পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙন এবং এর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে মুন্সীগঞ্জ জেলার মূল ভূখণ্ডের আয়তন প্রতি বছরই আশঙ্কাজনক হারে কমছে, যা নদীপারের লাখো মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদীর ত্রিমুখী অব্যাহত ভাঙনে মুন্সীগঞ্জের ৫০ বগকিলোর্মিটারের বেশি এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ২০ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া অসংখ্য হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পুরাকীর্তি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসহ হাজার হাজার একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে এ পর্যন্ত দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চলতি বছর বর্ষার শুরুতেই জেলার টংগিবাড়ী উপজেলার ২০০ বছরের পুরোনো দীঘিরপাড় বাজারে ভাঙন শুরু হয়। পরে লৌহজং, টংগিবাড়ী রক্ষায় নির্মাণাধীন স্থায়ী নদীরক্ষা বাঁধ, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা এলাকা এবং মেঘনা তীরবর্তী গজারিয়ার নয়ানগর, হোসেন্দি কালিপুরায় ভাঙন দেখা দিলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলে তা প্রতিরোধের চেষ্টা করে। সাম্প্রতি পদ্মা নদীর তীররক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হলে জনমনে কিছুটা স্বস্তি দেখা দিলেও স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধে আবার ভাঙন দেখা দেওয়ায় সবার মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বাঁধ নির্মাণের দুই মাসের মধ্যে লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া বাজার এলাকায় স্থায়ী নদীরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। প্রায় ২০০ মিটার এলাকার বাঁধের ব্লক আকস্মিক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরই মধ্যে ভাঙনের মুখোমুখি এলাকাবাসী বসতবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। পাউবো জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ এবং সিসি ব্লক ফেলে ভাঙন রোধ করে। স্থায়ী রক্ষাবাঁধ এলাকায় আকস্মিক ভাঙনে বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের মুন্সীগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আখলাক উল জামিল বলেন, পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের নকশা প্রণয়নের সময় যে অংশ পদ্মার শাখা চ্যানেল ছিল, গতিপথ পরিবর্তন হয়ে এখন সেখান দিয়ে পদ্মার মূল চ্যানেল প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণেই ওই স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, পদ্মার সবশেষ হাইড্রোলিক ও মরফোলজিক্যাল তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা নকশা নিয়মিত পর্যালোচনা না করলে দীর্ঘমেয়াদে বাঁধ আরো ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাই পানি উন্নয়ন বোর্ড বিশেষজ্ঞদের নিয়ে করণীয় সম্পর্কে বিশেষ সভা করেছে, যাতে বাঁধে আগামীতে আর কোনো ভাঙন দেখা না দেয়।
পানি উন্নযন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার ভাঙন রোধে শিলই ইউনিয়নের পূর্বর্রাখী এলাকায় ১২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। এছাড়া শম্বু হালদারকান্দি এলাকায় ১৮ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ করা হয়েছে।
টঙ্গীবাড়ী (মুন্সীগঞ্জ) : মুন্সীগঞ্জে বদলে গেছে পদ্মার গতিপথ। একসময় যা শাখা চ্যানেল ছিল, এখন সেখানেই বইছে পদ্মার মূল প্রবাহ। নদীর এই নীরব পরিবর্তনে নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী, লৌহজং ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। হুমকির মুখে শতকোটি টাকার তীররক্ষা বাঁধ। সর্বস্ব হারানোর আতঙ্কে দিন কাটছে পদ্মাপাড়ের মানুষের।
পদ্মার এই পরিবর্তনের ভয়াবহতা নতুন নয়। গত বছরেও তার নির্মম রূপ দেখেছে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড়। ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট রাত থেকে পরদিন পর্যন্ত চলা ভাঙনে ২০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দিঘীরপাড় বাজারের প্রায় ৩০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়। হারিয়ে যায় আটটি দোকান, একটি সার গুদাম ও একটি পাটের গুদাম। পরে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক ফেলে ভাঙন ঠেকানো হলেও, সেই ক্ষত আজও শুকায়নি। এবার সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া বাজারসংলগ্ন এলাকায়। পদ্মার তীর সংরক্ষণে সেখানে প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু নির্মাণের মাত্র দুই মাসের মাথায় প্রায় ২০০ মিটার অংশের সিসি ব্লক হঠাৎ নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। ভাঙনের আশঙ্কায় অনেক পরিবার বসতভিটা সরিয়ে নেয়। পরে জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
একই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার শিলই ও বাংলাবাজারেও। গত দুই দশকে পদ্মার মূল চ্যানেল উত্তর-পূর্ব দিকে সরে এসে এই অঞ্চলের খুব কাছ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর প্রভাবে শম্ভুহালদারকান্দি, সরকারকান্দি, বানিয়াল ও মহেষপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন চলছে।
চলতি বর্ষায়ও শিলই ও বাংলাবাজার এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিলই ইউনিয়নের পূর্বরাখী এলাকায় ১২ হাজার এবং শম্ভুহালদারকান্দি এলাকায় ১৮ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

