এমপিদের খুশি করতে বরাদ্দ বাড়ছে ৪০০০ কোটি টাকা

এমপিদের খুশি করতে বরাদ্দ বাড়ছে ৪০০০ কোটি টাকা
এলজিইডি ভবন। ফাইল ছবি

প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ। ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি ৯৪ শতাংশের মতো। শত শত সড়ক ও সেতুর কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এমনকি প্রকল্পের আওতায় থাকা কিছু কাজ আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলেও জানানো হয়েছে। অথচ শেষ পর্যায়ে এসে সে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। একলাফে ৪,০০০ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি) প্রস্তাবিত ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ‘পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩’ (আইআরআইডিপি-৩) বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির আপত্তির মধ্যেও বিপুল ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভায় অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয় ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি নাÑএমন প্রশ্ন তুলেছেন পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এলজিইডি সংসদ সদস্যদের চাহিদার ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাছাই ও বাস্তবায়ন করবে। দীর্ঘদিন ধরে সংসদীয় আসনগুলোতে নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। ফলে নির্বাচনপরবর্তী সময়ে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন কাজ দেখাতে পারেননি এমপিরা। নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজও দিতে পারছেন না তার। স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রকল্পের আওতায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করতে পারায় কোনো কোনো এমপি এলাকায় চাপের মধ্যে আছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য যেহেতু দু-তিন বছর সময় প্রয়োজন, তাই পুরোনো প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়িয়ে এলাকায় কাজ নিতে চাইছেন তারা।

পিইসি সভার সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসে নতুন করে সড়ক নির্মাণ, সেতু-কালভার্ট ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ যুক্ত করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। অথচ দেশের আট বিভাগে প্রকল্পটির মতো একই ধরনের পৃথক প্রকল্প নেওয়ার কার্যক্রম ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ফলে শেষ সময়ে পুরোনো প্রকল্পের পরিধি বাড়িয়ে বিপুল অর্থ ঢালার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি করা হয় সভায়।

প্রকল্পটি ২০২০ সালের জুনে অনুমোদনের সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬,৪৭৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। বাস্তবায়নের সময়সীমা ছিল ওই বছরের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। প্রথম সংশোধনে ব্যয় সামান্য বাড়িয়ে ৬,৫২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা করা হয়। মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এরপর দ্বিতীয় সংশোধনে একই ব্যয় রেখে সময় আরো এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।

এখন তৃতীয় সংশোধনে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১০ হাজার ৫২৬ কোটি ৫৫ লাখ

টাকা। ব্যয় বাড়ছে ৪,০৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। যা মূল ডিপিপির প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভার কার্যবিবরণীতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশীদ আমার দেশকে বলেন, বাস্তবায়নের শেষপ্রান্তে এসে প্রকল্পে নতুন করে ৪,০০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো এবং মেয়াদ সম্প্রসারণের প্রস্তাব সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ৯৪ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়া একটি প্রকল্পে প্রায় সাত বছর পর এসে এ ধরনের অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া সুযোগের অপব্যবহার।

তিনি বলেন, মেয়াদ বাড়ানোর অজুহাতে পুরোনো কাঠামোর ওপর ভর দিয়ে নতুন প্রস্তাব যুক্ত করা হচ্ছে। স্বাভাবিক নিয়মে নতুন কোনো উদ্যোগ নিতে গেলে সম্ভাব্য যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডিসহ নানা শর্ত পূরণ করতে হয়। তবে এসব আইনি বাধ্যবাধকতা এড়াতেই কৌশল হিসেবে শেষ মুহূর্তের প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ সংযোজনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এ ধরনের কাজে ৯৪ শতাংশ শেষ হওয়ার সঙ্গে শতভাগ সম্পন্ন হওয়া প্রকল্পের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই।

মামুন আল রশীদ বলেন, প্রকল্প গ্রহণে এমপিদের কোনো চাপ বা আবদার থাকলে পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব হবে তা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করা। রাজনৈতিক প্রভাবে বা কোনো গোষ্ঠীর আনুকূল্যে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হলে তা দেশের সার্বিক পরিকল্পনা কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর।

সবচেয়ে বড় আপত্তি এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) থেকে। পিইসি সভায় সংস্থাটির প্রতিনিধি সরাসরি মতো দিয়েছেন, নতুন করে অঙ্গ বৃদ্ধি ও ৪,০০০ কোটি টাকা ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পটি শেষ করে প্রয়োজনে নতুন প্রকল্প নেওয়াই যুক্তিসংগত। কারণ প্রকল্পটির মেয়াদ ইতোমধ্যে সাত বছর হতে চলেছে। নতুন করে প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি পেলে প্রকল্পটির প্রান্তিক মূল্যায়নের (পিসিআর) সময় প্রকল্প শুরুর সময়কার অধিকাংশ রাস্তার ভৌত কাজের গুণগতমান সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে না।

