পাঠ্যবই মুদ্রণে এনসিটিবিতে ফের সক্রিয় আওয়ামী সিন্ডিকেট

সরদার আনিছ

পাঠ্যবই মুদ্রণে এনসিটিবিতে ফের সক্রিয় আওয়ামী সিন্ডিকেট
ফাইল ছবি

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বিনামূল্যের সরকারি পাঠ্যবই মুদ্রণে এখনো সক্রিয় পুরোনো আওয়ামী সিন্ডিকেট। ১০-১২ জনের ওই চক্রটি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাত করে কৌশলে ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়ে নিচ্ছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার মুদ্রণকাজের সিংহভাগ। এতে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন ক্ষুদ্র-মাঝারি মুদ্রণশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা। হতাশায় অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

এনসিটিবি ও মুদ্রণশিল্পে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এনসিটিবি থেকে এ চক্রের হোতাদের বদলি করা হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার ফিরে এসে সক্রিয় হয়েছেন বিতর্কিত ওইসব কর্মকর্তারা।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে বেশি বিতর্কিতদের মধ্যে রয়েছেনÑএনসিটিবির সচিব অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস। তিনি আওয়ামী আমলের শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির ঘনিষ্ঠ পানি জাহাঙ্গীর, শাহেদুল খবির, রতন কুমার ও নিজামুল হক সিন্ডিকেটেরও সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাকে এনসিটিবি থেকে বদলি করা হয়েছিল। সম্প্রতি নতুন করে এনসিটিবিতে তার পদায়নের পেছনে প্রভাবশালী মহল এবং শেখ হাসিনার পিয়ন পানি জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রিন্টিং প্রেসের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের সংযোগ বয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।

জানা যায়, ওই দুটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান আওয়ামী আমলে ৪০০ কোটি টাকার মালিক শেখ হাসিনার আলোচিত পিয়ন জাহাঙ্গীরের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। তারা ২০২৫ ও ২০২৬ সালের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণে কিছুটা চাপের মুখে থাকলেও কৌশলে বিশাল অঙ্কের কাজ করেছে। তারাই এখন পুরোনো সিন্ডিকেটকে সক্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ পদে ফের নিজেদের লোক পদায়ন করতে ভূমিকা রাখছে বলে জানা গেছে।

আগামী বছরের পাঠ্যবই মুদ্রণে টেন্ডারের প্রক্রিয়া চলমান। এনসিটিবি জানিয়েছে, বিনামূল্যের পাঠ্যবই সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী ২০৬ থেকে ২২০ দিনের সুনির্দিষ্ট দরপত্র সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী, লট বিভাজন ও দরপত্র আহ্বান গত ৩ জুন শুরু হয়েছে।

সূত্র জানায়, পরবর্তী ধাপ হিসেবে আগামী ২৮ জুন দরপত্র দাখিল ও উন্মুক্ত করা হবে, ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে দরপত্র মূল্যায়ন, ২৭ আগস্টের মধ্যে দরপত্র অনুমোদন, ৩০ আগস্ট কার্যাদেশ জারি এবং ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করা হবে। এরপর ২৯ নভেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজ শেষ করে মাঠপর্যায়ে শতভাগ পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হবে।

এর মধ্যে ওই চক্রটি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তা তাদের গোপনে সহযোগিতা করে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াটি নিজেদের অধীনে নিয়ে যেতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এ সিন্ডিকেট এনসিটিবি হয়ে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিস্তৃত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ সিন্ডিকেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে রয়েছে ৪০০ কোটি টাকার মালিক হাসিনার পিয়ন জাহাঙ্গীরের সাঙ্গোপাঙ্গরা। এছাড়াও সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের ভাই আনন্দ প্রিন্টার্সের মালিক রাব্বানী জব্বার, অগ্রণী অফসেট প্রিন্টার্সের মালিক, মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি এবং যুবলীগের নেতা জহুরুল ইসলাম, মুদ্রণ শিল্প সমিতির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান জুনায়েদুল্লাহ আল মাহফুজ প্রমুখ।

এদিকে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে সময়মতো নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া এনসিটিবির প্রধান দায়িত্ব হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ গুরুত্বপূর্ণ খাতটি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময় গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী ‘আওয়ামী সিন্ডিকেট’ এখনো টেন্ডার প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, এ কারণে চরম সংকটে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা।

টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেটের কারসাজি অনুসন্ধানে জানা গেছে, এনসিটিবির বার্ষিক পাঠ্যবই মুদ্রণের বিশাল কাজের টেন্ডারে স্বচ্ছতার অভাব দীর্ঘদিনের। একটি নির্দিষ্ট চক্র গত কয়েক বছর ধরে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা এ সিন্ডিকেট আগেভাগেই টেন্ডারের কাজ ভাগবাঁটোয়ারা করে নেয়। এ কারণে সাধারণ বা নতুন মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা দরপত্রে অংশগ্রহণ করলেও কৌশলী শর্তাবলি এবং রাজনৈতিক প্রভাবে তাদের কাজ পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়াও সিন্ডিকেটে জড়িতরা কৌশলে এনসিটিবির কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ছোট ছোট প্রেসকে বিভিন্ন অজুহাতে কালোতালিকাভুক্ত করে বাদ করে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী হাক্কানি প্রিন্টার্সের মালিক জহির মনি আমার দেশকে বলেন, বাঁধাই যন্ত্র না থাকার অজুহাতে আমার প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো নোটিস দেওয়া হয়েছে। অথচ অভিযোগটি সম্পূর্ণ মনগড়া ও বানোয়াট। আমাদের প্রেসে স্থায়ীভাবেই বাঁধাই যন্ত্র রয়েছে। কৌশলে আমাদের বাদ দিতেই উদ্দেশ্যপূর্ণ নোটিস দেওয়া হয়। এটা মূলত সিন্ডিকেট চক্রের ইশারায় করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এভাবে শুধু আমাদেরই নয়, সাধারণ অনেক প্রেস মালিককে হয়রানি করা হচ্ছে। মূলত সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতেই এমনটি করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগী মুদ্রণ ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডারে উন্মুক্ত অংশগ্রহণের সুযোগ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, আমরা বছরের পর বছর এ পেশায় আছি, কিন্তু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে আমরা এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে। বড় বড় ঠিকাদাররা সব কাজ ভাগ করে নেয় আর আমরা পড়ে থাকি কাজহীন । সিন্ডিকেটের সদস্যরা ছোট ব্যবসায়ীদের যতটুকু কাজ দেন, তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় ।

রাজধানীর আরামবাগ, ফকিরাপুল, সূত্রাপুর ও বাংলাবাজার এলাকার বেশ কয়েকজন মুদ্রণ ব্যবসায়ী জানান, পাঠ্যবইয়ের কাজ না পাওয়ার কারণে তাদের প্রেসে কর্মীদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সিন্ডিকেটের চাপে টেন্ডারগুলো এমনভাবে সাজানো হয়, যেখানে ছোট বা মাঝারি সক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকা অসম্ভব।

একই সঙ্গে সরকারি বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ে বিশাল সিন্ডিকেটে গড়ে শতকোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে। এসব জানার পরও কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এমনকি সিন্ডিকেটের অবৈধ চাপে নতি শিকার করে পুরোনো বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে নেওয়াসহ নানা সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে মন্ত্রণালয়কে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাধ্যমিকের বিনামূল্যের বই মুদ্রণে একটি নির্দিষ্ট পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ভিন্ন ভিন্ন প্রেস থেকে নিম্নমানের বই মুদ্রণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বছর প্রাথমিকের বই মুদ্রণেও নাহার প্রেস নামে একটি প্রেস থেকে নিম্নমানের কাগজে ছাপার অভিযোগ ওঠে। মাধ্যমিকের বই মুদ্রণে একই পরিবারের চার প্রেসের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ পায় খোদ এনসিটিবি।

সূত্র জানায়, মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণির বিষয়ভিত্তিক একাধিক লটের বিপুলসংখ্যক বই মুদ্রণের কাজ পেয়েছিল কর্ণফুলী আর্ট প্রেস ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস নামে দুটি প্রতিষ্ঠান। এ দুটি প্রেস পাঠ্যবই ছাপাতে সাড়ে আট হাজার টন কাগজ ব্যবহার করে। নিম্নমানের কাগজে বিপুলসংখ্যক বই ছাপিয়ে সরকার থেকে ২০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেয় অভিযুক্ত প্রেসগুলো।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ৩০ কোটির অধিক বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করে সরকার। এসব পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করেছে ১০৪টি বেসরকারি প্রেস । যার মধ্যে শুরু থেকেই কয়েকটি প্রেসের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।

সূত্র জানায়, কর্ণফুলী ও অগ্রণী নামের এ প্রতিষ্ঠান থেকে ছাপানো ৫০ লাখ ফর্মা এবং নিম্নমানের রিসাইকেলকৃত কাগজে বই ছাপানোর কারণে বাইন্ডিং, কাটিং ও সরবরাহ স্থগিতও করেছিল তদারক প্রতিষ্ঠান এনসিটিবি। শুধু তাই নয়, ছাপা হওয়া নিম্নমানের এসব বই ও ফর্মা ধ্বংস করার নির্দেশও দিয়েছিল ওই তদারককারী প্রতিষ্ঠান।

ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বরাবরই বড় লটের কাজ পেয়ে থাকে তারা। এনসিটিবির কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তরের জন্য মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করা হবে। এ কর্মসূচিতে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা।

বিষয়টি নিয়ে এনসিটিবির উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা হয়। তবে সিন্ডিকেটের অভিযোগ সম্পর্কে তারা সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে জানান, যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে তারা যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।

বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ফিরে আসার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এনসিটিবির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী।

সম্প্রতি শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক বলেছেন, অতীতে যারা খারাপ কাজ করেছে বা শেষ মুহূর্তে এসে নিম্নমানের বই দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তাদের এ বছর বই ছাপার কাজ দেওয়ার আগে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করা হবে। পাঠ্যবই মুদ্রণ কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আগামী বছর যথাসময়ে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা ও অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন