কক্সবাজারে একরাম হত্যা মামলা, বাদীর অজান্তে ব্যবসায়ীকে ফাঁসাল পুলিশ

কক্সবাজারে একরাম হত্যা মামলা, বাদীর অজান্তে ব্যবসায়ীকে ফাঁসাল পুলিশ
আমার দেশ গ্রাফিক্স

কক্সবাজার শহরের সিটি কলেজের সামনে সমিতি বাজার এলাকার একরাম নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে গুলি করে মুবিন ও বাবু নামে দুই যুবক। গত ১ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনায় আরেক যুবক মোহাম্মদ সোহেল ওরফে রহমতকে গুলি করতে করতে ধাওয়া করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। সেই ঘটনায় একরাম মারা গেলেও বেঁচে যান রহমত। এই ছিল সেই হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয়দের মাধ্যমে পাওয়া চিত্র।

ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত একরামের বাবা জালাল আহমদ পরদিন কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দ্রুত বিচার আইনে মামলা করেন। তবে দিবালোকে হওয়া সেই হত্যার মামলায় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে জাকির হোসেন নামের এক ব্যবসায়ীকে ফাঁসিয়ে দেয় পুলিশ। বাদীর অজান্তে জাকিরের নাম ঢোকানো হয় এজাহারে। মামলাকারী দাবি করছেন, ওই ব্যবসায়ী তার মামলার আসামি নন, তিনি তাকে চেনেনও না।

বিজ্ঞাপন

এই ঘটনায় মামলার বাদী জালাল আহমদ পুলিশ সুপারকে বিষয়টি লিখিত ও মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। আর মিথ্যা মামলায় কারাগারে যাওয়া জাকির হোসেনের স্ত্রী ঘটনার প্রতিকার চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রমতে, ১ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার সিটি কলেজ এলাকায় মোহাম্মদ একরামকে গুলি করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় একরামকে উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ওই হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।

চট্টগ্রামে ১৪ দিন চিকিৎসার পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর একরামের মৃত্যু হয়। জালাল আহমদের অভিযোগ, ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তিনি যখন মামলা করতে কক্সবাজার সদর মডেল থানার সামনে যান, ওই সময় থানার উপপরিদর্শক মিঠুন পালিতসহ কয়েকজন তাকে থানার দ্বিতীয় তলায় নিয়ে গিয়ে রাইটার দারুস সালামকে দিয়ে নিজেদের মতো একটি এজাহার তৈরি করেন।

ওই সময় সমুদ্রপাড়ের ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের জাতীয় পরিচয়পত্রটি ‘বিরোধীপক্ষ’ থেকে সংগ্রহ করে বাবা-মায়ের নামসহ পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা যুক্ত করে এজাহারে আসামি হিসেবে যুক্ত করে দেন। অথচ, অন্য আসামিদের নাম থাকলেও বাবা মায়ের পরিচয় ও পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেই এজাহারে।

অনুসন্ধানে যা উঠে এলো

এই ঘটনার অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, যে সময় সদর মডেল থানায় এজাহার লেখা হচ্ছিল, ওই সময় কম্পিউটার অপারেটর দারুস সালামের পাশে বসা এক পুলিশ কর্মকর্তা মোবাইলে কারো সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘জাকিরের আইডি কার্ড পাওয়া গেছে, ঠিক আছে, ঠিক আছে!’ এমন কথা বলতে শুনেছেন বাদীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিরাও।

অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যমতে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধ্যা ও কলাতলীর ব্যবসায়ী জাকির হোসেনকে বিভিন্ন মামলায় অন্তর্ভুক্ত করতে চেষ্টা করে আসছিল একটি চক্র। এরই মধ্যে সাতকানিয়ার করাইয়াঘোনা এলাকার মুজিব চেয়ারম্যান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে জাকির হোসেনের কলাতলী এলাকায় জমিসংক্রান্ত বিরোধ ছিল। মুজিব চেয়ারম্যান সেই দ্বন্দ্বে জাকির হোসেনকে বিভিন্নভাবে হুমকিও দিয়েছিলেন।

অনুসন্ধান বলছে, মুজিব চেয়ারম্যান ও মোহাম্মদ ফারুক মামলার এজাহারে জাকির হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়ার পরও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান মৃত্যুশয্যায় থাকা ভিকটিম একরামের কাছে। ওই সময় জোরপূর্বক তাকে দিয়ে জাকির হোসেনের নাম বলিয়ে ভিডিও রেকর্ড করারও চেষ্টা করেন মুজিব ও ফারুক। কথোপকথনের অডিও সংরক্ষিত আছে প্রতিবেদকের হাতে।

যেভাবে ফাঁসানো হয় জাকিরকে

২ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় নথিভুক্ত হওয়া মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মামলাটির রেকর্ডকারী কর্মকর্তা হলেন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বিল্লাল হোসেন। বাদীর টিপ নেওয়া সেই এজাহারে মূল অভিযুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে জাকির হোসেনকে।

‘সাজানো’ ওই এজাহারে দাবি করা হয়Ñজাকির হোসেন গুলি করার নির্দেশ ও হুকুম দিয়েছেন; তিনি আবার নিজেই উপস্থিত থেকে ভিকটিম একরামকে ছুরি মারার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে।

অথচ বাদী জালাল আহমদ, তার ছেলে জাবের ও বড় ছেলে আবছার জানান, এজাহারের ভেতরে নির্দেশ ও হুকুমদাতা হিসেবে নাম থাকার কথা আবুল মনছুর ওরফে লুদুর, আর মামলায় যিনি গুলি করেছেন মুবিন, তার নাম থাকার কথা দুই নম্বরে। অথচ পুলিশের তৈরি করা এজাহারে নিরপরাধ ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করে সম্পূর্ণ এজাহার এলোমেলো করে দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, বাদী ও ভিকটিমের পরিবারের অভিযোগ পেয়ে ইতোমধ্যে সদর মডেল থানার মামলাটি জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) তদন্তের জন্য দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপার তার দাপ্তরিক ফেসবুক পেজেও নিহত একরামের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার ছবি পোস্ট করেন। ওই সময় তিনি ভিকটিমের পরিবারকে কক্সবাজার জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করারও আশ্বাস দেন।

আরো যত অভিযোগ

অভিযোগ উঠেছে, মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা মিঠুন পালিত ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাকির হোসেনের নাম এজাহারে ঢুকিয়ে দেওয়ার বিষয়টি জানলেও তিনি নিজে তাকে আটক না করে কক্সবাজারে দায়িত্বরত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব-১৫, বর্তমানে এসআরবি) কনফারমেশন (সম্মতি) দিয়ে গ্রেপ্তার করার ব্যবস্থা করেন।

এছাড়া মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসামি মুবিনকে আটক করার পর তার ব্যবহৃত অস্ত্র কোথায় আছে, কীভাবে গুলি করেছে সেই বিষয়ে তাকে রিমান্ডে না এনে থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাকে দিয়ে আদালতের কাছে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন মিঠুন পালিত।

জাকিরের জামিন চাইলেন বাদী, বাধা পুলিশের

বাদীপক্ষ যখন জানতে পারলেন—মিথ্যা ও হয়রানিমূলকভাবে বাদীর অজান্তে নিরীহ ব্যক্তি জাকির হোসেনের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তখন গত ১০ সেপ্টেম্বর বাদী নিজেই ‘জিম্মানামা ও আপস’ দিয়ে জামিন চেয়েছেন। ওই সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মিঠুন পালিত ও রেকর্ডকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) বিল্লাল হোসেন আদালতে জাকির হোসেনের বিরোধিতা করায় জামিন পাননি তিনি।

এ বিষয়ে সাতকানিয়ার মুজিবুর রহমান চেয়ারম্যানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

তবে বাদীর এসব অভিযোগ সত্য নয় জানিয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। ভিকটিম একরামও মৃত্যুর আগে জাকিরের নাম বলে ভিডিও রেকর্ড দিয়ে গেছেন। তারপরও পুলিশের কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে কথা বলতে পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। বক্তব্য চেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলেও জবাব দেননি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...