ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে যখন ব্যালট পেপার ও অন্যান্য নির্বাচনি সরঞ্জাম পরিবহন এবং সংরক্ষণের কার্যক্রম শেষ ধাপে, ঠিক সে সময়ই নতুন করে নাশকতার ভয়াবহ আশঙ্কাজনক পরিকল্পনার তথ্য সামনে এসেছে। এ পরিকল্পনার মূল অংশ হলো—যেসব স্থানে নির্বাচনি সরঞ্জাম রাখা হয়েছে, সেখানে রাতের আঁধারে অতর্কিত হামলা চালানো এবং ককটেল বিস্ফোরণ ও পেট্রল বোমা ব্যবহারের মাধ্যমে অগ্নিসংযোগ করে ব্যালট পেপার পুড়িয়ে ফেলা, যাতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াটিই ভন্ডুল হয়ে যায়। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, ক্যাডারদের হাতে ইতোমধ্যে গ্রেনেড ও অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু ‘হিট স্কোয়াড’ গঠন করা হয়েছে, যারা শুধু সরঞ্জাম ধ্বংসের কাজ করবে। নিরাপত্তা সংস্থার একাধিক সূত্রের বরাতে এসব তথ্য জানা গেছে। এ তথ্য পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সারা দেশে সতর্কতা জারি করেছে। দুটি নিরাপত্তা সংস্থা ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে এবং নির্বাচন কমিশনে আগাম গোয়েন্দা তথ্য পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ ফেব্রুয়ারি জেলা সদর পর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে উপজেলা পর্যায়ের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে ব্যালট পেপারসহ বিভিন্ন নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠানো শুরু হয়। এর আগেই কমিশনের পক্ষ থেকে সারা দেশের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকদের কাছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা হয়। উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানোর পর অস্থায়ী স্টোররুমে সংরক্ষণ করা হয়, যা দুর্বল নিরাপত্তা থাকলে হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনটির শীর্ষপর্যায় থেকে মাঠপর্যায়ের নেতাদের উদ্দেশে ‘কঠোর কর্মসূচি’ পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ককটেল ও বোমা বিস্ফোরণের পাশাপাশি প্রয়োজনে গ্রেনেড কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য হলো, ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করা এবং শেষ পর্যন্ত ভোটগ্রহণ ব্যাহত করা।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সংগঠনটির কিছু প্রশিক্ষিত সদস্যকে আলাদা আলাদা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কেউ রেকি করবে, কেউ বিস্ফোরক বহন করবে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করবে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অধীন উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচনি সরঞ্জাম অস্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ইউএনওরা জেলার সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আর জেলা প্রশাসকরা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন। যেহেতু উপজেলা পর্যায়ে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি সরঞ্জাম পৌঁছে গেছে, তাই এসব স্থানের আশপাশে রেকি চালানো, পাহারার সময়সূচি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তার দুর্বলতা খুঁজে বের করার কাজ চলছে বলে তথ্য মিলেছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে হামলার পরিকল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গুদাম ও স্টোররুমে হামলার ছক
নিরাপত্তা সূত্র জানায়, নির্বাচনি কার্যক্রম ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে একাধিক গোপন বৈঠকে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। রাতে কিংবা ভোরের দিকে নির্বাচনি সরঞ্জাম রাখা গুদাম, উপজেলা নির্বাচন অফিস, স্কুল-কলেজভিত্তিক অস্থায়ী স্টোররুম এবং পরিবহন বহরের ওপর হামলার ছক কষা হচ্ছে। কিছু স্থানে আগুন ধরিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি ও সরঞ্জাম ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য। এতে একদিকে সরঞ্জাম নষ্ট হবে, অন্যদিকে ভোটগ্রহণের সময়সূচি বিঘ্নিত হবে—এমনটাই তাদের ধারণা।
নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বোচ্চ প্রস্তুতি
এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সারা দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। গুরুত্বপূর্ণ গুদাম ও স্টোররুমে বাড়ানো হয়েছে পাহারা। বসানো হয়েছে অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা। সার্বক্ষণিক নজরদারি ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় টহল বাড়ানো হয়েছে এবং চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচনি সরঞ্জাম পরিবহনের সময় সশস্ত্র পুলিশ ও আনসার সদস্যদের এসকর্ট নিশ্চিত করা হয়েছে।
একাধিক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, যেকোনো ধরনের নাশকতার চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর গতিবিধির ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) শাহাদাত হোসাইন বলেন, যেকোনো ধরনের নাশকতার চেষ্টা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় কঠোর হাতে দমন করা হবে। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ভোটের সরঞ্জাম সুরক্ষায় বহুমাত্রিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিবহন রুট গোপন রাখা হচ্ছে। বিকল্প পথ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থানান্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো ধরনের সন্দেহজনক ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানাতে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার (জেলা প্রশাসক) নেতৃত্বে পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিজিবি ও আনসারের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটারদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। কোনো ধরনের হুমকি বা ষড়যন্ত্র নির্বাচনকে থামাতে পারবে না। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নির্বাচনি সরঞ্জাম রাখা যেকোনো স্থানের আশপাশে অচেনা ব্যক্তি ঘোরাফেরা করলে বা সন্দেহজনক কিছু দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানাতে। পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং আনসারের পাশাপাশি গ্রামপুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক দলকে সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়।
ভার্চুয়াল ষড়যন্ত্র
সক্রিয় নাশকতার পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতেও চলছে গভীর ষড়যন্ত্র। বিশেষ করে ‘ভোট বাতিল হয়ে গেছে’ বা ‘সরঞ্জাম পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে’—এমন সব ভুয়া খবর ছড়িয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার ছক কষা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সাইবার ইউনিটের নজরদারি কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। বিটিআরসি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করছে, যাতে কোনো উসকানিমূলক তথ্য সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে। গুজব, উসকানিমূলক পোস্ট বা ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি অস্থির করার চেষ্টা করলে দ্রুত তা শনাক্ত করে অপসারণ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইনে বিভ্রান্তি ছড়ানোও নাশকতার একটি বড় অংশ। মাঠপর্যায়ের হামলার পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতে আতঙ্ক ছড়ানো হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে। সেজন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
নিরাপত্তা সংস্থার দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে অভিমত দেওয়া হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সতর্ক থাকতে হবে। পাড়া-মহল্লায় কোনো সন্দেহভাজন বা অচেনা ব্যক্তির তৎপরতা দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


বিদ্রোহীদের চাপে বিএনপি কিছু আসন হারানোর শঙ্কা