ঘরের ভেতরেই বাড়ছে নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা। পরিবারগুলোতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত জাতীয় ফোনকলে প্রতি ঘণ্টায় নারীর প্রতি নির্যাতনের অভিযোগ আসছে প্রায় পাঁচটি। এসব অভিযোগের সিংহভাগই হচ্ছে পারিবারিক ভায়োলেন্স। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের ঘটনাও একেবারে কম নয়।
পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় গত তিন বছরের মধ্যে কোনো মামলার তথ্য নেই পুলিশ সদরদপ্তরে। এসব ঘটনার ক্ষেত্রে থানায় মামলা হলেও দীর্ঘসূত্রতার জন্য বিচারের প্রতি আগ্রহ হারান ভুক্তভোগী। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তরসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
গত জুন মাসে যাত্রাবাড়ী কাজলার পাড় থেকে ঘরের ভেতর আটকে রাখা গৃহবধূ হিরাকে উদ্ধার করে পুলিশ। দুই সন্তানের মা হিরাকে তার স্বামী-শাশুড়ি বাসার একটি রুমে আটকে রাখেন। পরে ৯৯৯-এ কল করা হলে তাকে ওই বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। এ ঘটনায় থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন হিরা। কিন্তু পুলিশ ঘটনাটি মীমাংসা করে নেওয়ার তাগাদা দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চলতি জুলাই মাসেই বরিশালের মুলাদী উপজেলার সফিপুর ইউনিয়নে নিখোঁজের তিনদিন পর হারুন হাওলাদার (৫৯) নামের এক ব্যক্তির মাটিচাপা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় স্ত্রী সেলিনা বেগমকে (৪৬) আটক করা হয়েছে।
পারিবারিক নিষ্ঠুরতার অনেক খবর প্রতিনিয়ত সামনে আসছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় মদ্যপ অবস্থায় বয়োবৃদ্ধ মাকে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। রাজধানীর বংশালে ইয়াবা সেবন নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মো. সুমন (৪২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সুমন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী ছিলেন বলে জানা গেছে। গত ৭ জুলাই বংশালের নাজিমুদ্দিন রোডের জমিদার গলির একটি বাসায় ঘটে এমন ঘটনা।
সাম্প্রতিক এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বাড়ির ভেতরের সহিংসতার ঘটনাগুলো হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়াচ্ছে। স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন, স্ত্রীর হাতে স্বামী খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। আর শুধু নারীই নয়। বয়স্ক মা-বাবা, শিশু, কন্যাশিশু নির্যাতিত হওয়ার ঘটনাও বেড়ে চলছে।
চলতি বছরের গত ছয় মাসে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে ফোনকল এসেছে প্রায় দুই লাখ। জাতীয় হেল্পলাইন নম্বর ১০৯/৯৯৯সহ বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে এমন চিত্র ফুটে উঠেছে। মা-বাবার হাতে সন্তান, সন্তানের হাতে মা-বাবা, কিংবা স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও এখন প্রাত্যহিক সংবাদে পরিণত হয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পুলিশের জাতীয় হেল্পলাইনগুলোর চিত্রও শঙ্কার । ১০৯ হেল্পলাইনে ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ের চেয়ে ২০২৬ সালের একই সময়ে সহিংসতার চিত্র উচ্চমাত্রার উদ্বেগজনিত।
জাতীয় হেল্পলাইন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুধুমাত্র পারিবারিক সহিংসতায় সাহায্য চেয়ে ফোনকল এসেছে তিন লাখ ৯৪ হাজার ৫২৩টি। চলতি বছরের গত ছয় মাসেই পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে সাহায্য চেয়ে ১০৯ হেল্পলাইনে ফোন এসেছে প্রায় এক লাখ ৯৫ হাজার। ২০২৪ সালে পারিবারিক সহিংসতার ফোনকল ছিল চার লাখ ৬০ হাজার ৩৫৮টি। এছাড়াও গত ছয় মাসে শারীরিক হেনস্তার শিকার হয়েছে ৩৭ হাজার, মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২১ হাজার ৫১৪ জন।
মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, অপহরণের ঘটনা, যৌন হেনস্তা, বাল্যবিয়ে, অগ্নিদগ্ধের ঘটনা, মানসিক নির্যাতন, পাচার, এসিডদগ্ধের ঘটনা এবং অন্যান্য অভিযোগেও সাহায্যের জন্য ফোন আসে। অর্থাৎ গত বছর সবচেয়ে বেশি কল আসে পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের।
এদিকে বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র জানায়, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০-এ রুজুকৃত মামলার পরিসংখ্যানে গত তিন বছরে একটিও মামলা হয়নি। অথচ পুলিশ সদরদপ্তরের জাতীয় হেল্পলাইন ৯৯৯-তে হাজার হাজার ফোনকল আসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় সাহায্য চেয়ে।
এ ব্যাপারে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার আমার দেশকে বলেন, প্রতিদিনই প্রায় হাজারো ফোনকল আসে শুধুমাত্র পারিবারিক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে সাহায্য চেয়ে। এর ভেতরে কখনো নারী নির্যাতন, কখনো বাবা-মায়ের ওপর সন্তানের নির্যাতন আবার পরিবারের অন্যদের নির্যাতন নিয়ে। তবে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাগুলো থানায় অভিযোগ বা মামলা পর্যন্ত যায় না। কারণ অধিকাংশ ঘটনাগুলো সামাজিক বা পারিবারিকভাবে বা থানার সহযোগিতায় মীমাংসিত হয়ে যাচ্ছে। নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো নিয়ে কেউ মামলা করতে চায় না। তবে আমরাও সমাধান করে দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করি। এমনকি নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় থেকে আসা পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাগুলোতেও পুলিশের সহযোগিতা লাগে। তবে তাদের পরিসংখ্যানের সঙ্গে জাতীয় হেল্পলাইনের পরিসংখ্যানসংশ্লিষ্ট নয় বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
জাতীয় হেল্পলাইন সেন্টারের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রোগ্রাম অফিসার ও হেল্পলাইন ইনচার্জ রাইসুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ‘সহযোগিতা চেয়ে পরিবারের সদস্যরা বেশি কল দেন। বেশিরভাগ কল আসে পারিবারিক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে। প্রতিদিন চাঞ্চল্যকর কেসগুলো, অর্থাৎ বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের ঘটনা হেল্পলাইন সেন্টার থেকেই তদারকি করা হয়। দৈনিক গড়ে ছয় থেকে সাত হাজার কল আসে। প্রতিষ্ঠানে জনবলের সংকট রয়েছে এবং বর্তমানে তিন শিফটে ৪০ জন ২৪ ঘণ্টা কাজ করলেও এক্ষেত্রে অন্তত ৮০ জনের প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



