গম আমদানি কেলেঙ্কারিতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। তৎকালীন সচিব ইসমাইল হোসেনকেও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বেশি দামে নিম্নমানের গম আমদানির হোতা রাশিয়া প্রবাসী মিঞা সাত্তার আজও অধরা।
অভিযোগ রয়েছে, সাধন খাদ্যমন্ত্রী থাকাকালে রাশিয়া থেকে একের পর এক নিম্নমানের, এমনকি চোরাই গমের চালানও বেশি দামে আমদানি করেছিল চক্রটি।
জিটুজি পদ্ধতিতে এসব গম আনা হলেও আমদানিনীতি উপেক্ষা করে ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপকে দেওয়া হয় মধ্যস্থতার দায়িত্ব। আলোচিত এ প্রতিষ্ঠানটির মালিক রাশিয়া প্রবাসী মিঞা সাত্তার, যিনি সাধন চন্দ্রের অলিখিত ‘ব্যবসায়িক পার্টনার’ হিসেবে পরিচিত। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালে সরকার পতনের আগ পর্যন্ত ওই গ্রুপটির মাধ্যমে প্রায় ১১ লাখ টন গম আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতিটন গমে অন্তত ৬০ ডলার করে বেশি দামে নিম্নমানের গম কিনে গ্রুপটি হাতিয়ে নেয় কয়েক হাজার কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুদকের তদন্তেও বেরিয়ে আসে এর সত্যতা। আলোচিত ওই দুর্নীতির মামলায় সাবেক খাদ্যমন্ত্রী গ্রেপ্তার হলেও ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি দেশে না এলেও নির্বাচনের পর দুবার এসে নতুন করে দুর্নীতির জাল বিস্তারের অপচেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে ন্যাশনাল গ্রুপের মালিক সাত্তারের বিরুদ্ধে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সাধন চন্দ্রের আগে খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন কামরুল ইসলাম। তার আমলে ২০১৫ সালে ব্রাজিল থেকে নিম্নমানের গম আমদানি নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। কারণ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গমের পুষ্টিগুণবিষয়ক সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী গমে প্রোটিনের মান ১২-১৮ শতাংশ হতে হবে। এরচেয়ে কম পুষ্টিমানের গম বা আটার তৈরি খাবার খেলে নানা ধরনের অপুষ্টিজনিত সমস্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। অথচ বাংলাদেশ তখন ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রোটিন মানের গম আমদানি করত। সমালোচনার মুখে সরকার আমদানি করা গমের প্রোটিন মান পুনঃমূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়। আমদানি করা গমের প্রোটিন মান সাড়ে ১১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়। কিন্তু সাধন চন্দ্র দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও গম আমদানির বিনির্দেশ প্রোটিনের মান সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের আগস্টের আগ পর্যন্ত প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাশিয়া থেকে ১১ লাখ টন গম চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়। বিনির্দেশ অনুযায়ী সাড়ে ১১ শতাংশ প্রোটিন নির্ধারণ করার সুযোগে নিম্নমানের পোকায় খাওয়া গম আমদানি করা হয়। ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপ নামের বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান প্রডিনটর্গ একচেটিয়াভাবে ওই গম সরবরাহ করে। টেন্ডার বা প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি এড়াতে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) চুক্তির মাধ্যমে এই গম আমদানি করা হয়। ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী জিটুজি পদ্ধতিতে কোনো মধ্যস্থতাকারী থাকার নিয়ম না থাকলেও ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপকে সাধন চন্দ্রের নির্দেশে মধ্যস্থতাকারীর নামে কমিশন এজেন্ট নিয়োগ করা হয়।
গম আমদানিতে দুর্নীতি-সংক্রান্ত মামলার তদন্ত টিমের সদস্য দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া জানান, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র ও তার সহযোগীরা মিলে ন্যাশনাল ইলেকট্রিক কোম্পানির মাধ্যমে রাশিয়া থেকে পচা গম আমদানি করেছিলেন। এ অভিযোগটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে বিস্তারিত বলা যাবে না। তবে আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের মতো যথেষ্ট ডকুমেন্ট দুদকের হাতে এসেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাইও করা হয়েছে। যে কোনো সময় মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপ কী
মূলত জ্বালানি খাতের পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই পরিচিত ছিল ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপ, যার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রাশিয়া প্রবাসী মিঞা সাত্তার। বাংলাদেশে তার ভাই আমিরুজ্জামান সোহেল ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। সাধন চন্দ্রের হাত ধরে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ঢোকার আগে প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিল। মূলত তার হাত ধরেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বাপেক্সের গ্যাসকূপ খনন প্রকল্পের বিদেশি একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করে। রাশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি এজেন্ট হয়ে রূপপুর দুর্নীতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন সাত্তার। তার আরেক ভাই রায়হান গফুর সলঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত নসরুল হামিদ বিপু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে হঠাৎ করেই আবির্ভাব ঘটে সাত্তারের। ২০১৫ সালের শুরুতে ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। ওই বছরের শেষে রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মূলত বিগ বাজেটের এ প্রকল্পকে টার্গেট করেই ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন সাত্তার। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মালামাল সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত রাশিয়ার বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি কোম্পানির বাংলাদেশি এজেন্ট হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হওয়া ন্যাশনাল ইলেকট্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম Eleron, Power Mashines, AMT Engineering, INTER-RAO, Atomenergomash, KER Holding, Orgenergostry. পরে রূপপুর প্রকল্পটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত হয়। রূপপুরের সাপ্লাই কাজ চলতে চলতেই ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভোলায় তিনটি গ্যাসকূপ খননের জন্য রাশিয়ার জ্বালানি কোম্পানি গ্যাজপ্রমের দেওয়া ৫২ মিলিয়ন ডলারের দরপ্রস্তাব নিয়ে বাপেক্সের সঙ্গে নেগোসিয়েশন শুরু হয়। হঠাৎ করে গ্যাজপ্রম লোকাল এজেন্ট পরিবর্তন করে যুক্ত হয় ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের সঙ্গে। সঙ্গে সঙ্গে ৫২ মিলিয়ন ডলারের দর প্রস্তাব স্থগিত করে ৬৪ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়ে বসে কোম্পানিটি। নতুন এই দর প্রস্তাব নিয়ে নেগোসিয়েশন করলে শুরুতে বাপেক্স বিব্রত বোধ করলেও বিস্ময়করভাবে কদিনের মধ্যেই মন্ত্রী বিপুর হস্তক্ষেপে সে প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
বাপেক্সের সাবেক এমডি মোহাম্মদ আলী জানান, বিষয়টি অনেক আগের হওয়ায় ঘটনাটি পুরোপুরি মনে নেই। তবে যতটুকু মনে আছে, কূপ খননের শুরুতে গ্যাজপ্রমের লোকাল এজন্ট অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। মাঝপথে এসে ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপ যুক্ত হয়। গ্রুপটি সে সময় রূপপুর প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় জ্বালানি খাতে পরিচিত ছিল। এরপর নেগোসিয়েশন চলা অবস্থায় নতুন দর প্রস্তাব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। একটি প্রতিষ্ঠানের দুটি দর প্রস্তাব নিয়ে সে সময় বিষয়টি আলোচিত হয়। কিন্তু প্রস্তাব দুটিতে কত টাকার পার্থক্য ছিল, সেটা স্পষ্ট মনে নেই। তবে একই ধরনের কূপ খননের অভিজ্ঞতা বাপেক্সের আছে। বিদেশি কোম্পানিকে না দিয়ে কাজটি বাপেক্স করলে অনেক কম টাকায় প্রকল্প সম্পন্ন করা যেত। কিন্তু একসঙ্গে অনেক কূপ খননের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে প্রকল্পের কাজটি রাশিয়ান কোম্পানিকে দেওয়া হয়।
জ্বালানি খাতের সাপ্লায়ার ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে সাধন চন্দ্রের হাত ধরে খাদ্যশস্য খাতে প্রবেশ করে। আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে ইলেকট্রিক কোম্পানির মাধ্যমেই খাদ্যশস্য আমদানির নিয়ন্ত্রণ নেন সাত্তার।
বেশি দামে গম আমদানি
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা বাণিজ্য-সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যম বিজনেস ইনসাইডারের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪-এর জুন পর্যন্ত ভালো মানের, অর্থাৎ প্রোটিনমান সাড়ে ১২ শতাংশের ওপরে রাশিয়ার গমের আন্তর্জাতিক দাম ছিল প্রতিটন ২৬৩-৪৩৮ ডলারের মধ্যে। এর সঙ্গে পরিবহন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় যুক্ত হবে প্রতিটনে ১০ ডলার করে। কিন্তু বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে নিম্নমানের গম কিনেছে ভালো মানের গমের আন্তর্জাতিক দাম থেকে প্রতিটনে ৫০-৬০ ডলার বেশি ব্যয় করে। অভিযোগ রয়েছে, বড় অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের মাধ্যমে কমিশনের এ টাকা ভাগবাটোয়ারা করেছেন সাবেক মন্ত্রী সাধন চন্দ্র।
দরপত্র প্রক্রিয়ায়ও একই চক্র
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৭০ লাখ টন গমের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬০ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়। জিটুজি পদ্ধতি ছাড়াও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও গম আমদানি করা হয়। সেখানেও সাধন চন্দ্রের অলিখিত পার্টনার মিঞা সাত্তারের প্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকার পায়। জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক মাস আগে খাদ্য অধিদপ্তরের পরপর দুটি আন্তর্জাতিক দরপত্রে প্রায় এক লাখ টন গম আমদানির অনুমতি পায় ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের অধীনস্থ নামসর্বস্ব ‘আর ডি গ্লোবাল’। সূত্র জানায়, ইলেকট্রিক কোম্পানির মাধ্যমে খাদ্যশস্য আমদানির সমালোচনা এড়াতে নতুন ওই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন সাত্তারের ভাই সোহেল। ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের প্রধান কার্যালয় হিসেবে মহাখালী ডিওএইচএসের ২৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে এবং আর ডি গ্লোবালও একই ঠিকানা ব্যবহার করে।
চোরাই গমে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি
২০২৫ সালের এপ্রিল ও জুনে দুটি জাহাজে ইউক্রেন থেকে চুরি করা গম চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে বলে চারটি চিঠি পাঠায় ইউক্রেন সরকার। এসব গম ইউক্রেনের দখল করা এলাকা থেকে চুরি করে রাশিয়া বাংলাদেশের কাছে ন্যাশনাল গ্রুপের মাধ্যমে বিক্রি করেছে বলেও অভিযোগ করে ইউক্রেন। রাশিয়ার কাছ থেকে চোরাই গম কিনে ইউক্রেনে সংঘটিত রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বাংলাদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এই গম কেনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির আহ্বান জানানো হয়। চিঠিগুলোতে এসব জাহাজের নাম ও নিবন্ধন নম্বরসহ কাভকাজ বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরুর এবং সম্ভাব্য আগমনের তারিখও উল্লেখ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দক্ষতার সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার ওই ঝুঁকি মোকাবিলা করে।
এ বিষয়ে রাশিয়ায় অবস্থানরত মিঞা সাত্তারের হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে এই প্রতিবেদকের পরিচয় শুনেই তিনি বলেন, ‘আমি জার্নালিস্টের সঙ্গে কোনো বিষয়ে কথা বলি না।’ এটা বলেই ফোন কেটে দেন তিনি।
ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের এমডি সোহেল জানান, এই নামে আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। রূপপুর কিংবা বাপেক্সের সঙ্গেও আমাদের কোনো কাজ নেই। খাদ্য মন্ত্রণালয় জিটুজি পদ্ধতিতে রাশিয়া সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে গম এনেছে, সে বিষয়ে আমাকে ফোন করে তো কোনো লাভ নেই। আপনার কিছু জানতে হলে ফুডের (খাদ্য বিভাগের) কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
পরে ন্যাশনাল গ্রুপের জনসংযোগ কর্মকর্তা নূর নবী সিদ্দিক সুইন এ প্রতিবেদককে ফোন করে বলেন, এগুলো অনেক পুরোনো ও সেটেলড ইস্যু। ব্যবসায়িক শত্রুরা নতুন করে এটি সামনে এনে তাদের বিব্রত করতে চাইছে। রূপপুর কিংবা গম আমদানির সঙ্গে সরাসরি তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকার সুযোগ নেই। কারণ, সবগুলোই জিটুজি পদ্ধতিতে হয়েছে। এখানে থার্ড পার্টি কারো অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। রাশিয়া থেকে যে গম এসেছে, সেগুলো নিম্নমানের গম ছিল—এমন অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে রাশিয়াকে বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি করেছে। এগুলো নিয়ে অতীতে যেসব সাংবাদিক নিউজ করেছেন, তাদের চাকরি চলে গেছে। তারা আর সাংবাদিকতায় ফিরতে পারেননি বলেও সতর্ক করেন তিনি।
গম আমদানি কিংবা রূপপুরের সঙ্গে জড়িত না থাকলে এসব প্রকল্প সম্পর্কে তারা জানেন কীভাবে—এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি সুইন। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে এ-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি ডকুমেন্ট পাঠিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি জানান, ইউক্রেন যে ন্যাশনাল গ্রুপকে নিষিদ্ধ করতে বলেছে, এটা আমাদের ন্যাশনাল গ্রুপ নয়। কারণ, আমাদের বাংলাদেশে সরাসরি কোনো ব্যবসা নেই। রূপপুর প্রকল্পে যে সাত প্রতিষ্ঠানের লোকাল এজেন্টের কথা বলা হচ্ছে, এগুলোও সত্য নয়। মূলত রূপপুরে অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে। এ সাত প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি চুক্তি করেও বাংলাদেশে আসেনি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জাতীয় পর্ষদ সদস্য প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার জানান, ইলেকট্রিক পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান খাদ্যপণ্য সরবরাহ করতে পারবে না—আইনে এমন কোনো বিধিনিষেধ নেই। কিন্তু এক সেক্টরের প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে অন্য সেক্টরে আসতে চাইছে কেন—এ প্রশ্ন করাটাই সরকারি আমলাদের দায়িত্ব। কিন্তু যারা ম্যানেজতত্ত্বে বিশ্বাসী, তাদের কাছে এটি কোনো সমস্যা নয়। সরকার পরিবর্তন হলে মন্ত্রী-এমপিদের বিচার হয়। নীতি বদলালে কর্মকর্তাদেরও বিচার হয়। কিন্তু এ চক্রটি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। আর এ কারণেই নতুন দায়িত্ব নেওয়া কর্তাব্যক্তিদের ফের তারা ম্যানেজ করতে পারে। এ কারণেই দুর্নীতি বন্ধ হয় না। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিই জিরো ট্রলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে চাইলে এই চক্রের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


