চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ফার্মিক স্টিল লিমিটেড কারখানায় ফার্নেসের ত্রুটির কারণে গলিত লোহা ছিটকে দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় চীনা প্রকৌশলীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বরের এ দুর্ঘটনায় দগ্ধ চারজনের মধ্যে তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। আহত অপর শ্রমিক জুয়েল (৩৬) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতরা হলেন চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং (৫৩), শ্রমিক শরিফুল ইসলাম (২৭) ও মনির হোসেন (২৭)। তাদের মধ্যে শরিফুল ইসলাম ও জেংলিং হং ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এবং মনির হোসেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এদিকে নিহত শরিফুল ইসলামের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শনিবার সন্ধ্যায় জোরারগঞ্জ থানায় এ বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও নিহতের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে নিহতের পরিবার মামলা না করলেও পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে বলে জানিয়েছেন জোরারগঞ্জ থানার ওসি আবদুল হালিম। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
কারখানা সূত্র ও পুলিশ জানায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে ফার্মিক স্টিল লিমিটেড কারখানায় ফার্নেসের ত্রুটির কারণে গলিত লোহা ছিটকে চারজন দগ্ধ হন। পরে তাঁদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শরিফুল ইসলাম ও চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হংকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শরিফুল ইসলামের মৃত্যু হয়। একই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার হাজারীগঞ্জ গ্রামের মনির হোসেন (২৭)।
সর্বশেষ ২ অক্টোবর সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং (৫৩)। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি চীনা নাগরিকদের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা সুমন হোসেন নিশ্চিত করেছেন।
দুর্ঘটনায় দগ্ধ অপর শ্রমিক জুয়েল (৩৬) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।
নিহত শরিফুল ইসলাম (২৭) খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মো. সেলিম। শরিফুলের দুটি ছোট সন্তান রয়েছে।
এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হংকে দেখতে যান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় তিনি রোগীর স্বজনদের আশ্বস্ত করে জানান, ইনস্টিটিউটেই তাঁর সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
শনিবার সন্ধ্যায় জোরারগঞ্জ থানায় নিহত শরিফুল ইসলামের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফার্মিক স্টিলের চীনা ও বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। দোভাষীর মাধ্যমে ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলে জানান নিহত শরিফুলের চাচা মনির হোসেন।
নিহত শরিফুলের বাবা মো. সেলিম বলেন, “আমার ছেলের দুটি ছোট সন্তান আছে। ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। আমরা অতি সাধারণ মানুষ। চীনা কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে জেতা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সারাদিন ধরে থানায় আছি। দোভাষীদের মাধ্যমে কথা চলছে। দেখা যাক কী সিদ্ধান্ত আসে।”
নিহতের চাচা মনির হোসেন বলেন, “আমরা মামলা চাই না, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চাই। শরিফুলের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে মামলা হলে কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দিতে চাইবে না বলে আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে আইনি লড়াই চালানোর সামর্থ্য আমাদের নেই।”
জোরারগঞ্জ থানার ওসি আবদুল হালিম বলেন, “২৮ সেপ্টেম্বরের দুর্ঘটনায় দগ্ধ চারজনের মধ্যে চীনা প্রকৌশলীসহ তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। কারখানার প্রতিনিধি ও নিহত শরিফুলের স্বজনেরা থানায় এসেছেন। তাঁদের আইনি বিষয়টি জানানো হয়েছে। পরিবার মামলা না করলেও পুলিশ মামলা করতে পারে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।”
ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, “ক্ষতিপূরণের বিষয়ে পুলিশ অবগত নয়। এটি কোম্পানি ও ভুক্তভোগী দুই পক্ষের বিষয়। পুলিশ যা করবে, আইন মেনেই করবে।”
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

