মোবাইলে একটি বার্তা এলো ‘আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’, ‘বিশেষ অফারটি পেতে এখনই ক্লিক করুন’ কিংবা ‘সাবস্ক্রিপশন নবায়ন করুন’। সঙ্গে একটি লিংক। লিংকে ঢুকতেই চাওয়া হলো মোবাইল নম্বর, পাসওয়ার্ড বা অন্য কোনো তথ্য। কখনো বলা হলো, একটি অ্যাপ ইনস্টল করতে হবে। ব্যবহারকারী না বুঝে অনুমতি দিয়ে ফেললেন। এরপরই শুরু হতে পারে প্রতারণা।
কখনো ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তথ্য নেওয়া হয়, কখনো ক্ষতিকর অ্যাপের মাধ্যমে ডিভাইসের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আবার কখনো পরিচিত ব্যক্তি, ব্যাংক কর্মকর্তা বা সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ বা তথ্য চাওয়া হয়। অনলাইন প্রতারণার ধরন এখন এতটাই বদলেছে যে, প্রতারকরা একাধিক কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করে।
চট্টগ্রামের খুলশীতে গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশির বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগও এরকম ডিজিটাল প্রতারণাকে ঘিরে। গতকাল শুক্রবার নগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানান, তারা আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের সদস্য। তবে তারা আর কী কী ধরনের প্রতারণা করতেন, কারা তাদের সহযোগী এবং প্রতারণার অর্থ কোথায় যেত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজছে পুলিশ। এই তদন্তে নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি বিষয়Ñ৬৩ বিদেশি একা ছিলেন না। তাদের দেশি ও বিদেশি সহযোগী ছিল।
গত বৃহস্পতিবার বিকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খুলশী থানাধীন কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি আটতলা বাড়িতে অভিযান চালায় সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও খুলশী থানা-পুলিশ। সেখান থেকে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। যার মধ্যে ২০ জনই নারী।
ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা প্রায় দেড় মাস আগে ওই বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন। বাড়িটি একজন দুবাই প্রবাসীর। ওই বাড়ি ব্যবহার করেই তারা প্রতারণামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
কিন্তু পুলিশ বলছে, এটি তাদের একমাত্র ঠিকানা ছিল না। এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় অবস্থান করে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অন্যান্য অনলাইন অপরাধ চালিয়ে আসছিলেন তারা। ফলে তদন্তের পরবর্তী প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—দেশের আর কোন কোন এলাকায় তাদের আস্তানা ছিল? সেসব বাসা কারা ভাড়া দিয়েছিল? ভাড়ার চুক্তি কার নামে? ওই বাসাগুলোতেও কি একই ধরনের কার্যক্রম চলত? এসব তথ্য বের করা গেলে চক্রটির বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তা ফয়সাল।
পেছনে দেশীয় চক্র
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশে অপরাধমূলক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পরিচালনার জন্য ওই বিদেশিদের দেশি ও বিদেশি সহযোগী ছিল। এমনকি কয়েকজন অজ্ঞাতনামা সহযোগী এখনো পলাতক। তারা চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন বলে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছেন।
এই তথ্য তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে জানান কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপ-পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. শামীম হোসেন। জানতে চাইলে তিনি আমার দেশকে বলেন, ৬৩ বিদেশি একটি আবাসিক এলাকায় এসে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করেছেন। তাদের জন্য বাসা ভাড়া, ইন্টারনেট, যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, খাবার, যাতায়াতসহ নানা ধরনের লজিস্টিক সহায়তা প্রয়োজন হওয়ার কথা। এসব সহায়তার সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, সেটিই এখন পুলিশের তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এসব কাজে কারা যুক্ত ছিলেন, তাদের পরিচয় কী—এ বিষয়ে তিনি কোনো নাম উল্লেখ করেননি।
অভিযানে উদ্ধার হওয়া ডিভাইসের সংখ্যাও তদন্তের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি অ্যাপল ট্যাব, একটি সিপিইউ, একটি মনিটর, কি-বোর্ড, মাউস, প্রিন্টার, পাঁচটি পেনড্রাইভ ও চারটি সিমকার্ড। এর বাইরে তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান কর্মসংস্থান কার্ডও পাওয়া গেছে। শুধু মোবাইল ও ল্যাপটপই ১৯১টি। বিশেষজ্ঞরা জানান, এখন এসব ডিভাইসের ভেতরের তথ্যই হতে পারে তদন্তের বড় সূত্র।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


