদ্বেগের অন্যতম প্রধান কারণ।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দাবি, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে এনে দেশের বন্ধ ও অর্ধ বন্ধ টেক্সটাইল কারখানাগুলো কার্যকরভাবে চালু করা গেলে এ খাতেই প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) তথ্য অনুযায়ী ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতার আমদানি কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে বছরে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব। সরকারের নির্বাচনি মেয়াদে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, দেশি টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্পের সক্ষমতা বাড়ালে সে লক্ষ্য বাস্তবায়ন আরো সহজ হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

বিটিটিসির মতে, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতায় বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি মূলত আমদানি বন্ধ করার জন্য নয়, বরং এর বিপরীতে আমদানিকে ব্যাংক গ্যারান্টি, রপ্তানির প্রমাণ এবং যাচাইযোগ্য হিসাবের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এসব সুতা আমদানিতে বিদ্যমান বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার হলেও ওয়্যারহাউস লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারকরা নির্ধারিত শর্তে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে তা আমদানি করতে পারবেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, নীতিটির উদ্দেশ্য আমদানি বন্ধ করা নয়; বরং আমদানি, উৎপাদন ও রপ্তানির মধ্যে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। যদিও তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের পরস্পরবিরোধিতায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর সিদ্ধান্তটি স্থগিত রেখেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রয়োজনীয় সুতার ন্যূনতম ৫০ শতাংশ স্থানীয় স্পিনিং মিল থেকে সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। অন্যদিকে বিটিএমএ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলেছে।

টেক্সটাইল মিল মালিকদের হিসাব অনুযায়ী, বিদেশি সুতার একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের মাধ্যমে সরবরাহ করা গেলে বছরে ১.৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব। তবে এর জন্য শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয় বরং স্থানীয় মিলগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক দামে উৎপাদন করার সক্ষমতাও ফিরিয়ে আনতে হবে। বিদ্যমান কারখানাগুলো কতটা উৎপাদনক্ষম, কতটি বন্ধ বা অর্ধ বন্ধ এবং সেগুলো পুনরায় চালু করতে কী ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন—এসব বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছেন, দেশের বন্ধ ও অর্ধবন্ধ টেক্সটাইল কারখানাগুলো কার্যকরভাবে পুনরায় চালু করা গেলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়ে বিটিএমএর সাবেক পরিচালক রাজীব হায়দার বলেন, কর্মসংস্থানের প্রভাব শুধু কারখানার শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তুলা সংগ্রহ ও পরিবহন, গুদামজাতকরণ, প্যাকেজিং, প্রকৌশল ও রক্ষণাবেক্ষণ, ইউটিলিটি, ব্যাংকিং, বীমা, নিটিং, উইভিং ও ডাইংসহ পুরো ব্যাকওয়ার্ড এবং ডাউনস্ট্রিম শিল্পে এর সুফল আসবে।

টেক্সাটাইল মিল মালিকদের অভিযোগ, কিছু অসৎ গার্মেন্টস মালিক দেশি সুতা না কিনে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা এনে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার সুযোগ খুঁজছেন। তাদের দাবি, নিট ফ্যাব্রিক্সে সুতা থেকে ওয়েস্টেজ হার ভারতে ৯ থেকে ১০ শতাংশ, চীনে আট এবং বাংলাদেশে আগে ছিল ১২ শতাংশ। তবে বন্ডের শুল্কমুক্ত সুতা এনে বাইরে বিক্রির সুযোগ করতে এই ওয়েস্টেজ হার বাড়িয়ে বর্তমানে ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশ করা হয়েছে। এখন আবার সেটি বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করার দাবি তোলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এই বিশাল পরিমাণে সুতা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়ে দেশি শিল্পকে ধ্বংস করা হচ্ছে বলেও দাবি তাদের।

বাদশা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা বাদশা মিয়া বলেন, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশের লক্ষ্য স্থানীয় স্পিনিং শিল্পকে অন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া। এরচেয়ে বড় বিষয় হলো কাঁচামাল আমদানি ও দেশি উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ এবং স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে।

সালমা গ্রুপের পরিচালক ও বিটিএমএ পরিচালক চৌধুরী মোহাম্মদ হানিফ বলেন, সস্তা বিদেশি পণ্যের প্রবাহের কারণে স্থানীয় মিলগুলো দীর্ঘদিন ধরে কম সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। তার মতে, আমদানির কারণে স্থানীয় উৎপাদন লাইন বসে থাকলে পুরো ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ৩২ বিলিয়ন ডলারের স্থানীয় বিনিয়োগ সুরক্ষিত হবে। তবে এই সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, মান, প্রযুক্তি ও দক্ষতার উন্নয়ন না হলে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন