আঠারো বছরের টগবগে তরুণ আলিফ চৌধুরী। উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল তার। বড় ব্যবসায়ী হবেন, কোনোমতে চলা পরিবারের হাল ধরবেন। কিন্তু এখন শুয়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়।
আলিফের এক চোখে অন্ধকার, অন্য চোখে পানি। অসহায় পরিবারের কাছে এখন নিজেই বড় অসহায় হয়ে আছেন। আলোকিত ভবিষ্যতের বদলে দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তায় পড়েছে পুরো পরিবার। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বলি আলিফ, যার বিরূপ প্রভাব দীর্ঘদিন বইতে হবে তার পরিবারকে।
গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই পদযাত্রায় ছাত্রদলের সন্ত্রাসী হামলায় জাতীয় ছাত্রশক্তির কর্মী আলিফ চৌধুরী চোখে গুরুতর আঘাত পান। স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠান চিকিৎসকরা। রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পৌঁছানোর পরই তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। মা-বাবা কেউ সঙ্গে না থাকায় দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কার কারণে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয় আলিফকেই। অপারেশনের পর চিকিৎসকরা জানান, আলিফের বাম চোখে আর দৃষ্টি ফেরার সম্ভাবনা নেই।
আলিফের এ ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় ২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের অমানবিক নির্যাতনের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এহসান রফিকের কথা। সলিমুল্লাহ হলের এই মেধাবী ছাত্রকে দেশের একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। পরে ভারতের শংকর নেত্রালয়ে তার চোখে অস্ত্রোপচার করানো হয়। শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে ওই বছরের আগস্টে দেশ ছেড়ে মালয়েশিয়ার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান তিনি।
ওই ঘটনায় ছাত্রলীগের সাত নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হলেও তারা হলেই বহাল তবিয়তে থাকায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুক্তভোগীকেই দেশ ছাড়তে হয়। অন্যদিকে, আলিফের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হলেও গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। উভয় ঘটনায় ছবিসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় ওঠে। দুজনই সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের রাজনৈতিক দুর্বত্তায়নের বলি। একজন ছাত্রলীগের হাতে, অন্যজন ছাত্রদলের হাতে।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, এ ধরনের ঘটনাগুলো দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফল। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বহুদিন ধরেই চলে আসছে। এর ফলে সমাজে এক ধরনের অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। একটি প্রজন্ম এমন পরিবেশেই বড় হয়েছে, যেখানে তারা মনে করে আলোচনার প্রয়োজন নেই; গায়ের জোরে, মারামারি করে কিংবা শক্তি প্রয়োগ করেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটাই তাদের মানসিকতার অংশ হয়ে গেছে।
এ ধরনের ঘটনায় হামলাকারীর শাস্তির বিষয়ে তিনি আরো বলেন, বিএনপি নেতারা বলেছেন, আগের মতোই সবকিছু চলছে। পুরোনো রাজনীতি ও পুরোনো রাষ্ট্রকাঠামো থেকে বের হওয়া যায়নি। বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রকাঠামোয় মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। একই কাঠামো, একই সংবিধান এবং একই ধরনের প্রশাসনিকব্যবস্থা বহাল রয়েছে। তাই ভিন্ন ধরনের ফলাফল আশা করাও কঠিন। বিএনপিও সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি বলেই মনে হয়।
ছাত্রশক্তির নবীগঞ্জ উপজেলা সংগঠক আলিফের ওপর হামলাকারীর পরিচয় প্রকাশ করেছেন দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। গত বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে হামলার সময়কার একটি ছবি শেয়ার করে লেখা হয়, ‘যে সন্ত্রাসীর হামলায় আমাদের ভাই আলিফের একটি চোখ সারা জীবনের জন্য কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তার নাম নাজমুল হাসান অনি। হবিগঞ্জ সদর উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব। বিচার কি হবে তারেক রহমান?’
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে লেখেন, ‘ছাত্রদল-বিএনপির নিশ্চয়ই মনে আছে, ক্যাম্পাসে রফিকের চোখ নষ্ট হওয়ার ঘটনাই আওয়ামী লীগের পতনের সূচনার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আজ আলিফের চোখ হারানোর ঘটনাও আপনাদের পতনধ্বনি। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, অন্যায় ও সহিংসতার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি ডেকে আনে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন আবারও ঘটছে।’
হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ৬২৭ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন আলিফ চৌধুরী। হাতে ক্যানুলা, বাম চোখে সাদা গজের মোটা ব্যান্ডেজ আর ডান চোখ দিয়ে ঝরছে পানি। তার অসুস্থ বাবা, মানসিক রোগে ভোগা মা গ্রামেই অবস্থান করছেন। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, তারা স্বামীর সংসার করছেন। পরিবারের বড় ছেলে আতিফ চৌধুরী একটি দোকানে কাজ করতেন। কিন্তু ছোট ভাইয়ের সেবা করতে ঢাকায় থাকতে হচ্ছে এখন।
আতিফ চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। পায়ের গুরুতর আঘাত পুরোপুরি সারেনি। মা ঘরে টেইলারি করে কিছু উপার্জন করলেও এখন তা পারছেন না মানসিক সমস্যার কারণে। এখন পরিবারে উপার্জন করার বা সংসারের হাল ধরার মতো আর কেউ নেই। ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল বড় ব্যবসায়ী হবে, নিজের প্রতিষ্ঠানে অনেককে চাকরি দেবে। সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু আজ সে অসহায় হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। তার পাশাপাশি আমাদের চোখেও অন্ধকার নেমে এসেছে। আমরা চরম দুশ্চিন্তায় আছি—কী হবে আমাদের?
তিনি বলেন, বর্তমানে এনসিপি থেকে চিকিৎসার বিষয়টি দেখভাল করা হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য যা যা প্রয়োজন, সবকিছুর ব্যবস্থাই তারা করছে। এ কারণে আমাদের আলাদাভাবে কোনো খরচ বহন করতে হচ্ছে না। তবে ভাইয়ের চোখ তো আর কখনো ভালো হবে না। এখনো ছাত্র সে, বয়স মাত্র ১৮ বছর। তার পুরো জীবন তো সামনে রয়েছে। এক চোখ নিয়ে সে ভবিষ্যতে কী করতে পারবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তো রয়েছেই।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ডিউটি চিকিৎসক ডা. সামিয়া নুজহাত জানিয়েছেন, ইট বা পাথরের আঘাতে আলিফের বাম চোখের আইবল ও আইলিড ফেটে গেছে। চোখের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
ডাক্তাররা জানান, আক্রান্ত চোখের রেটিনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিটিস্ক্যানেও চোখের ভেতরে রক্ত জমাটবাঁধার প্রমাণ মিলেছে। ফলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চোখের গঠন আংশিকভাবে পুনর্গঠন করা গেলেও দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। একটি চোখের সব গুরুত্বপূর্ণ গঠন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেলে খুব বেশি কিছু করার থাকে না।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. আবদুল আহাদ বলেন, সহযোগী অধ্যাপক ডা. এনামুল হকের অধীনে আলিফকে ভর্তি করা হয়। পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অস্ত্রোপচার করা হয়। বাম চোখটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ডান চোখে সাময়িক ঝাপসা দেখলেও সেটি সেরে ওঠার আশা রয়েছে। সংক্রমণ যাতে মস্তিষ্ক বা অন্য চোখে ছড়িয়ে না পড়ে, সেটিও বড় বিবেচনার বিষয়।
আলিফ হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের ফারুক চৌধুরীর ছেলে। তিনি নবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আলিফের এলাকার লোকজন জানিয়েছেন, আলিফ ছিল তার অসহায় পরিবারের বাতিঘর। তার এ অবস্থায় পুরো পরিবারটি ভেঙে পড়েছে।
এদিকে গতকাল শুক্রবার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে আলিফের খোঁজখবর নিতে যান এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। পরে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, হামলাকারীর বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকার বার্তা দিল— ছাত্রদল-যুবদল চাইলে যে কাউকে মারতে পারে, তার কোনো প্রতিবাদ হয় না। এলাকায় গেলে সরকারী দলের এমপিদের আসল চরিত্র বোঝা যায়।
আলিফের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, চিকিৎসকদের বোর্ড সভা শেষে শনিবার (আজ) তার সর্বশেষ স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।
এর আগে আলিফকে দেখতে হাসপাতালে যান বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তাকে দেখার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হবিগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলার ঘটনায় আমি তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। যারা এ নৃশংস হামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৪ পরিবর্তিত বাংলাদেশেও এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা সংঘটিত হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন





