মধ্যযুগে চট্টগ্রামে তৈরি কাঠের জাহাজ ও নৌকা একসময় সুদূর তুরস্ক, মিসর এবং জার্মানিতে রপ্তানি হতো। উনিশ শতকের শেষদিকে লোহার জাহাজের আধিপত্য বাড়ায় হারিয়ে যায় এ শিল্পটি। তবে কর্ণফুলী নদীর তীরে মাছ ধরার জন্য কাঠের জাহাজ তৈরির শতবর্ষী এ ঐতিহ্য আজও টিকে আছে।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও বহু পুরোনো নির্মাণপদ্ধতি ধরে রেখে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নির্মাণশিল্পীরা। অনেক ক্ষেত্রে নকশা বা ব্লু-প্রিন্ট ছাড়াই অভিজ্ঞতার আলোকে কাঠের গুঁড়ি, বাঁকানো কাঠ ও বিভিন্ন উপকরণ জোড়া দিয়ে বিশাল ট্রলারের কাঠামো তৈরি করেন মিস্ত্রিরা। পরে এতে যুক্ত হয় আধুনিক ইঞ্জিন, প্রপেলার, জেনারেটর, জিপিএস ও ওয়্যারলেসসহ নানা সরঞ্জাম।
এখনো কর্ণফুলীর তীরে গেলেই কাঠের গন্ধ, করাত আর হাতুড়ির শব্দ পাওয়া যায়। প্রতিদিনই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের প্রাচীন এক ঐতিহ্য। নদীর উত্তর ও দক্ষিণ পাড়ের বিভিন্ন এলাকায় যুগের পর যুগ ধরে কাঠ দিয়ে তৈরি হচ্ছে মাছ ধরার নৌকা ও সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলার। বিশেষ করে কর্ণফুলী তীরের কালুরঘাট, চরপাথরঘাটা ও ইছানগর এলাকায় গড়ে উঠেছে এ ঐতিহ্যবাহী নৌকা তৈরির ঘাট।
নদীর চরপাথরঘাটা ও চাক্তাই এলাকায় বড় বড় কাঠের ট্রলারের গোল কাঠ সাইজ করার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু স’মিল। ওস্তাদ বা হেড মিস্ত্রিরা বোট নির্মাণের জন্য কাঠ কিনতে নিয়মিত এসব মিলে আসেন। এসব স’মিলের আশপাশেই গড়ে উঠেছে ডকইয়ার্ড।
কালুরঘাট সংলগ্ন নদীতীরবর্তী ডকইয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে কাঠের ট্রলার ও বোট নির্মাণের কাজ করছেন মোহাম্মদ হোসেন মিস্ত্রি। স্থানীয়ভাবে ‘ওস্তাদ হোসেন’ নামে পরিচিত এই কারিগর বলেন, চরপাথরঘাটা এলাকায় গভীর সাগরে মাছ ধরার জন্য ৫০ থেকে ৭০ ফুট দীর্ঘ বড় কাঠের ফিশিং ট্রলার তৈরি ও মেরামতের কাজ বেশি হয়। আর কালুরঘাট এলাকায় বড় সাম্পান থেকে শুরু করে মাঝারি ও বড় আকারের ফিশিং বোটের কাঠের কাঠামো তৈরি করা হয়।
কাঠেই ভরসা কারিগরদের
সমুদ্রের নোনা পানি, ঢেউ ও প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায় ট্রলার নির্মাণে প্রয়োজন হয় শক্ত ও টেকসই কাঠ। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা কাঠও ব্যবহার করা হয়। গর্জন, শাল, সেগুন ও ওকানসহ বিভিন্ন শক্ত কাঠ ট্রলারের মূল কাঠামো এবং তলদেশ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। নোনা পানি ও ঢেউয়ের দীর্ঘস্থায়ী আঘাত সহ্য করার সক্ষমতার কারণে এসব কাঠকে উপযোগী মনে করেন কারিগররা।
একটি ট্রলারের নির্মাণ শুরু হয় কাঠের মূল কাঠামো বা কিল তৈরির মাধ্যমে। এরপর ধাপে ধাপে পাটাতন, পার্শ্ব কাঠামো, ছাদ ও অন্যান্য অংশ তৈরি করা হয়। কাঠের প্রতিটি অংশ নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী কেটে জোড়া লাগানোর কাজ করেন দক্ষ কারিগররা। তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও হাতের মাপজোখই অনেক সময় হয়ে ওঠে নকশার বিকল্প।
কোটি টাকার বিনিয়োগ
মাঝারি থেকে বড় আকারের একটি সমুদ্রগামী কাঠের ফিশিং বোট সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে সাগরে নামানোর উপযোগী করতে বর্তমানে প্রায় ৮০ লাখ থেকে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। ট্রলারের আকার, কাঠের মান, ইঞ্জিন, মাছ ধরার সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করে মোট ব্যয় কম-বেশি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যয়ের একটি অংশ যায় কাঠের বডি তৈরিতে। উন্নত মানের লোহাকাঠ, গর্জন বা ওকানসহ শক্ত কাঠ দিয়ে ট্রলারের মূল কাঠামো দাঁড় করাতেই প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এরপর আসে ইঞ্জিন ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম। কাঠের বডিতে প্রপেলার, শ্যাফট এবং শক্তিশালী ইঞ্জিন বসাতে প্রায় ২০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। চীনা ও জাপানি ইঞ্জিনের পাশাপাশি রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিনও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মাছ ধরার জন্য প্রয়োজনীয় জাল, দড়ি, বরফ সংরক্ষণের ব্যবস্থা, জেনারেটর, লাইটিং, জিপিএস ও ওয়্যারলেসসহ অন্যান্য সরঞ্জাম বাবদ আরো প্রায় ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়। ফলে কাঠের বডি তৈরি থেকে শুরু করে ইঞ্জিন, সরঞ্জাম ও অন্যান্য কাজ শেষ করতে বড় অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগ করতে হয় ট্রলার মালিকদের।
শত শ্রমিকের কর্মসংস্থান
একটি বড় ট্রলার নির্মাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন অসংখ্য কারিগর ও শ্রমিক। প্রধান কারিগর বা স্থানীয় ভাষায় ‘হেড মিস্ত্রি’ কিংবা ‘ওস্তাদ’-এর নেতৃত্বে একটি দল কাঠের বিভিন্ন অংশ তৈরির কাজ করে। একেকটি বড় বোটের কারিগর ও সহকারীদের মজুরি বাবদ প্রায় আট থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
কেবল কাঠমিস্ত্রিই নয়, ট্রলার নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ডক শ্রমিক, রংমিস্ত্রি, ইঞ্জিন মিস্ত্রি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপনকারী, জাল প্রস্তুতকারকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। ফলে কর্ণফুলীর তীরের এ শিল্পকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। ট্রলার তৈরি শেষে সেগুলো মাছ ধরার কাজে নামলে এর সঙ্গে যুক্ত হন জেলে ও সংশ্লিষ্ট মৎস্যজীবীরা।
৫৬ থেকে ৬৫ ফুট দীর্ঘ ট্রলার
কর্ণফুলীর তীরে তৈরি হওয়া মাঝারি ও বড় আকারের ফিশিং ট্রলারের সাধারণ দৈর্ঘ্য ৫৬ থেকে ৬৫ ফুট এবং প্রস্থ ১৬ থেকে ১৮ ফুটের মধ্যে হয়ে থাকে। একটি ট্রলার নির্মাণে কাঠামোগত কাজ শেষ করতে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ মাস সময় লাগে। তবে সরঞ্জাম সংযোজন ও অন্যান্য কাজের ওপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে সময় আরো বাড়তে পারে।
একেকটি ট্রলারে ২০ থেকে ২৫ জন পর্যন্ত জেলে অবস্থান করতে পারেন। পর্যাপ্ত খাবার, জ্বালানি, বরফ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে এসব ট্রলার টানা ১৫ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে অবস্থান করতে পারে। ফলে একটি ট্রলার শুধু মাছ ধরার নৌযান নয়, বরং জেলেদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভাসমান কর্মস্থল হিসেবেও কাজ করে।
মৌসুমনির্ভর নির্মাণকাজ
নভেম্বর থেকে মে মাস শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় কাঠের নতুন নৌকা ও ট্রলার নির্মাণের উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সময় নদীর তীরবর্তী ডকইয়ার্ডগুলোতে নতুন বোট নির্মাণের ব্যস্ততা বাড়ে। বর্ষাকালে নির্মাণকাজ অনেকটা কমে আসে। আবার ইলিশের মৌসুমে নতুন ট্রলার তৈরির পরিবর্তে পুরোনো ট্রলারের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ডকিংয়ের কাজ বেশি হয়। চাক্তাই এলাকায় ট্রলারের কাঠ কাটার স’মিল, ইঞ্জিন ফিটিংস ও খুচরা যন্ত্রাংশের পাশাপাশি বোটের বডি মেরামতের কাজও হয়। অন্যদিকে চরপাথরঘাটা ও কালুরঘাটে তুলনামূলক বড় আকারের কাঠের বোট ও ট্রলার নির্মাণে বেশি ব্যস্ততা দেখা যায়।
ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন
কর্ণফুলীর তীরের কাঠের নৌকা নির্মাণশিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—প্রযুক্তির পরিবর্তন এলেও এর মূল কারিগরি ঐতিহ্য এখনো অটুট রয়েছে। কাঠের বডি তৈরিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা অভিজ্ঞতা ও হাতের কাজের ওপর নির্ভর করেন কারিগররা। অন্যদিকে ট্রলারের গতি, নিরাপত্তা ও সমুদ্রে দীর্ঘদিন অবস্থানের সক্ষমতা বাড়াতে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক ইঞ্জিন ও প্রযুক্তি।
একসময় যে নৌকা ছিল সম্পূর্ণ দেশি উপকরণ ও কারিগরি জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল, সময়ের সঙ্গে তার কাঠামোতে যুক্ত হয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতি।
কিন্তু কাঠের শরীর আর দক্ষ কারিগরের হাতের কাজ এখনো রয়ে গেছে আগের মতোই।
কর্ণফুলীর তীরের এই শিল্প তাই শুধু নৌকা বা ট্রলার তৈরির জায়গা নয়; এটি চট্টগ্রামের নদী, সমুদ্র, মৎস্যজীবী জীবন ও কারিগরি ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জীবন্ত সংস্কৃতি। কোটি টাকার বিনিয়োগ, শত শত শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং দেশের মৎস্য অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই শিল্প এখনো টিকে আছে অভিজ্ঞ কারিগরদের হাতের দক্ষতা ও প্রজন্মের পর প্রজন্মের ঐতিহ্যের ওপর।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

