বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি

তারুণ্যে যাই উচ্চশিক্ষার জন্য, বিশ্বে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় বলে খ্যাত, যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি—ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। মাঝখানে একটি বাসস্টপ বাদ দিয়ে পরের বাসস্টপটিই হার্ভার্ডের, সেখানেই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানেও একই সঙ্গে ভর্তি হই কোর্সে, সেই সুবাদে পড়ি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সায়েন্স সেন্টার’, অর্থাৎ ‘বিজ্ঞান কেন্দ্রে’-ও। সেই তারুণ্য তখন বিজ্ঞানে বিজ্ঞানে বিজ্ঞানময়।

বিশ্বে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বেশি পরিচিত চূড়ার বিশ্ববিদ্যালয় বলে। কিন্তু পরে জানলাম, ‘অবস্থান বিচার’ (‘ianking’)-এ এমআইটিই সর্বোচ্চে—এখনো এমআইটি প্রথম, হার্ভার্ড তৃতীয়। সে সময় ‘র‍্যাংকি’-এর কোনো হিসাব-কিতাব ছিল না—বুঝতামও না। এখনো খুব একটা না। তবে বহু পরে অন্যদের কাছে তা শুনে কৃতজ্ঞতাবোধ হলো, বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষার এমন একটি অসাধারণ উচ্চতর সুযোগ পাওয়ার জন্য।

বিজ্ঞাপন

সেখানে সারাক্ষণই চলতে-ফিরতে বড় বড় বিজ্ঞানীদের সঙ্গে একেবারে সাধারণভাবে দেখা হতো। প্রচলিত ছিল, এমআইটিয়ের শিক্ষকদের ক্যান্টিনে গেলে যেকোনো সময়ই ধরে নিতে পারো, সেখানে সে সময় যারা আছেন, তার ২৫ শতাংশ ভাগই নোবেল বিজয়ী। কথাটি একটু অতিরঞ্জিত হবে হয়তো—কিন্তু কিছুটা ধারণা দেয়।

আমরা ছাত্ররাও সেখানে অনেকটা সে রকমই ছিলাম—সবাই কোনো না কোনো বৈজ্ঞানিক ফিকিরে। খেলাধুলাও যেন ছিল বিজ্ঞান । আমার থাকার জায়গা একসময় ছিল এমআইটিয়ের ‘ট্যাং হল’—সেখানে হলের প্রতি তলায় কয়েকটি ফ্ল্যাট, তার একটির চার কক্ষের আমরা চারজনের একজন। ভিক্টর একদিন বলল, ‘আমার অফিসে চলো, একটি খেলনা বানিয়েছি—দেখাব ।’ সেখানে ছাত্রদেরও অফিস দেওয়া হতো।

তার অফিসে গিয়ে দেখি, ছোটখাটো একটি যুদ্ধবিমান বানিয়ে রেখেছে। তাতে বৈজ্ঞানিক নতুন এমন কী কী আছে, যা তখনো অন্যসব যুদ্ধবিমানে নেই—জানাল। তার পড়াশোনার বিষয় আমার নয়, তাই খুব একটা কিছু বুঝলাম না। কিন্তু সে তার এই ‘খেলনা’-য় খুব খুশি। কিছুদিন পর শুনলাম, মার্কিন বিমান বাহিনী—বা সরকার—তা নিয়ে গেছে, সেমতো বোধ হয় বানাবে ।

আমি নিজে একবার এমন একটি ফোন বানানোর ধারণা দাঁড় করালাম, যার কোনো তার লাগবে না। লোকে পকেটে পকেটে নিয়ে সঙ্গে রাখতে পারবে (আমার তখন এমন একটি ফোনের খুব দরকার মনে হচ্ছিল, পড়াশোনার সুবিধার জন্য)। সে সময় এমআইটি আর পার্শ্ববর্তী হার্ভার্ড ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যৌথ গবেষণা প্রকল্পের তিন সদস্যে গবেষণা ‘টিম’-এর দুজন জ্যেষ্ঠ প্রফেসরের সঙ্গে আমাকে কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছিল। এমআইটিতে অনুষ্ঠিত একটি অতি সীমিত ক্ষুদ্র সেমিনারে, আমি আমার ধারণাটিও বলি—আমাদের মতো দরিদ্র দেশে কোটি কোটি ডলারের সমুদ্র তলদেশীয় অপটিক ফাইবারের তার দিয়ে বিশ্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় সংযুক্তির প্রায় বিনামূল্যের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে।

সেখানে সুইডেনের এরিকসন কোম্পানির এক প্রতিনিধিও ছিলেন। আমার ধারণাটি শুনে তিনি চকিত হয়ে বললেন—‘আবার বল তো?’ বললাম। তিনি নোট করে নিলেন। পরের বছর এরিকসন বিশ্বে প্রথম, জনসাধারণের ব্যবহারের ‘মোবাইল’ ফোন চালু করে। আমি তখন বুঝিওনি—বা খেয়ালও করিনি—যে জনসাধারণের তারবিহীন ফোন আমারই আবিষ্কার।

কয়েক বছর পর অস্ট্রেলিয়া ফিরে গেলে এক পুরোনো বন্ধু, যে সুইডেনে এরিকসনে অনুবাদের কাজ করত, ছুটিতে এলে আমার সঙ্গে সৌজন্য দেখা করতে আসে। সে তখন যা বলল, তাতে মনে হলো, এরিকসন আমার ওই সেমিনারে দেওয়া ধারণা থেকেই প্রায় নিশ্চিতই ফোনটি তৈরি করে। সে বলল, ‘তুমি দাবি করলে তো অনেক টাকা পেতে তার জন্য।’ আমি বলি, ‘আমি তো টাকার কথা ভেবে সে ধারণা আবিষ্কার করিনি।’ এখনো আমি তা থেকে নিজে কোনো আর্থিক কিছুই আশা করিনি, দাবিও করিনি।

আমার আর ভিক্টরের দুটো আবিষ্কারের ঘটনার কথা বললাম শুধু এমআইটিয়ের পরিবেশটা বোঝাতে—এমআইটিতে ছাত্ররা আমরা এ রকমই ছিলাম। অন্যরা তো দূরের কথা, পার্শ্ববর্তী ‘সহোদরা’ বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ডের ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের ‘নার্ড’ (‘nerd’)—অর্থাৎ ‘বইপোকা বোকা’ বলত। বলত, আমরা নাকি পানি খাই বিজ্ঞানাগারের ‘বিকার’-এ, দুনিয়ার কিছু বুঝি না!

সে যাক। সেই বিজ্ঞান জগতের শিখরে গিয়ে প্রথম একটি ধাক্কা খেলাম, যখন পড়াশোনার সবকিছুর শুরুতেই তুলনামূলক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সিদ্ধান্ত প্রণয়ন বিষয়ে পড়তে গিয়ে শুনলাম ও শিখলাম—বিজ্ঞান কোনো কথাকেই সঠিক প্রমাণ করতে পারে না, বড়জোর পারে কোনো একটি কথাকে সাময়িক ও সম্ভবত ভুল বলে প্রমাণ করতে।

কী মারাত্মক কথা! সারা জীবন শুনে এসেছি—যে কথা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক প্রমাণিত নয়, তাকে বিজ্ঞান সত্য বলে মানে না। আর যা প্রমাণিত নয়, তা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আর আধুনিক যুগে যা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, তা-ই কুসংস্কার আর কুসংস্কার পরিত্যাজ্য। আবার যা বিজ্ঞানীরা বলেছেন, তা সবই নিশ্চিত সঠিক সত্য।

এসব কথার ভিত্তিতেই আধুনিক আমাদের অনেকেই সমাজের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, সমাজে প্রচলিত নীতিকথা, বচন বা ধর্মের কোনো কথার সঙ্গে বিজ্ঞানীদের বলা বলে প্রচলিত নতুন কোনো কথার সংঘাত দেখা গেলে—ঐতিহ্য বা ধর্মের কথাটিই বাদ দিয়ে দেয়, তাকে কুসংস্কার মনে করে। একইভাবে বিজ্ঞানীদের বলা বলে শোনা বা পড়া সব কথাকেই সত্য বলে বিশ্বাস করে—কোরআন-হাদিস বা বেদবাক্যের মতো, বরং তার চেয়েও অনেক বেশি—ডারউইনের ‘বানর থেকে মানুষ হওয়ার’ ‘থিওরি’, ‘বিগ ব্যাং’, ‘ব্ল্যাক হোল’সহ নানা সবকিছু।

