ইসরাইল-তুরস্কের নতুন যুদ্ধের মঞ্চ হতে যাচ্ছে সোমালিল্যান্ড

ইসরাইল-তুরস্কের নতুন যুদ্ধের মঞ্চ হতে যাচ্ছে সোমালিল্যান্ড
ছবি: সংগৃহীত

আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমীকরণ। ইসরাইলের সঙ্গে সোমালিল্যান্ডের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা শুধু লোহিত সাগর পেরিয়ে ইয়েমেনের হুতিদের মোকাবিলার সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে না; এর পেছনে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি ঠেকানোর হিসাবও কাজ করছে বলে দাবি করেছেন সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারা।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয় এমন সোমালিল্যান্ডের রাজধানী হারগেইসার কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ ছিল প্রতিবেশী সোমালিয়ায় তুরস্কের সামরিক প্রভাব বাড়তে থাকা। মুসলিম ও আরব বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এ সম্পর্কের সমালোচনা করলেও সোমালিল্যান্ড মনে করছে, ইসরাইলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা তাদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মোহাম্মদ ওসমান ফাদাল বলেন, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। তার দাবি, সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুতে তুরস্কের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান রয়েছে এবং দেশটিতে একটি ড্রোন ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। ফাদাল বলেন, ‘আমরা চাই, তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরাইল আমাদের সহযোগিতা করুক।’

সোমালিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদিরাহমান হাসানও বলেছেন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তবতায় তাদের একটি পক্ষ বেছে নিতে হয়েছে। তার ভাষায়, ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে তারা আরব ও মুসলিম দেশগুলোর কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল না হওয়ায় তারা নতুন পথে এগিয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

হাসান বলেন, সোমালিল্যান্ডের সেনাবাহিনী সক্ষম হলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সামরিক উপকরণের ঘাটতি রয়েছে। তারা আশা করছে, ইসরাইল এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।

হুতিদের নিয়ে ভিন্ন অবস্থান

ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সোমালিল্যান্ডের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান সামনে এসেছে। এডেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত দেশটির দীর্ঘ উপকূল ইয়েমেনের খুব কাছাকাছি। ফলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর নজরদারি কিংবা ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক তৎপরতায় সোমালিল্যান্ড ইসরাইলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

তবে হুতিদের বিষয়ে সোমালিল্যান্ডের অবস্থান ইসরাইলের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। হাসান হুতিদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার বিরোধিতা করে বলেছেন, আল-শাবাবের সঙ্গে তাদের এক কাতারে দেখা যায় না। ইয়েমেনে সামরিক সংঘাতের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে সোমালিল্যান্ড। তাদের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বরং তুরস্ককে প্রধান অভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

‘ইসরাইল এখানে এসেছে তুরস্কের কারণে’

মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে ইসরাইল ও তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই নতুন মাত্রা পাচ্ছে। বিশেষ করে সিরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দুই দেশের স্বার্থের সংঘাত দেখা যাচ্ছে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভবিষ্যতে সোমালিল্যান্ডেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমালিয়া৪

অঞ্চলটির এক সাবেক পশ্চিমা কূটনীতিকের মতে, ইসরায়েল ও তুরস্কের সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কায় সবার নজর সিরিয়ার দিকে থাকলেও হর্ন অব আফ্রিকা হতে পারে তাদের প্রভাব বিস্তারের আরেকটি ক্ষেত্র। তার মতে, সোমালিল্যান্ডে ইসরাইলের আগ্রহের বড় একটি কারণ তুরস্কের উপস্থিতি।

সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এই সমীকরণকে আরো জটিল করেছে। দেশটির বন্দরনগরী বেরবেরায় আমিরাত বাণিজ্যিক বন্দর পরিচালনায় বড় অংশীদার এবং সেখানে বিমান ও নৌঘাঁটির সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে। ইসরাইল ও আমিরাতের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতার কারণে সোমালিল্যান্ড তাদের জন্য একটি স্বাভাবিক অংশীদার হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

অন্যদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে আরেকটি বলয় তৈরি করেছে।

সোমালিয়ার সঙ্গে তুরস্কের গভীর সামরিক সম্পর্ক

সোমালিয়ায় তুরস্কের প্রভাব গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১১ সালে তৎকালীন তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ভয়াবহ খরার সময় দুই দশকের মধ্যে সোমালিয়া সফরকারী প্রথম অ-আফ্রিকান নেতা হন। এরপর তুরস্ক দেশটিতে হাসপাতাল, সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করে এবং নিরাপত্তা খাতেও বড় ধরনের ভূমিকা নেয়।

বর্তমানে সোমালিয়ায় তুরস্কের সবচেয়ে বড় বিদেশি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি তুরস্ক আল-শাবাবের বিরুদ্ধে অভিযানেও সহযোগিতা করছে। সোমালিয়ায় তুরস্কের টিবি-২ বায়রাকতার ড্রোন, এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ও আতাক আক্রমণ হেলিকপ্টার মোতায়েনের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

২০২৪ সালে তুরস্ক সোমালিয়ার নৌবাহিনী গঠন ও প্রশিক্ষণের জন্য ১০ বছরের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। এই চুক্তির আওতায় সোমালিয়ার আঞ্চলিক জলসীমার নিরাপত্তায় তুরস্ক ভূমিকা রাখবে। তবে সেই জলসীমার মধ্যে সোমালিল্যান্ডও রয়েছে, যদিও সোমালিল্যান্ড নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে এবং মোগাদিশু তা স্বীকার করে না।

এ ছাড়া মোগাদিশুর সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর পরিচালনার জন্য তুরস্কের ২০ বছরের ইজারা রয়েছে। সোমালিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভবিষ্যতে সামুদ্রিক সম্পদ পাওয়া গেলে তার রাজস্বের ৩০ শতাংশ তুরস্ককে দেওয়ার বিষয়েও চুক্তি রয়েছে। তুরস্ক সোমালিয়ার মৎস্য খাতেও প্রবেশ করেছে এবং তেল অনুসন্ধান করছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে মোগাদিশু তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তুরস্ক সোমালিয়াকে সমর্থন করতে পারে। এ কারণেই তারা আগেভাগে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করতে চাইছে।

দীর্ঘদিনের বিরোধের নতুন মাত্রা

সোমালিল্যান্ড ও সোমালিয়ার বিরোধ নতুন নয়। ১৯৬০ সালে সোমালিল্যান্ড স্বাধীনতা লাভের পাঁচ দিন পর প্রতিবেশী সোমালিয়াও স্বাধীন হয়। পরে দুই অঞ্চল একীভূত হলেও সম্পর্কের টানাপোড়েন ক্রমে বাড়তে থাকে। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে সোমালিয়ার তৎকালীন শাসক মোহাম্মদ সিয়াদ বারের বাহিনী সোমালিল্যান্ডে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়।

১৯৯১ সালে সিয়াদ বারে সরকারের পতনের পর সোমালিল্যান্ড আবার স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এরপর কয়েক দশক ধরে অঞ্চলটি তুলনামূলক স্থিতিশীলভাবে পরিচালিত হলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। ইসরায়েলই ২০২৬ সালে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশ হিসেবে সামনে এসেছে।

অন্যদিকে সোমালিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও ঋণ মওকুফের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সোমালিয়ার ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ মওকুফ করে। একই সময়ে তুরস্ক দেশটির নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাঠামোয় নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করেছে।

ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ঝুঁকিও আছে

সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারা ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে নিরাপত্তা জোরদারের উপায় হিসেবে দেখলেও এর ঝুঁকিও রয়েছে। ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেশটিকে আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।

এরই মধ্যে হর্ন অব আফ্রিকা ও লোহিত সাগর ঘিরে একাধিক সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সক্রিয় রয়েছে। ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিপরীতে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। একই সময়ে ইথিওপিয়ার সঙ্গে ইসরাইল ও আমিরাতের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও মিসর ও ইরিত্রিয়ার উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের উপস্থিতি এবং ইসরাইলের সঙ্গে তাদের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

ফলে ইসরাইলের সঙ্গে সোমালিল্যান্ডের নতুন সম্পর্ক শুধু একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তুরস্ক ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরো গভীর করবে—তা এখন হর্ন অব আফ্রিকার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন