পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগকে ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি ব্লেম গেম শুরু হয়েছে। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির সঙ্গে গোপন সমঝোতা ও সখ্যের অভিযোগ তুলছে।
সরকারি দলের দাবি, দেশ অস্থিতিশীল করতে বিরোধী দলই পেছন থেকে আওয়ামী লীগকে উসকানি দিচ্ছে। তাদের ইন্ধনে শিল্পাঞ্চলগুলোয় অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের অভিযোগ, তাদের রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখতে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে সরকারি দল। বিরোধী মত দমনে পরিকল্পিতভাবে ‘আওয়ামী জুজু’র ভয় দেখানো হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে অকাট্য কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তবে সরকারপ্রধান জানিয়েছেন, তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
দীর্ঘ দেড় দশক স্বৈরাচারী শাসনে নিষ্পেষিত রাজপথের দুই পুরোনো সহযাত্রী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে পরস্পরকে ঘায়েল করতে আওয়ামী লীগ কার্ড ব্যবহার করছে। এতে প্রশ্ন উঠেছেÑসত্যিই কি কেউ নিষিদ্ধ বা বিতাড়িত শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করছে, নাকি প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেউলিয়া করতে নতুন এই অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের বিরুদ্ধে দোষারোপের রাজনীতি অব্যাহত রাখলে বিতাড়িত রাজনৈতিক দলই লাভবান হবে। তাই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে উভয়পক্ষের উচিত পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি পরিহার করে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই প্রধান বিরোধী দল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও জুলাই সনদ নিয়ে প্রথম থেকেই টানাপোড়েন শুরু হয়। জুলাই সনদের পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে বিরোধী দল। সরকারের মেয়াদ সাত মাস না যেতেই বিরোধী দল লংমার্চ, বিভাগীয় সমাবেশসহ সরকারবিরোধী নানা কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচি থেকে সরকার পতনের হুমকি পর্যন্ত এসেছে।
সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে আর সহযোগিতা করা হবে না বলেও ঘোষণা দেন। বিরোধী দলের আন্দোলন-কর্মসূচির পাশাপাশি রাজধানী এবং এর আশপাশে শ্রমিক আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বকেয়া বেতন ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে তারা প্রায়ই রাজপথে নামছে। সরকারি দলের অভিযোগ, এসব কর্মসূচি পালিত হচ্ছে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। এর পেছনে বিরোধী দলের ইন্ধন এবং সম্পৃক্ততার অভিযোগও তোলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। এক্ষেত্রে আন্দোলন চাঙা করতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী দল আঁতাত করছে বলে দাবি সরকারি দলের।
অপরদিকে বিরোধী দলের অভিযোগ, তাদের কোণঠাসা করতে সরকারির দলের লোকজনই আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একজোট হয়ে বিরোধী দলকে দমনের চেষ্টা করছে।
অবশ্য বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘সম্পর্ক তৈরির’ অভিযোগ এর আগেও উঠেছিল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে অভিযোগটি দুই দলের বিরুদ্ধেই ছিল। নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে উভয় দলই তখন আওয়ামী লীগকে ‘কাছে টানার’ চেষ্টা করেছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয়সহ তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে আটক দলটির নেতাকর্মীদের ছাড়াতে তদবির করার তথ্য পাওয়া যায়। প্রার্থীদের নির্বাচনি জনসভায়ও জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য দিতে দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানও শোনা গেছে।
অবশ্য নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের তুলনায় বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্য বেশি দেখা গেছে। এর ফলস্বরূপ নির্বাচনের পরপরই দেশের কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার খবর পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার ঘটনা ঘটে। যদিও পরে বিএনপিরই কিছু নেতাকর্মী ও জুলাই বিপ্লবীরা ওই সব কার্যালয় ভাঙচুর করে তালাবদ্ধ করে দেন। বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের কারাবন্দি বেশকিছু নেতাকর্মী জামিনে মুক্তও হন। আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের কেউ কেউ এ সময়ে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেন।
ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার তথাকথিত দেশে ফেরার ঘোষণার পর দেশে আত্মগোপনে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল, কথিত লকডাউন পালন, অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ এবং সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। অবশ্য হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পরপরই কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। সারা দেশে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
গত মঙ্গলবার রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জামায়াতকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে।...কাদের সাহায্যে করছে? এই যে কতটা দল আছে, যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশের মধ্যে। তারা জনগণের কাছে বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে। এই দুপক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে গত বুধবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘তারা আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিচ্ছে।’ বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা যে আন্দোলন করছে, আলোচনার মাধ্যমে সরকারের তা মেনে নেওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সূর মিলিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী দলের সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে। জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং একটি গুপ্ত দল অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। পরাজিত শক্তি এবং ওই দলের আচরণ ও কথাবার্তায় মিল রয়েছে। অতীতের মতো এখনো তারা বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বশীল জায়গা থেকে যে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলেছেন, উচিত হবে তার প্রমাণক তুলে ধরে বিষয়টি পরিষ্কার করা। অপরদিকে বিরোধী দলকেও পাল্টা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। অন্যথায় বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে পতিত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নতুন করে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার পথ খুঁজবে। এতে সরকারের উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হবে, দেশ ও সরকার লাভবান হবে না।
এই শিক্ষাবিদ আরো বলেন, বড় দুই দলের অনৈক্যের সুযোগে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে সক্রিয় হলে তা কারো জন্য ভালো হবে না। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি পরিহার করে উভয়পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক ফজল আমার দেশকে বলেন, এ বিষয়ে
কতটা গভীর থেকে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিষয়টি রজনৈতিক। রাজনৈতিক সুবিধা নিতে দল দুটির পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসছে।
পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, নিঃসন্দেহে বলা যায়, এভাবে দোষারোপের রাজনীতি চলমান থাকলে বিতাড়িত গোষ্ঠীই সুবিধা পাবে। এ বিষয়ে দুপক্ষকে এখনই সংযত হওয়া দরকার। না হলে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

