বাংলাদেশের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ লড়াই মহান জুলাই বিপ্লব। জুলাইয়ের এক রক্তনদীর মধ্য দিয়ে আমরা এই নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নতুন এক ইতিহাসের পথ তৈরি করতে পেরেছি।
এই ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক দল বদলের ইতিহাস নয়; বাংলাদেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আধিপত্যবাদবিরোধী উত্থান এবং স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সবকিছু ত্যাগ করার মহান ইতিহাস। ইতিহাসের সেই পাতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অনেক নাম, যারা এই ভূমিকে রক্ষা করার জন্য কোনো কিছু না ভেবেই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
শহীদ আব্দুল রাকিব তাদেরই একজন। তার শহীদ হওয়ার ঘটনা কোনো রূপকথা নয়, তবে ২২ বছর বয়সি এই তরুণের জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল রূপকথার চেয়েও অসাধারণ।
আব্দুল রাকিবের জন্ম ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি, কুমিল্লার মুরাদনগরে। তিনি ছিলেন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, অন্যদের চেয়ে তার বিচারবুদ্ধি ছিল ভিন্ন। তবে তার দেশপ্রেম অতুলনীয়, অনির্বচনীয়।
জুলাই আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন যাত্রাবাড়ীর রাজপথ মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। খুনি হাসিনার সরাসরি নির্দেশ—দেখামাত্রই গুলি। তবুও আন্দোলন চলছে, যাত্রাবাড়ীর মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা তাদের দেশের অধিকার দখলে নিতে অকুতোভয়, ইস্পাতদৃঢ় ও অটল।
ফ্লাইওভারে, রাস্তায় ও যাত্রাবাড়ী পার্কের সামনে একের পর এক মানুষ গুলিবিদ্ধ হচ্ছেন, লাশ পড়ে থাকছে রাস্তায়। অথচ ‘ভয়’ শব্দটি যেন জনতার অভিধান থেকে মুছে গেছে। একজন পড়ে গেলে আরেকজন সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। গুলির মুখেও মানুষের চোখে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
এই দৃশ্যগুলো গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল রাকিবকে। বিশেষ করে শহীদ আবু সাঈদের প্রসারিত দুহাত যেন তার ভেতরে এক নতুন সাহস জাগিয়ে তোলে। রাকিব নিজেও পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত ছড়িয়ে বলতেন, ‘বুক পেতেছি, গুলি কর।’
এভাবে বলতে বলতে বুকে বাংলাদেশের পতাকা বেঁধে নিয়ে মিছিলের একদম সামনে চলে যেতেন রাকিব। ১৯ জুলাই পুলিশের ছোড়া ছররা গুলিতে আহত হন রাকিব। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, কমপক্ষে ৫০টি ছররা বুলেট তার পিঠে লেগেছিল সেদিন।
সাধারণ কোনো মানুষ হলে হয়তো সেদিনের পর আর রাজপথে ফিরতেন না রাকিব। কিন্তু রাকিব তো সাধারণ কেউ নন, তিনি তার দেশ বাঁচানোর, দেশের মানুষকে গুম, খুন, লুটতন্ত্রী জালেমের হাত থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন; তার কাছে নিজের নিরাপত্তার চেয়ে দেশের মুক্তির প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। এক দিনও রাকিব ঘরে বসে থাকেননি।
এরপর আসে ৫ আগস্ট।
সেদিন সকাল থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ঢাকার দিকে ছুটে আসছিল, কর্মসূচি ছিল ‘লং মার্চ টু ঢাকা’। তখনো কেউ নিশ্চিত ছিল না, সেদিনই শেখ হাসিনার পতন ঘটবে। কিন্তু মানুষের অন্তরে যেন এক অদৃশ্য বিশ্বাস কাজ করছিল—আজ সবার যাত্রা এক নতুন ইতিহাসের দিকে।
রাকিবও বের হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা তাকে আটকাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন, বিশেষ করে রাকিবের মা। তার মায়ের ভাষ্যমতে, মিছিলের সামনের সারি ছাড়া রাকিব কোথাও দাঁড়ায় না, তিনি নিশ্চিত আজকেও একই কাজ করবে।
১৯ জুলাইয়ে পাওয়া ছররা গুলির আঘাত, চলমান মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ—সব মিলিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তার পরিবারের মধ্যে ভয় কাজ করছিল। কিন্তু রাকিব তো মিছিলে যাবেনই, আন্দোলনে যোগ দেবেনই, তিনি কোনোমতেই ঘরে থাকবেন না। একটা সময় আব্দুল রাকিব কেঁদে দেন, পরিবারের কাছে নানা যুক্তি উপস্থাপন করতে থাকেন—কেন তার আন্দোলনে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
রাকিবের পরিবার কোনোমতেই এই অসুস্থ শরীর নিয়ে তাকে আন্দোলনে যেতে দেবে না। একপর্যায়ে তাকে ঘরের ভেতরে লোহার শেকল দিয়ে বেঁধে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। কিন্তু কিছুতেই রাকিবকে সেদিন শেকল দিয়ে আটকে রাখা যায়নি। তিনি শেকল ভেঙে রাস্তায় নেমেছিলেন স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিতে।
আন্দোলনে যাওয়ার সময় তিনি পকেটে করে ইট নিয়ে যেতেন। পকেটে থাকা একটি ইট তার চোখে পড়ে। সেই ইট দিয়েই তিনি ভেঙে ফেলেন তালা। ভেঙে ফেলেন ভয়, বাধা আর বন্দিত্ব। তারপর বেরিয়ে পড়েন ছাত্র-জনতার মিছিলে। কেউ দিকনির্দেশনা দেয়নি, তবু সবাই জানত তাদের গন্তব্য গণভবন।
যাত্রাবাড়ীর রাজপথ তখন লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর। ঠিক দুপুর ২টায় থানা ভবনের ওপর থেকে শুরু হয় পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ। সেই গুলির একটি এসে বিদ্ধ করে আব্দুল রাকিবকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, গুলিটি তার বুক ভেদ করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। স্নাইপার থেকে ছোড়া সেই গুলিতেই রাজপথে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সেখানেই শেষ হয় মাত্র ২২ বছরের একটি জীবন।
রাকিব যে শেকলটি ভেঙেছিলেন, তা শুধু লোহার শেকল নয়; সেটি ছিল ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণের শেকল, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করার শেকল, একটি মুক্ত ও স্বাধীন ভবিষ্যতের পথে প্রতিবন্ধকতার শেকল। তিনি সেই শেকল ভেঙে প্রমাণ করেছেন, এই উত্থান অনিবার্য; পৃথিবীর কোনো বাধা এই জাগরণকে আটকাতে পারবে না।
লেখক : সহ-সম্পাদক, আমার দেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