আইএমইডির মতে, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা, জুন ২০২২-এর অনুচ্ছেদ ১.১.১২ অনুযায়ী ‘বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতিরেকে প্রকল্পের মেয়াদ সাধারণভাবে অনূর্ধ্ব তিন বছর হবে।’ শিডিউল অব রেটস পরিবর্তনের কারণে তিন বছর পরপর একটি প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এ কারণে প্রকল্পের মাঝপথে সংশোধন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি এলজিইডির নিয়মিত একটি প্রকল্প। সে কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রকল্প সংশোধন, মেয়াদ বৃদ্ধি, ব্যয় বৃদ্ধির জটিলতা এড়ানোর লক্ষ্যে নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজনে প্রকল্পের কার্যপরিধি কমিয়ে প্রকল্পের মেয়াদকাল তিন বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে। প্রকল্পের অধিকাংশ কোডেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা বাস্তবতার নিরিখে হ্রাস করা আবশ্যক। আট বিভাগের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের সমজাতীয় পৃথক প্রকল্প গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ফলে এ প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি করা যৌক্তিক হবে না।

আইএমইডি জানায়, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৯৩.৩৭ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৯৩.৫৪ শতাংশ। প্রকল্পের ৭,২৯১টি স্কিমের মধ্যে ৬,৩৪৪টির কাজ শেষ হয়েছে। ৭৯৫টির কাজ চলমান আর ২২টি স্কিম বিভিন্ন কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।

সেতুর কাজও প্রায় শেষ। মোট ১১ হাজার ১৩৬ মিটার সেতুর মধ্যে ১০ হাজার ৯৬৪ মিটারের কাজ শেষ হয়েছে। অবশিষ্টাংশের মধ্যেও ৪০ মিটার সেতু বা কালভার্ট বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। এরপরও তৃতীয় সংশোধনীতে নতুন করে ৪৫ কিলোমিটার (কিমি) উপজেলা সড়ক, ২১১ কিমি ইউনিয়ন সড়ক, ২,৪৯৫ কিমি গ্রামীণ সড়ক এবং ১,০১০ মিটার সেতু-কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে ২৯৯ কিমি গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কাজও যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পের শেষপর্যায়ে এসব নতুন কাজ বাছাইয়ের ভিত্তি ও প্রয়োজনীয়তা নিয়েও সভায় প্রশ্ন তোলা হয়।

পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীতে নতুন এলাকা ও কাজ যুক্ত করার বিষয়ে পিইসি সভার সভাপতি মাহমুদুল হোসাইন খান আমার দেশকে বলেন, নতুন প্রকল্প গ্রহণ, সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন শুরু করতে অনেক সময় লেগে যায়। এসব প্রক্রিয়ায় প্রায় এক বছর বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে নতুন সরকারের কাছে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক উন্নয়নকাজের চাহিদা এসেছে। এসব কাজ দ্রুত শুরু করা এবং নির্বাচনের আগে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই চলমান প্রকল্পে নতুন কিছু অঙ্গ ও এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার মানুষের চাহিদা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রায় ছয় মাস ধরে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে তারা এসব সুপারিশ করেছেন। ফলে বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং জনগণের প্রয়োজন মেটানোর বিষয়টি এখানে গুরুত্ব পেয়েছে।

নতুন কাজের মান ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মাহমুদুল বলেন, এসব কাজ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এরপর মূল্যায়ন কমিটি সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী যোগ্য ঠিকাদার নির্বাচন করবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার সুযোগ নেই। কাজের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতেই ঠিকাদার নির্বাচন করা হবে।

তিনি আরো বলেন, পিইসি সভায় প্রকল্পটির সংশোধনী পর্যালোচনার সময় ব্যয়ের বিভিন্ন খাত, কাজের স্বচ্ছতা এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়ে বেশকিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের অর্থ যেন যথাযথভাবে ব্যয় হয় এবং কাজের মান নিশ্চিত করা যায়, সেজন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে গাছ লাগানোর হিসাব, ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও বাস্তবায়ন তদারকির মতো বিষয়গুলোতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে এলজিইডির এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, আটটি বিভাগের জন্য একই ধরনের পৃথক প্রকল্প গ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ডিপিপি প্রস্তুত করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সেগুলোর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। প্রকল্পগুলো হবে বিভাগভিত্তিক গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য।

প্রকল্পগুলো যেহেতু একই ধরনের, তাই কাজের মধ্যে ওভার ল্যাপিং বা দ্বৈততার ঝুঁকি তৈরি হবে কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রকল্পে কাজের ওভার ল্যাপিং বা দ্বৈততার সুযোগ খুব কম। তবে একেবারেই হবে না, সেটা বলা যাবে না। যদি হয়েও যায়, সে ক্ষেত্রে কাজের ব্যয় একটি সংস্থা থেকেই যাবে। দুটি দেওয়া যাবে না।

প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবে বিভিন্ন রাজস্ব খাতে অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে পিইসি সভায় একাধিক প্রশ্ন ওঠে। বাড়িভাড়া, প্রচার ও বিজ্ঞাপন, ভ্রমণ, কম্পিউটারসামগ্রী, টপোগ্রাফিক্যাল সার্ভেসহ একাধিক খাতে অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব ব্যয়ের কারণ ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো পুনর্নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের শেষপর্যায়ে এসে এসব খাতে বাড়তি অর্থ রাখার যৌক্তিকতা নিয়েই পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন