বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে পদোন্নতির জন্য বিচারিক অভিজ্ঞতার শর্ত কার্যত উঠে গেছে। সহকারী জজ থেকে জেলা ও দায়রা জজ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে পরিবর্তনের ফলে কোনো বিচারিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই বিচারক হয়ে যাচ্ছেন অনেকে। নতুন বিধিমালার সুযোগে এমন কর্মকর্তাও জেলা ও দায়রা জজ হয়ে গেছেন, যাদের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে একদিনেরও বিচারিক অভিজ্ঞতা নেই। ফলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় এবং মাঠ পর্যায়ের বিচারকদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিচারাঙ্গনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে।
আগের বিধিমালায় প্রতিটি স্তরে পদোন্নতির জন্য বিচারক পদে নির্দিষ্ট সময়ের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। নতুন বিধিমালায় সেই শর্তের জায়গায় বসানো হয়েছে ‘সমপর্যায়ের অন্যান্য পদে’ অভিজ্ঞতার কথা।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন বিধিমালার অধীনে এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা বিচারক হিসেবে বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতি পেয়েছেন, যাদের প্রয়োজনীয় বিচারিক অভিজ্ঞতা নেই। তাদের মধ্যে এমন কর্মকর্তাও জেলা ও দায়রা জজ হয়েছেন, যাদের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে এক দিনেরও বিচারিক অভিজ্ঞতা নেই।
গত বছরের ২ নভেম্বর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে নতুন বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মের অন্যান্য শর্তাবলি) বিধিমালাটি প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে ১২ বিধির মাধ্যমে ২০০৭ সালের বিধিমালাটি রহিত করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন বর্তমান বিএনপি সরকার বাদ দিলেও বিতর্কিত বিধিমালাটি বহাল রাখে ।
জেলা ও দায়রা জজ পদে পদোন্নতির যোগ্যতা ২০০৭ সালের বিধিমালার প্রথম তফসিলে লেখা ছিল, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ/সমপর্যায়ের বিচারক পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ ১৫ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা লাগবে । নতুন বিধিমালায় একই পদের যোগ্যতা লেখা হয়েছে, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ/সমপর্যায়ের অন্যান্য পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ ১৫ বছরের কর্মের অভিজ্ঞতা। নতুন বিধিমালায় ‘বিচারক’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। তার জায়গায় বসেছে ‘অন্যান্য পদ’। পাশাপাশি ‘চাকরির অভিজ্ঞতা’ বদলে হয়েছে ‘কর্মের অভিজ্ঞতা’। পরিবর্তনটি শুধু জেলা ও জেলা দায়রা জজ পদে হয়নি, চারটি স্তরেই একই বদল করা হয়েছে।
একইভাবে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পদে পদোন্নতির জন্য ২০০৭ সালের বিধিমালায় শর্ত ছিল যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ/সমপর্যায়ের বিচারক পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ ১০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। নতুন বিধিমালায় তা হয়েছে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ/সমপর্যায়ের অন্যান্য পদে ২ (দুই) বছরের অভিজ্ঞতাসহ ১০ বছরের কর্মের অভিজ্ঞতা। সিনিয়র সহকারী জজ পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বিচারিক অভিজ্ঞতা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এছাড়া যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ পদের ক্ষেত্রে আরেকটি শর্তও বাদ পড়েছে। ২০০৭ সালের বিধিমালায় এই পদে পদোন্নতির যোগ্যতা ছিল সিনিয়র সহকারী জজ/সমপর্যায়ের বিচারক পদে পদোন্নতি পরীক্ষায় উত্তীর্ণসহ দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা। নতুন বিধিমালায় লেখা হয়েছে, সিনিয়র সহকারী জজ/সমপর্যায়ের অন্যান্য পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ সাত বছরের কর্মের অভিজ্ঞতা। এখানে ‘পদোন্নতি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ’ শর্তটি নেই।
পদের নামেও একই ধারার পরিবর্তন এসেছে। ২০০৭ সালের বিধিমালায় প্রথম ক্রমিকে পদের নাম ছিল ‘জেলা বিচারক/জেলা ও দায়রা জজ/সমপর্যায়ের অন্যান্য বিচারক’। নতুন বিধিমালায় তা হয়েছে ‘জেলা ও দায়রা জজ/সমপর্যায়ের অন্যান্য পদ’।
নিয়োগ পদ্ধতির ঘরেও একই বদল। ২০০৭ সালে লেখা ছিল, পদোন্নতি হবে ‘অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজদের/সমপর্যায়ের বিচারকদের মধ্য থেকে’। নতুন বিধিমালায় লেখা হয়েছে, পদোন্নতি হবে ‘অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ/সমপর্যাযের অন্যান্য পদে কর্মরত সার্ভিস সদস্যদের মধ্য থেকে’। অর্থাৎ পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন ‘সার্ভিস সদস্য’, ‘বিচারক’ নন। এই ‘সমপর্যায়ের অন্যান্য পদ’ বলতে কী বোঝায়, তা বুঝতে হলে দুই বিধিমালার আরেকটি বিধি মিলিয়ে দেখতে হয়।
২০০৭ সালের বিধিমালার ৭ বিধির শিরোনাম ছিল ‘সুপ্রিম কোর্ট, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে নিয়োগ’। ওই বিধির ভেতরে বারবার ‘প্রেষণে নিয়োগ’ কথাটি এসেছে।
নতুন বিধিমালার ৫ বিধির শিরোনাম ‘সুপ্রিম কোর্ট, আইন ও বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়/বিভাগ/প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ’। এখানে ‘প্রেষণ’ শব্দটি নেই। বলা হয়েছে ‘নিয়োগ বা বদলি’। অর্থাৎ যে পদায়নকে আগে প্রেষণ বলা হতো, নতুন বিধিমালায় তা সাধারণ নিয়োগ বা বদলি হিসেবে গণ্য হবে।
নতুন বিধিমালার ৫(৫) বিধিতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন বা সম্মতি নিয়ে কোনো সদস্য এই বিধির অধীনে নিযুক্ত থাকলে তার জ্যেষ্ঠতা বা পদোন্নতি সুযোগ ক্ষুণ্ণ হবে না। প্রায় একই বিধান ২০০৭ সালের বিধিমালার ৭(৪) বিধিতেও সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিল।
দুটি বিধি একসঙ্গে পড়লে অর্থ দাঁড়ায়, প্রেষণের পদে কাটানো সময় এখন ‘সমপর্যায়ের অন্যান্য পদে’ অভিজ্ঞতা হিসেবে গণনায় আসবে। ফলে কেউ দুই বছর প্রেষণে থেকেই জেলা ও দায়রা জজ পদে পদোন্নতির যোগ্য বিবেচিত হবেন। এক্ষেত্রে তার বিচারকাজের অভিজ্ঞতা আছে কি না, সেই প্রশ্ন আর আসবে না।
বিধিমালার দ্বিতীয় তফসিলেও একই ধারা দেখা যায়। ২০০৭ সালে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট পদে পদায়ন হতো অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজদের মধ্য থেকে। নতুন বিধিমালায় এসেছে ‘অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ/সমপর্যায়ের অন্যান্য পদে কর্মরত সার্ভিস সদস্যদের মধ্য থেকে’।
নতুন বিধিমালায় আরো একটি পরিবর্তন এসেছে, যা পদোন্নতির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। আগের বিধিমালার ৪(২) বিধিতে বলা ছিল, পদোন্নতির জন্য হাইকোর্ট রুলস অনুযায়ী গঠিত জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কমিটির সব সদস্য বিচারপতির সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠিত হবে এবং সেই বাছাই কমিটিই পদোন্নতির সুপারিশ করবে।
নতুন বিধিমালার ৬(২) বিধিতে একটি নতুন ধাপ যোগ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গঠিত বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সুপারিশ যাচাই করার জন্য জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কমিটির সদস্য বিচারপতিদের নিয়ে বাছাই কমিটি গঠিত হবে। অর্থাৎ আগে সুপ্রিম কোর্টের কমিটিই সুপারিশ করত। এখন প্রথম সুপারিশ আসবে নির্বাহী বিভাগের গঠিত বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি থেকে। সুপ্রিম কোর্টের কমিটি ওই সুপারিশ যাচাই করবে।
এছাড়া ২০০৭ সালের বিধিমালার নামে ছিল ‘শৃঙ্খলা বিধান’। নতুন বিধিমালার নামে তা নেই। ২০০৭ সালের ৬ বিধিতে শৃঙ্খলাসংক্রান্ত যে বিধান ছিল, নতুন বিধিমালায় তার কোনো অনুরূপ বিধান নেই।
বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলা ও দায়রা জজের দায়িত্ব কেবল মামলা নিষ্পত্তি নয়, তিনি দায়রা মামলার বিচার করেন। অধস্তন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শোনেন। জেলার সব আদালত পরিদর্শন ও তদারক করেন। নতুন বিধিমালার ৮(১) (ক) বিধি অনুযায়ী তিনি দেওয়ানি ও দায়রা আদালতে কর্মরত বিচারক, লিগ্যাল এইড অফিসার এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের প্রশাসনিক বিষয়ে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ।
তারা বলছেন, আপিল বিভাগের ফুল কোর্টের অনুমোদনে অতীতে ক্ষেত্রবিশেষে বিচারিক অভিজ্ঞতা শিথিল করে বিষয়টির সমাধান। অতীতের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে সর্বশেষ যখন শর্ত শিথিল করা হয়, তখনো বিচারিক অভিজ্ঞতা আবশ্যক রাখা হয়েছিল। অথচ নতুন বিধিমালায় সেই শর্তটি প্রতিটি স্তর থেকেই কার্যত মুছে দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ আমার দেশকে জানান, বিধিমালার নতুন সংযোজন বিচারব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। ম্যাজিস্ট্রেসি পদে কার্যরত একজনকে যদি হঠাৎ বিচারক হিসেবে আদালতে পদায়ন করা হয়, তিনি বিচার প্রার্থীদের আর্জিগুলো বুঝতে পারবেন না। তাতে বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখা দেবে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ জহিরুল গনি চৌধুরী বলেন, জেলা জজ পদে পদোন্নতির সময় আমার মাত্র কয়েক মাসের বিচারিক অভিজ্ঞতা কম ছিল, তার জন্য আমাকে এক বছরের বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবে আমার মতে, সমপর্যায়ের পদের শব্দের বেড়াজালের মাধ্যমে মূলত সুবিধাবাদীরা তাদের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছেন, যা বিভিন্ন সময় হয়ে আসছে।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী আমার দেশকে বলেন, বিচারিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই বিচারক পদে পদায়ন অশোভন। বিষয়টি নিয়ে বর্তমান সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষ ওয়াকিবহাল আছে। বিচার বিভাগের শৃঙ্খলা, সৌজন্যতা এবং সাধারণ নিয়মের সঙ্গে বিষয়টি কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পরবর্তী ফুল কোর্টগুলোতে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

