প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে দিলেই খেলাপি ঋণের দায় থেকে মুক্তি মিলবে না। ঋণ পরিশোধ না করলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগও থাকবে না—এমন কঠোর বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন সংশোধনে। সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচনেও ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতা ঠেকাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা নিষিদ্ধ, আচরণবিধি লঙ্ঘনে কারাদণ্ড ও জরিমানা বাড়ানোসহ প্রার্থীর যোগ্যতা এবং নির্বাচন পরিচালনায় আরো বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়ে শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের যাত্রা। অন্তত ৭ ধাপে এসব নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। প্রথম ধাপে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরিশাল, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় জেলাগুলোকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে। মাঝে পৌরসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে সরকারের। অর্থের সংস্থান হলে ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচনই সবার আগে অনুষ্ঠিত হতে পারে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
চলতি বছরের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ডিসেম্বরকে ভোটগ্রহণের সম্ভাব্য সময় ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কারণে এর আগেই নির্বাচনের বড় একটি অংশ শেষ করতে চান সংশ্লিষ্টরা।
ইসি ও স্থানীয় সরকার সূত্র জানায়, আগামী বছরের জুনের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ থেকে ইসিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন।
জুনের মধ্যে সব নির্বাচন
স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তর হলো—জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা। ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ বাকি পরিষদগুলো বর্তমানে প্রশাসক ও আমলাদের তত্ত্বাবধানে চলছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম আমার দেশকে বলেন, আগামী বছরের জুনের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচন শেষ করা হবে। এ জন্য প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ইউপির জন্য ২,৮০০ কোটি এবং উপজেলার জন্য ২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে ইতোমধ্যে মৌখিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। ইসিও সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে কোন নির্বাচন আগে এবং কোনটি পরে হবে—তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ইসির প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন ও অর্থ বিভাগ যৌথভাবে বৈঠক করবে। সেখানে প্রতিটি নির্বাচনের সম্ভাব্য ব্যয় পর্যালোচনা করে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এক-দুই মাস পর থেকেই আমরা অনেকগুলো নির্বাচন শুরু করব—বলেন তিনি।
আইন সংশোধনের প্রস্তাব
স্থানীয় সরকারের নির্বাচন-সংক্রান্ত আইনগুলোতে সামঞ্জস্য আনতে একাধিক সংশোধনের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০ আগস্ট শেষ হওয়ার পর এসব প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনগুলো আগামী ২৮ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া অধিবেশনে পাস হতে পারে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধির খসড়াও আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য বিবেচনাধীন রয়েছে।
সংশোধনী প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণখেলাপির প্রার্থিতা। কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে কেউ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হলেও ওই প্রতিষ্ঠানের আগের ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাকে খেলাপির দায় থেকে মুক্ত ধরা হবে না। ফলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন।
আইন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইনে এ সুযোগ বন্ধ করা থাকলেও স্থানীয় সরকারের বেশ কিছু আইনের ক্ষেত্রে এ বিধানটি স্পষ্ট ছিল না।
এদিকে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন-২০০৯, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন-২০০৯, উপজেলা পরিষদ আইন-২০০৯ এবং জেলা পরিষদ আইনের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
দ্বৈত নাগরিক ও শিক্ষকদের প্রার্থিতা
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এমপিওভুক্ত এবং সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রার্থিতার বিষয়ে বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিরসনের সুপারিশ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালারও প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আদলে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরের নির্বাচনেও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতদিন স্থানীয় সরকারের কয়েকটি স্তরে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে স্পষ্ট আইনি বিধিনিষেধ ছিল না।
নির্বাচনকালীন ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’র সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী—সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞা ও সংশ্লিষ্ট শ্রেণিবিন্যাসে সামঞ্জস্য আনার বিষয়টি প্রস্তাবে রাখা হয়েছে।
আচরণবিধি ভাঙলে বাড়ছে শাস্তি
নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অনিয়মের ক্ষেত্রেও শাস্তি কঠোর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে থাকা ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান সংশোধন করে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষক’ বলতে এমন ব্যক্তি বা সংস্থাকে বোঝাবে, যাকে নির্বাচন কমিশন অথবা কমিশনের অনুমোদিত কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য লিখিতভাবে অনুমতি দিয়েছে।
‘নির্ভরশীল’ ও ‘নৈতিক স্খলন’-এর সংজ্ঞায়ও পরিবর্তন
বিভিন্ন স্থানীয় সরকার আইনে ‘নির্ভরশীল’-এর সংজ্ঞায়ও সামঞ্জস্য আনার প্রস্তাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীর স্বামী বা স্ত্রী এবং তার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল পুত্র-কন্যা, বাবা-মা, ভাই বা বোনকে নির্ভরশীল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন আইনে সংজ্ঞার ভাষাগত পার্থক্য থাকায় সেগুলোকে অভিন্ন কাঠামোয় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ’-এর সংজ্ঞাও সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী দণ্ডবিধি ১৮৬০-এ সংজ্ঞায়িত চাঁদাবাজি, চুরি, সম্পত্তি আত্মসাৎ, বিশ্বাস ভঙ্গ, ধর্ষণ, হত্যা ও খুনের মতো অপরাধ এর আওতায় থাকবে। একইসঙ্গে প্রিভেনশন অব করাপশন অ্যাক্ট, ১৯৪৭-এ সংজ্ঞায়িত ‘ক্রিমিনাল মিসকনডাক্ট’ও অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
এর মাধ্যমে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ-সংক্রান্ত আইনগুলোতে অপরাধের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
‘লাভজনক পদ’ যুক্ত হচ্ছে
উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ আইনেও ‘লাভজনক পদ’ সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘লাভজনক পদ’ বলতে প্রজাতন্ত্রের কোনো পদ, সরকারি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষের পদ অথবা সরকারের ৫০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার রয়েছে—এমন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির সার্বক্ষণিক বেতনভুক্ত পদ বা অবস্থানকে বোঝাবে।
সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে—সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপজেলা ও জেলা পরিষদ আইনেও এসব বিধান সংযোজন প্রয়োজন। একইসঙ্গে বিভিন্ন আইনে ব্যবহৃত সংজ্ঞাগুলোকে অভিন্ন করার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জনপ্রতিনিধিদের যোগ্যতার বিধান আরো স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামোতেও পরিবর্তন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও আইনি পরিবর্তনের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার পাশাপাশি নির্বাহী কর্মকর্তাদের—যেমন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) রাখার বিষয়টি নিয়েও পর্যালোচনা চলছে। জুডিশিয়াল ফোরামে বিচারিক স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং দুই বিচারকের মধ্যে মতদ্বৈধতা এড়াতে আপিল ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের মতামতও দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কার্যকর হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা, ঋণখেলাপির অবস্থান, দ্বৈত নাগরিকত্ব, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, আচরণবিধি, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ এবং সরকারি বা সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে ‘লাভজনক পদ’-সংক্রান্ত বিধানগুলো আরো সুস্পষ্ট হবে। সরকারের লক্ষ্য এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরো স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



