এবার লিবিয়ার তেলে ট্রাম্পের চোখ

হেন্দিয়া আল আশিপি

এবার লিবিয়ার তেলে ট্রাম্পের চোখ
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ধরে যুক্তরাষ্ট্রে এনে কারাবন্দি করার পর দেশটির জ্বালানি তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটির তেল বিক্রি করে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। কিন্তু বিপুল এই অর্থ কোথায় বা কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ট্রাম্পের চোখ এখন লিবিয়ার তেলের দিকে। তিনি তার প্রতিনিধি ও বেয়াইয়ের (মেয়ে টিফানির শ্বশুর) মাধ্যমে লিবিয়ার পূর্ব ও পশ্চিম অংশে ক্ষমতাসীন দুটি সরকারসহ তিনটি রাজনৈতিক পক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে দেশটির তেল সম্পদের ওপর মার্কিন ব্যবসায়ীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন।

লিবিয়া নিয়ে ট্রাম্পের নতুন করে আগ্রহ দেখানোর নেপথ্যে রয়েছে দেশটির জ্বালানি তেল। এতদিন লিবিয়ার ঘটনাবলিতে ট্রাম্পের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু হঠাৎ করে এখন এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো একটি হিসাব—২০৩০ সালের মধ্যে লিবিয়ার দৈনিক তেল উৎপাদন দ্বিগুণ করে ৩০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করা হলে তা কনোকোফিলিপস, শেভরনসহ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য লাভজনক হবে। এসব কোম্পানি লিবিয়ার তেল নিয়ে এরই মধ্যেই চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার আলোকে লিবিয়ার তিনটি প্রধান রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্ষমতার অংশীদারত্ব নিয়ে একটি চুক্তি করেছে গত ১৮ জুন। এই চুক্তির মাধ্যমে ২০২৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির আগে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনের রূপরেখা তৈরি করা হয়। সংঘাতকবলিত লিবিয়ায় গত ১৮ বছরের মধ্যে এটি এ ধরনের প্রথম চুক্তি। এই চুক্তির কাঠামোটি গত এপ্রিল মাসে গৃহীত ৩০ বিলিয়ন ডলারের ‘একীভূত রাষ্ট্রীয় বাজেট’র ওপর ভিত্তি করে তৈরি। গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় লিবিয়ায় প্রণীত প্রথম একীভূত বাজেট এটা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরব ও আফ্রিকাবিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা এবং মেয়ে টিফানির শ্বশুর মাসাদ বুলোস এই চুক্তি স্বাক্ষরের নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। এই চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রোমে একটি গোপন বৈঠক হয়। এরপর থেকেই এই প্রক্রিয়ার মূল ব্যক্তি হিসেবে কাজ করছেন মাসাদ বুলোস। সাধারণ লিবিয়ানদের মধ্যে এই চুক্তির সফলতা নিয়ে এরই মধ্যেই সংশয় তৈরি হয়েছে। কারণ, দেশটির সুশীল সমাজ, উপজাতি গোষ্ঠীগুলো, বিভিন্ন মিলিশিয়া বাহিনী এবং নারী ও তরুণ সমাজের কোনো প্রতিনিধি রোমের সেই বৈঠকে রাখা হয়নি।

মাসাদ বুলোস কোনো পেশাদার কূটনীতিক নন। তিনি একজন লেবানিজ-আমেরিকান ব্যবসায়ী। লিবিয়ার জনগণের মন্তব্য হলো—তার প্রধান যোগ্যতা হলো তিনি টিফানি ট্রাম্পের শ্বশুর। লিবিয়ার ব্যাপারে ট্রাম্পের আগ্রহ মূলত দেশটির তেল নিয়ে। তার এই হিসাব-নিকাশটি ন্যাটোর লিবিয়ায় হস্তক্ষেপের সময় দেওয়া ট্রাম্পের সেই পুরোনো বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিনিময়ে লিবিয়ার তেল বিক্রির আয়ের অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্রের পাওয়া উচিত।

আফ্রিকা মহাদেশে তেলের প্রমাণিত মজুতের সবচেয়ে বড় ভান্ডার রয়েছে লিবিয়ায়। কিন্তু দেশটিতে চলমান সংঘাত ও বিভাজনের কারণে এই তেল সম্পদ ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশটির জাতীয় তেল কোম্পানি ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশনকে একীভূত করা এবং দলীয় বা গোষ্ঠীগত হস্তক্ষেপ থেকে এটিকে রক্ষা করা গেলে দৈনিক তেল উৎপাদন ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে রাষ্ট্রীয় আয়ও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

কিন্তু লিবিয়ার পূর্ব অংশে যুদ্ধবাজ নেতা জেনারেল হাফতারের সমর্থিত সরকার ও পশ্চিম অংশে ত্রিপোলিভিত্তিক জাতিসংঘ সমর্থিত ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটি’ (জিএনইউ) ক্ষমতায় থাকায় এই তেল সম্পদ ভাগাভাগি ও লুটপাট হচ্ছে। জিএনইউয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল্লাহ ইজ্জেদিন দ্য নিউ আরবকে বলেন, দুটি সরকার এক হলে ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসবে এবং অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-ফিতোরি বলেন, ‘লিবিয়া এমন একটি অঞ্চলে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি শহর এক-একটি রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে। তার মতে, একটি ঐক্যবদ্ধ সাংবিধানিক কাঠামোই জাতীয় নির্বাচনের একমাত্র পথ, যে নির্বাচনে একটি বৈধ ও স্থায়ী কর্তৃপক্ষ গঠিত হবে।

ঐক্যবদ্ধ বাজেট প্রণয়নে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার জাতীয় স্বার্থে আপস-মীমাংসায় রাজিও হয়েছিল। লিবিয়ার সিরতে শহরে আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক কমান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত ‘ফ্লিন্টলক ২০২৬’ নামের সামরিক মহড়ায়ও উভয় পক্ষের বাহিনী প্রথমবারের মতো একই কমান্ডের অধীনে অংশ নিয়েছে। তবে মূল সমস্যাটি নিহিত রয়েছে নতুন এই চুক্তির কাঠামোর মধ্যেই।

বুলোসের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রোমে অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠকে খলিফা হাফতারের বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার ও তার ছেলে সাদ্দাম হাফতার এবং জিএনইউয়ের প্রধানমন্ত্রী আব্দুল হামিদ দবেইবেহর ভাতিজা ও উপদেষ্টা ইব্রাহিম দবেইবেহ প্রথমবারের মতো মুখোমুখি আলোচনায় বসেন। সেই বৈঠকের প্রস্তাবে সাদ্দাম হাফতারের নেতৃত্বে নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ‘প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল’ গঠনের কথা বলা হয়। পাশাপাশি দবেইবেহ’র নেতৃত্বে একটি ঐক্যবদ্ধ সরকার গঠন এবং ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী দুই পরিবারের মধ্যে সামরিক কমান্ড ভাগ করার প্রস্তাবও করা হয়।

মূলত ক্ষমতার শক্ত অবস্থানে থাকা পক্ষগুলোর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি সমঝোতা তৈরির মাধ্যমে এই উদ্যোগটি নেওয়া হচ্ছে। তাই এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলেও লিবিয়ায় বিরাজমান মূল সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান হবে না। লিবীয় বিশ্লেষক আব্দুলসালাম আল-রাজহি বলেছেন, এই চুক্তি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে।

ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর চুক্তি ও লিবিয়ার তেল

জাতিসংঘ-সমর্থিত পুনর্মিলন ও মানবাধিকারবিষয়ক ‘স্ট্রাকচার্ড ডায়ালগ’ বা কাঠামোগত আলোচনা প্রক্রিয়ার সদস্য হানিন বুশুশে বলেন, নির্বাহী ক্ষমতাকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে নেওয়া যেকোনো উদ্যোগকে শুধু ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর মধ্যকার রাজনৈতিক সমঝোতা দিয়ে বিচার করলে চলবে না, বরং সাধারণ লিবীয়দের ওপর এর প্রভাবের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। তিনি ‘দ্য নিউ আরব’কে বলেন, ‘একত্রীকরণ তখনই অর্থবহ হতে পারে, যখন তা বৈধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়। যদি সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধান না করে শুধু নাম পরিবর্তন বা পদ পুনর্বণ্টনের মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সমস্যা থেকেই যাবে।’

রাজনৈতিক সমালোচকদের মতে, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা করা হলে তা জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়ার বৈধতাকে দুর্বল করবে। নতুন এই চুক্তিতে বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্যের পরিবর্তে ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর মধ্যকার দরকষাকষিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

রাশিয়া নতুন এই চুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখছে এবং ‘বুলোস উদ্যোগ’কে বার্লিন প্রক্রিয়াকে পাশ কাটানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া বারবার বলছে যে, লিবিয়ায় যেকোনো সমাধানের ক্ষেত্রে অবশ্যই দেশটির নিজস্ব মালিকানা ও নেতৃত্ব থাকতে হবে।

এরপর কী হতে যাচ্ছে

১৮ জুনের চুক্তিটি গত কয়েক বছরের মধ্যে লিবিয়ার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে নেওয়া সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। একটি সমন্বিত বাজেট বাস্তব রূপ পেয়েছে। যৌথ সামরিক মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের রূপরেখাও কাগজে-কলমে তৈরি আছে। কিন্তু এই উদ্যোগগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে যে বিষয়ের ওপর তা হলো—চুক্তিটি কি শুধু হাফতার ও দবেইবেহ পরিবারের মধ্যকার সমঝোতা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এই দুই পরিবারের বাইরে লিবিয়ার সাধারণ মানুষ নিজেদের বলে মনে করবে? ২০১১ সালে পশ্চিমাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গাদ্দাফির ক্ষমতাচ্যুতি ও নিহত হওয়ার পর থেকে লিবিয়ার ইতিহাস বলে, এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া সহজ নয়।

লিবিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মূল দুর্বলতাগুলো আমলে না নিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের তেলবাণিজ্যের লক্ষ্য হাসিলে তিনটি পক্ষের মধ্যে সমঝোতা গাজা, লেবানন ও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণেরই প্রতিফলন। এসব দেশে ওয়াশিংটন সাফল্য ঘোষণা করার পরপরই প্রাথমিক চুক্তিগুলো ভেস্তে গেছে। লিবিয়ায়ও হয়তো তাই ঘটবে। এরই মধ্যে দেশটির বিভিন্ন মহল জোরালোভাবে বলছে, কয়েকটি পরিবারের মধ্যে চুক্তি লিবিয়ার জনগণের পক্ষে কোনো চুক্তি নয়।

দ্য নিউ আরব অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন