স্থানীয় নির্বাচনে ইসির আচরণ বিধিমালা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা

গাজী শাহনেওয়াজ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাঠ নিয়ন্ত্রণে এবার অভূতপূর্ব কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আসন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আচরণ বিধিমালার নতুন খসড়া চূড়ান্ত করেছে কমিশন। এতে নির্বাচনি প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও এমপিসহ অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গত বুধবার রাতে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এ খসড়া প্রস্তাবনাটি সর্বসাধারণ, রাজনৈতিক দল ও সুশীলসমাজের মতামত নেওয়ার জন্য কমিশনের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা হয়েছে।

খসড়া বিধিমালা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ ও অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এবার বেশকিছু ধারা যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিধি ভঙ্গের দায়ে সরাসরি প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠোর ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখছে ইসি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নতুন খসড়া অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক নির্বাচনি প্রচারণায় অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা এডিট করা কোনো কন্টেন্ট ব্যবহার করতে পারবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ক্ষতিকর কন্টেন্ট, উসকানিমূলক বা লিঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন কোনো বক্তব্য ছড়ানো যাবে না। ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে কারো চেহারা বিকৃত বা চরিত্র হরণ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

এছাড়া ডিজিটাল প্রচারণার শুরুতেই প্রার্থীর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট আইডি ও ইমেইল রিটার্নিং অফিসারকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। এছাড়া সরকারের কোনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সরকারি/সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্বাচন-পূর্ব সময়ে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না। তারা তাদের সরকারি কর্মসূচির সঙ্গে নির্বাচনি কোনো কর্মকাণ্ড যুক্ত করতে পারবেন না এবং সরকারি যানবাহন বা অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন না। এমনকি বর্তমান কোনো চেয়ারম্যান বা মেয়র প্রার্থী না হলে তিনিও প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।

মাইকের শব্দমাত্রা নির্ধারণ ও প্রচারণার সময় নির্বাচনি প্রচারে শব্দদূষণ রোধে কঠোর সীমা বেঁধে দিয়েছে ইসি। একটি ওয়ার্ডে পথসভা বা প্রচারের জন্য একের অধিক মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করা যাবে না। মাইকের ব্যবহার দুপুর ১২টার আগে এবং সূর্যাস্তের পর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

একই সঙ্গে মাইকের শব্দের মানমাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। ক্যাম্প স্থাপন, পোস্টার ও বিলবোর্ডের নতুন নিয়ম যানবাহন ও জনদুর্ভোগ এড়াতে সড়ক বা জনগণের চলাচলের জায়গায় কোনো নির্বাচনি ক্যাম্প বা অফিস স্থাপন করা যাবে না। চেয়ারম্যান পদের প্রার্থীরা সর্বোচ্চ তিনটি এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীরা মাত্র একটি করে নির্বাচনি ক্যাম্প করতে পারবেন। এসব ক্যাম্পে কোনো টেলিভিশন, ভিসিআর, ভিসিডি বা ডিভিডি ব্যবহার করা যাবে না।

এছাড়া বিলবোর্ডের প্রচারমূলক অংশের আকার অনধিক ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট হতে হবে এবং প্রতি থানা বা উপজেলায় একের অধিক বিলবোর্ড স্থাপন করা যাবে না। দেয়ালে যেকোনো প্রকার লিখন বা চিত্রাঙ্কন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। যানবাহন ও শোডাউনে নিষেধাজ্ঞা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিলের সময় কোনো প্রকার মিছিল বা শোডাউন করা যাবে না এবং প্রার্থীর সঙ্গে সর্বোচ্চ পাঁচজনের বেশি সমর্থক থাকতে পারবেন না। ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল বা নৌযান নিয়ে মশাল মিছিল বা কোনো প্রকার শোডাউন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

নির্বাচনি প্রচারে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহার করা যাবে না। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি বা পচনশীল সামগ্রী ব্যবহার করে ক্যারাভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রচার চালানো যাবে, যদি তাতে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়।

ভোটকেন্দ্রের ৪০০ মিটারের মধ্যে কোনো ভোটার স্লিপ বিতরণ করা যাবে না। স্লিপের আকার তিন ইঞ্চি বাই তিন ইঞ্চির বেশি হতে পারবে না এবং এতে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও তারিখ থাকতে হবে।

নির্বাচনি প্রচারে প্রতীক হিসেবে কোনো জীবন্ত প্রাণী ব্যবহার করা যাবে না। নির্বাচনি ক্যাম্পে ভোটারদের কোনো প্রকার পানীয়, খাদ্য পরিবেশন বা উপঢৌকন (বকশিস) দেওয়া যাবে না। ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট বা ভোটাররা কোনো প্রার্থীর প্রতীক সংবলিত শার্ট, জ্যাকেট, ফতুয়া বা ক্যাপ পরিধান করে প্রবেশ করতে পারবেন না।

প্রার্থিতা বাতিল ও কঠোর শাস্তির বিধান কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। সেখানে কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট এ আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন করলে বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করলে ইসি তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কমিশন সরাসরি ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে, যা সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হবে। এছাড়া বিধি লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...