এমআইটিয়ের ওই শিক্ষার সূচনায় যখন জানলাম, বিজ্ঞানেরই কথা হলো—বিজ্ঞান কোনো কথাই সঠিক বলে প্রমাণ করতে পারে না—তাহলে সারাজীবন ধরে আর প্রায় সবাই বিজ্ঞান সম্পর্কে যা শুনে এসেছি, তা তো বাতিল জানলাম। এতে দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গেল!

এমআইটিতে বিজ্ঞান শিক্ষার সূচনার বিজ্ঞান সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাই বদলে ফেলে প্রকৃতই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দীক্ষিত করা ওই শিক্ষার কথাটি বুঝতে সুবিধার জন্য একটি উদাহরণ দিয়ে খুলে বলি।

বিজ্ঞানীদের প্রকৃতই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো বিজ্ঞানীই বলবে না, আগুনে হাত দিলে হাত পোড়ে। সাধারণ লোকরা তা সাধারণত বলে। কারণ তারা তাদের দেখা ঘটনা সব থেকে সিদ্ধান্ত করে মনে করে—এটি প্রমাণিত, আগুনে হাত দিলে হাত পোড়ে । কেননা তারা তাই দেখে সাধারণত।

কিন্তু বিজ্ঞানী তার প্রকৃতই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলবেন, আগুনে হাত দেওয়া আর হাত পোড়া একসঙ্গে দেখা যায় বটে সাধারণত—কিন্তু তাতে প্রমাণ হয় না যে, আগুনে হাত দেওয়ার কারণেই হাত পুড়েছে, তা মনে হলেও।

কেননা, হয়তো ওই আগুনে হাত দেওয়া আর হাত পোড়া—এ দুই ঘটনার সময়ই বিশ্বে এমন আরো কোটি কোটি অন্য ঘটনা ঘটছে, যার কোনো একটির কারণে হাত পুড়েছে, আগুনে হাত দেওয়ার কারণে নয় । এমনও হতে পারে, ঠিক ওই সময় কোটি কোটি মাইল দূরের অন্য কোনো জগতের অন্য কোনো সূর্যের রশ্মি এসে হাত পুড়িয়ে দিয়েছে, যদিও সে রশ্মি আমাদের চোখের দেখার সীমিত ক্ষমতার বাইরে। যেমন : এক্স-রে রশ্মি আমরা দেখতে পাই না, অথচ তা আমাদের বুকের চামড়া আর পাঁজরের হাড় ভেদ করে ভেতরে ঢুকে ফুসফুসের ছবি তুলে নিতে কাজে আসে।

অথবা অন্য কোনো বিষয় হাতে পোড়ায় একই সময়, যখন হাতটা আগুনে দেওয়ার ঘটনাটি ঘটে। যেহেতু আমরা আগুনে হাত দেওয়ার ঘটনাটি দেখি, কিন্তু হাত পোড়ার আসল কারণটি দেখি না, সেহেতু দৃশ্যমান ঘটনা—হাত আগুনে দেওয়া—তাকেই হাত পোড়ার জন্য দায়ী মনে করি। কিন্তু, কোনো কিছু আগুনে দিলেই তা পোড়ে—তা যদি সত্য হতো, তাহলে কেনইবা কোনো কোনো সময় কোনো একটা জিনিস আগুনে দিলেও পোড়ে না? ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সাধকদের জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়, তাদের পা-ই বা পোড়ে না কেন? এমনটিই হবে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিধারী ব্যক্তির সংশয়ময় চিন্তা।

বিজ্ঞানপ্রিয় সাধারণ লোক থেকে ভিন্ন, প্রকৃতই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিধারী বলে বিজ্ঞানী বলবেন—আগুনে হাত দেওয়া আর হাত পোড়ার ভেতর একটি ‘সমসাময়িকতার সম্পর্ক’ (‘correlation’)—‘একই সময়ে ঘটা’ দেখা যাচ্ছে । কিন্তু কোনো ‘কারণিক সম্পর্ক’ (‘causal relation’)—একটি ঘটনার কারণে অন্য ঘটনাটির ঘটার কোনো প্রমাণ নেই।

আরেকটি উদাহরণ দিয়ে আরো পরিষ্কার করা যাক। সলিম মিঞা করিম মিঞা থেকে ১০০ টাকা ধার নিয়েছিল, এখন আর ফেরত দিচ্ছে না। তা আদায় করতে সলিম মিঞা যেখানেই যায়, করিম মিঞা সেখানে গিয়েই হাজির হয়।

একই সময়ে, সলিম মিঞা পড়েছে আনারকলি বেগমের প্রেমে—যেখানেই যায় আনারকলি, সেখানেই গিয়ে হাজির হয় সলিম।

সব মিলিয়ে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, সলিম, করিম আর আনারকলি—তিনজনকেই সবসময়ই একই জায়গায় দেখা যায়।

এখন যারা সলিম আর আনারকলির প্রেমের খবর জানে না, সলিমের করিমের কাছে পাওনার খবরও জানে না—তারা যেখানেই আনারকলি, সেখানেই করিমকে দেখে ভাবতে পারে, করিম আনারকলির প্রেমে পড়ে, তার পেছন পেছন ঘুরছে।

আসলে তাহলে এখানে করিম আর আনারকলি—এ দুজনের এক জায়গায় থাকাটায় দুয়ের ভেতর ‘সমসাময়িকতার সম্পর্ক’ (‘correlation’)—‘একই সময়ে ঘটা’ আছে। কিন্তু কোনো ‘কারণিক সম্পর্ক’ (‘causal relation’) নেই।

কিন্তু যারা এ পুরো কাহিনি জানে না, তারা ভেবে বসবে—করিম সবসময় আনারকলির কাছে থাকাটা হচ্ছে আনারকলির জন্যই, তার প্রেমে পড়েই করিম যাচ্ছে সেখানে । যদিও বেচারা করিম তা জানেও না, আনারকলিকে চিনেও না।

প্রকৃত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিধারী বিজ্ঞানী, সাধারণ লোকের মতো না হয়ে, এ রকম ভুল থেকে বেঁচে থাকেন । কেউ এর কারণে ওই ঘটেছে—এমন কোনো কথা বললে, তাকে কখনোই নিশ্চিতভাবে সঠিক বলে প্রমাণিত, এমনকি প্রামাণ্যও, বলতে পারেন না । বলেন না।

তাই ডারউইন বা অন্য কোনো বিজ্ঞানী কিছু বললেই বা বলে থাকলেও, সে ধরনের কোনো বক্তব্যকে কোনো বিজ্ঞানী নিশ্চিতভাবে সঠিক বা প্রমাণিত সত্য বলে দাবি করবেন না। যদিও সাধারণ বিজ্ঞানী-ভক্ত এবং নিজেকে বিজ্ঞানমনস্ক মনে করা তথাকথিত ‘আধুনিক’ লোকরা তা-ই মনে করে বা বলে।

এ রকম বিজ্ঞানী-ভক্তি কার্যতঃ পীরপূজার কুসংস্কারেরই একটি আধুনিক রূপ । পরিত্যাজ্য। প্রকৃত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিধারী বিজ্ঞানমনস্করা বিজ্ঞানের আলোকে, ও স্বার্থেই, তাই করবেন।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি, হার্ভার্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সুইনবান ইউনিভার্সিটিতে মস্তিষ্ক ও ব্যবহার বিজ্ঞান, তুলণামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সহ বিবিধ বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণাপূর্রবক প্রথমোক্ত থেকে পি.এইচ.ডি. সহ অন্যান্য ডিগ্রী অর্জন করেন। ঢাকা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাণে শিক্ষককতা ও গবেষণা করেন, এমআইটি-´র কনসাল্ট্যানট ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন