চট্টগ্রামের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার

রোগীদের গুনতে হচ্ছে ১২ গুণ পর্যন্ত অর্থ

রোগীদের গুনতে হচ্ছে ১২ গুণ পর্যন্ত অর্থ

চট্টগ্রামে রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার খরচে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বড় ধরনের মূল্য বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। একই ধরনের পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে করা গেলেও বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় রোগীদের দুই থেকে ১২ গুণ পর্যন্ত বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্বল তদারকি, রেফারেল বাণিজ্য, অস্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ এবং দৃশ্যমান মূল্যতালিকার অভাবে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের।

ভুক্তভোগীদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প খরচে সেবা পাওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, চিকিৎসক ও মধ্যস্বত্বভোগীর যোগসাজশ এবং অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দৃশ্যমান মূল্যতালিকা না থাকায় রোগীরা প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত ব্যয়ের শিকার হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অসংখ্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে চিকিৎসার নামে অতিরিক্ত বিল আদায়, মূল্য নির্ধারণে অস্বচ্ছতা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১৫০-২০০ রোগীর এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০টি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। সরকার নির্ধারিত ফিতে এখানে প্রায় ৩৫ ধরনের পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় সেবা সীমিত হওয়ায় নতুন ভবনের চতুর্থ তলায় নমুনা জমা ও রিপোর্ট সংগ্রহের কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন প্রায়ই তৃতীয় তলার সিঁড়ি পর্যন্ত নেমে আসে। ফলে অপেক্ষা এড়াতে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শরণাপন্ন হন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চমেক হাসপাতালে সিবিসি পরীক্ষার ফি ২০০ টাকা, যেখানে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একই পরীক্ষা ৫০০-৬০০ টাকা। ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা চমেকে ৫০ টাকা, বাইরে ৩০০-৪০০ টাকা। লিপিড প্রোফাইলের জন্য চমেকে ৩০০ টাকা লাগলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয় ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। ট্রপোনিন-আই পরীক্ষার ফি চমেকে ২০০-২৫০ টাকা হলেও শেভরন ও এপিকসহ বিভিন্ন বেসরকারি ল্যাবে প্রায় এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ইউরিন আর/ই ও স্টুল আর/ই পরীক্ষা মাত্র ২০ টাকায় করা হলেও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে একই পরীক্ষার জন্য ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। একই ভাবে এসজিপিটি, ইউরিক অ্যাসিড, বিলিরুবিন, কোলেস্টেরল, ইলেকট্রোলাইট, এইচবিএ১সি, সিআরপি ও সিমেন অ্যানালাইসিসসহ বিভিন্ন পরীক্ষাও সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে সম্পন্ন হচ্ছে। সম্প্রতি বিআরটিএ অনুমোদিত মোটরযান চালকদের জন্য চমেক হাসপাতালে ৯০০ টাকায় ডোপ টেস্ট চালু হয়েছে, যেখানে একই পরীক্ষা বেসরকারি হাসপাতালে করতে তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।

বিশেষায়িত পরীক্ষার ক্ষেত্রেও সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বড় ধরনের মূল্য বৈষম্য রয়েছে। চমেক হাসপাতালে কোলনস্কোপি পরীক্ষার খরচ প্রায় এক হাজার ২০০ টাকা, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে একই পরীক্ষার জন্য পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এছাড়া রক্তে ক্যানসার শনাক্তে বোন ম্যারো পরীক্ষার জন্য চমেকে প্রায় এক হাজার টাকা লাগলেও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একই পরীক্ষার ফি প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অজ্ঞান করার জন্য অতিরিক্ত ফিও আদায় করা হয়।

থাইরয়েড পরীক্ষার ক্ষেত্রেও সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। চমেক হাসপাতালের ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালাইড সায়েন্সেস (ইনমাস)-এ টিএসএইচ পরীক্ষা প্রায় ৫০০ টাকায় করা গেলেও বেসরকারি ল্যাবে একই পরীক্ষার জন্য ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। আবার টি-৩, টি-৪ ও টিএসএইচ সমন্বিত থাইরয়েড প্রোফাইল ইনমাসে এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকার মধ্যে সম্পন্ন হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একই পরীক্ষার জন্য রোগীদের দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে উন্নতমানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ রোগী এ বিষয়ে অবগত নন। তথ্যের অভাব, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় দালালচক্র এবং বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী রেফারেল বাণিজ্যের কারণে অনেক রোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য হন। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীরা।

চট্টগ্রাম ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক্যাল ল্যাব ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. একেএম ফজলুল হক বলেন, বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একটি পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু টেস্টের খরচ নয়; পরীক্ষায় ব্যবহৃত মেডিকেল উপকরণ, আধুনিক অবকাঠামো, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি, উন্নত যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, দ্রুত সেবা ও মুনাফাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কারণে ও পরিচালনা ব্যয়ও বেশি। এতে সরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার মূল্য কিছুটা বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, চট্টগ্রাম মহানগরে বর্তমানে নিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১৭৫টি এবং হাসপাতাল রয়েছে ৯২টি। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে ২১৬টি এবং হাসপাতালের সংখ্যা ৭৮টি। তিনি বলেন, নিবন্ধিত হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে এবং নিবন্ধনসংক্রান্ত বিধিমালা বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ ফজলে রাব্বী বলেন, বেসরকারি ল্যাবরেটরিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরো বিভিন্ন পরীক্ষার ফিও সরকার নির্ধারণ করবে। বর্তমানে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মূল্যতালিকা তাদের নিজস্ব সমিতির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। তবে নিয়মিত তদারকির জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের একটি কমিটি পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন