ঢাকাসহ সারা দেশে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে কপালে ভাঁজ পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। হঠাৎ এসব বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনায় তারা হতবাক। পুলিশ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় উদ্ধার করছে বোমাসদৃশ বস্তু ও দেশীয় কাঁচামালের তৈরি ককটেল। এর পেছনে কারা জড়িত রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে দীর্ঘদিন ধরে বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণ প্রায় বন্ধই ছিল। ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আল কুরা মাদরাসায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে এই ধারাবাহিকতা শুরু হয়। সর্বশেষ গত সোমবার ডেমরার সানারপাড়া এলাকা থেকে ককটেলসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এসব বোমা উদ্ধারের পাশাপাশি রাসায়নিক পদার্থ, বারুদ, গান পাউডার, ইলেকট্রিক তার, বিয়ারিং বল, নাইট্রিক অ্যাসিড, প্লাস্টিকের কনটেইনার জব্দ করছে পুলিশ।
বিভিন্ন স্থানে বোমা উদ্ধারের ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কোনো ধরনের জঙ্গি তৎপরতা নেই। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে আল-কায়েদার তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু মনে করছে না। দেশে বড় ধরনের কোনো জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার শঙ্কা নেই। আর যারা আইন লঙ্ঘন করে দেশবিরোধী অপতৎপরতার চেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ বলছে, উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। তবে অপরাধ বিজ্ঞানীরা এই বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় দেশের বিরুদ্ধে নতুন করে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তদন্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি তারা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট ও পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিটকে আরো সক্রিয় হওয়ার কথাও বলেছেন তারা।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ‘ঢাকায় যেসব বোমা উদ্ধার হয়েছে সেগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। উগ্রবাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে।’
কয়েকদিন আগে সানারপাড়া থেকে উদ্ধার হওয়া ককটেল বিস্ফোরণের বিষয়ে পুলিশের ডেমরা জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মীর মহসিন মাসুদ জানান, সানারপাড়ায় উদ্ধার হওয়া বোমাসদৃশ বস্তু দুটি সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। এ ঘটনায় জুয়েলকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার সাংগঠনিক পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে অপরাধ বিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘ভৌগোলিক অবস্থান এর অন্যতম প্রধান কারণ। জঙ্গিবাদ দমনে নিয়োজিত ডিএমপির সিটিটিসি কিংবা পুলিশের এটিইউয়ের মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো এখনো সচল রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে কোনো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র কিংবা গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের ওপর বোমা হামলা করে দুর্বৃত্তরা। গত ৭ মার্চ কুমিল্লার একটি মন্দিরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। গত ২৫ মার্চ যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে পুলিশি তল্লাশির সময় পাইপ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
সূত্র জানায়, গত ২২ জুন দক্ষিণখানে মসজিদ রোডে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতর থেকে বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। রথযাত্রার সময় কে বা কারা বোমাগুলো রেখে গিয়েছিল।
গত ৩০ জুলাই আশুলিয়া এলাকার একটি মুদি দোকান থেকে প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার করা হয়।
জানা গেছে, গত ১২ আগস্ট রাজধানীর অদূরে সাভারের সাধাপুর এলাকায় মসজিদের মাঠে একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে যান স্থানীয় ব্যক্তিরা। ড্রামের ভেতরে ছিল স্কচটেপে মোড়ানো একটি প্রেশার কুকার। স্থানীয় লোকজন ড্রাম থেকে প্রেশার কুকারটি বের করে মাঠে রেখে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ পরে এসে সেটি নিষ্ক্রিয় করে। পুলিশ জানায়, তিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি রাতে প্লাস্টিকের ড্রামটি মসজিদের মাঠে রেখে যায়। তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে পুলিশ।
আরো জানা গেছে, গত ১১ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় তিনতলা একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ১১টি পাইপ বোমাসহ (আইইডি) বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করে। গত ১ আগস্ট মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন থেকে সন্দেহজনক দুটি ব্যাগ উদ্ধার করে পুলিশ। অবশ্য সেগুলোতে কোনো বিস্ফোরক বা ক্ষতিকর বস্তু পাওয়া যায়নি।
গত ১৬ আগস্ট মাদারীপুরের কালকিনির গোপালপুর দারুসসুন্নাহ মহিলা মাদরাসায় বোমা বিস্ফোরণে পাঁচ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। একই দিন যশোরের কেশবপুরে ককটেল বিস্ফোরণে জুয়েল সরদার নামে এক যুবক আহত হয়েছেন। তাছাড়া ওই দিনই মেহেরপুর জেলা শহরের তিন স্থানে বোমাসদৃশ তিনটি বক্স ঘিরে আতঙ্ক ছড়ায়। পরে পুলিশ গিয়ে উদ্ধারের পর জানা যায়, সেগুলো সাউন্ডবক্স ছিল। কে বা কারা আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
উগ্রবাদীদের ডেটাবেজ দেখে অভিযান
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারে সময় জঙ্গিবাদের বড় উত্থান ঘটে। সারা দেশে বিভিন্ন জঙ্গি অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানগুলো ছিল সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। জঙ্গিবাদের অভিযানের বিষয়ে সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক অবসরে যাওয়ার পর ‘পুলিশ জীবনের স্মৃতি’ নামে একটি বই লেখেন। ওই বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট পান্থপথে ডিএমপির সিটিটিসির জঙ্গি অভিযানের পরদিন গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) সঙ্গে দেখা করি। আমাকে দেখে তিনি বললেন, এত কাছাকাছি জঙ্গি এনে অপারেশনের নাটক না করলেই পারতে।’ র্যাবও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৭০০ গজ দূরে নাখালপাড়ায় জঙ্গি নাটকের নাম করে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিন তরুণকে হত্যা করে।
কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, ওই সময় উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়েছিল বলে তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। সেই সময় বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে কথিত উগ্রবাদীদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরা এখন কারাগারে আছেন না কারাগারের বাইরে আছেন তা জানার জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন পুলিশের সদস্যরা।
কাউন্টার টেররিজম ইউনিট জানিয়েছে, আগে যারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তারা এখন কোথায় আছেন এবং কী ধরনের কাজকর্ম করছেন সেগুলো অনলাইন ও অফলাইনে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। ওই সময় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের খোঁজ নেওয়ার জন্য বাসায়ও পুলিশ পাঠানো হচ্ছে বলে সিটিটিসি সূত্রে জানা গেছে।
খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে মনোযোগ
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের বিভিন্ন থানা ও ব্যারাক থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। ওই লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, এখনো ১,৩২০টি অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছেÑএসএমজি, চায়না রাইফেল ও পিস্তলসহ অন্যান্য অস্ত্র। সেগুলো সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেলে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
সূত্র জানায়, এই অস্ত্রগুলো উদ্ধারে কোনো সিভিলিয়ান সহযোগিতা করলে পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিকবার পুরস্কৃত করার ঘোষণা রয়েছে। কিন্তু, এখন পর্যন্ত এ রকম কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র উদ্ধারে তারা বিভিন্নস্থানে অভিযান চালাচ্ছেন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্নস্থানে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যেখানেই অবৈধ অস্ত্রের সন্ধান মিলছে, সেখানেই অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, খোয়া যাওয়ার অস্ত্র উদ্ধার করা এখন পুলিশের বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ কোনোভাবে অস্ত্রগুলো উগ্রবাদীদের হাতে গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


