হৃদরোগ ও দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের চিকিৎসা

হৃদরোগ ও দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের চিকিৎসা

ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজির (ইএসসি) হৃদরোগ ও দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ (সিকেডি)-সংক্রান্ত নির্দেশিকা আধুনিক হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। কারণ কিডনি রোগকে শুধু হৃদরোগের সঙ্গে থাকা একটি সহায়ক রোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ নিজেই একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র হৃদরোগের ঝুঁকিকারক, যা হৃদরোগের উৎপত্তি, অগ্রগতি, চিকিৎসাপদ্ধতি, রোগের পরিণতি এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এ কারণে ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজির নির্দেশিকায় হৃদরোগ ও কিডনি রোগকে আলাদা দুটি সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত হৃদযন্ত্র-কিডনি ব্যবস্থার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ধারণাকে সহজভাবে বোঝাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হলো—‘STAMP on CKD’।

বিজ্ঞাপন

ঝুঁকি নির্ণয় ও প্রতিরোধ

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক রোগীর কোনো উল্লেখযোগ্য উপসর্গ থাকে না। ফলে শুধু রোগীর উপসর্গের ওপর নির্ভর করে কিডনি রোগ শনাক্ত করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে হৃদরোগ বা হৃদরোগের উচ্চঝুঁকিতে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত কিডনি রোগ শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত কিডনি কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হয়—

১. আনুমানিক গ্লোমেরুলার পরিস্রাবণ হার (ইজিএফআর)। এটি কিডনি কতটা ভালোভাবে রক্ত পরিশোধন করছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

২. প্রস্রাবের অ্যালবুমিন-ক্রিয়েটিনিন অনুপাত (ইউএকর)। প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা প্রোটিনের পরিমাণ নির্ণয় করে কিডনির ক্ষতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। এই দুটি পরীক্ষা একে অন্যের পরিপূরক। ইজিএফআর মূলত কিডনির পরিশোধন ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দেয়, আর প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের উপস্থিতি কিডনির ক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন এবং একই সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকিরও একটি শক্তিশালী সূচক।

ঝুঁকি নির্ণয় কেন গুরুত্বপূর্ণ

কিডনি রোগ কতটা গুরুতর? হৃদরোগের ঝুঁকি কতটা? এবং এই কিডনি রোগের কারণে চিকিৎসাপদ্ধতিতে কী পরিবর্তন প্রয়োজন? ইজিএফআর কতটা কমেছে, প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের মাত্রা কত, রোগীর ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে কি না, বয়স, পূর্ববর্তী হৃদরোগ এবং অন্যান্য ঝুঁকিকারক—সবকিছু বিবেচনা করে রোগীর সামগ্রিক ঝুঁকি নির্ণয় করতে হবে। যাদের কিডনি রোগ বেশি অগ্রসর, প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের মাত্রা বেশি, কিডনি দ্রুত অবনতি হচ্ছে অথবা ইলেকট্রোলাইটের মতো জটিলতা রয়েছে, তাদের আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। তবে কিডনি রোগ শনাক্ত করাই শেষ কথা নয়। শনাক্ত হওয়ার পর যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিসের সঠিক ব্যবস্থাপনা, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বন্ধ করা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং কিডনি ও হৃদযন্ত্র সুরক্ষাকারী প্রমাণভিত্তিক ওষুধের যথাযথ ব্যবহার—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ

এটি একটি ধারাবাহিক হৃদরোগ ও কিডনি-ঝুঁকির অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কিডনির কার্যক্ষমতা যত কমে এবং প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের পরিমাণ যত বাড়ে, সাধারণত হৃদরোগ ও মৃত্যুর ঝুঁকিও তত বাড়ে। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ এবং হৃদরোগের অনেকগুলো ঝুঁকিকারক একই। যেমন—

* উচ্চ রক্তচাপ

* ডায়াবেটিস

* স্থূলতা

* ধূমপান

* রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল

* শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা

* অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

এসব ঝুঁকিকারক নিয়ন্ত্রণ করলে একই সঙ্গে হৃদযন্ত্র ও কিডনি—দুই অঙ্গই উপকৃত হয়।

উদাহরণস্বরূপ, উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ যেমন স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে পারে, তেমনি কিডনি রোগের অগ্রগতিও ধীর করতে পারে। আবার ডায়াবেটিসের আধুনিক চিকিৎসার কিছু ওষুধ রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হৃদযন্ত্র ও কিডনির জন্যও অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে পারে। অতএব, চিকিৎসার সময় শুধু একটি অঙ্গকে লক্ষ না করে হৃদযন্ত্র ও কিডনি—উভয়ের ওপর চিকিৎসার প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

চিকিৎসায় পরিবর্তন

কিডনি রোগ থাকলে হৃদরোগের রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, ওষুধের মাত্রা, পর্যবেক্ষণ এবং রোগের পূর্বাভাস—সবকিছুতেই কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। কিডনি রোগের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির রোগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যেমন—

* তীব্র করোনারি সিনড্রোম বা আকস্মিক করোনারি সিনড্রোম

* দীর্ঘস্থায়ী করোনারি সিনড্রোম

* হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা

* অলিন্দের অনিয়মিত স্পন্দন ও অন্যান্য হৃদছন্দের অস্বাভাবিকতা

* স্ট্রোক ও অন্যান্য মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ

* প্রান্তীয় ধমনির রোগ

* আকস্মিক হৃদযন্ত্রজনিত মৃত্যু

করোনারি ধমনির রোগ বা হৃদযন্ত্রের রক্তনালির রোগে কিডনি রোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিকারক। কিডনি রোগ থাকলে হার্ট অ্যাটাক, আবার হৃদরোগের ঘটনা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।

চিকিৎসায় জটিলতা

চিকিৎসককে বিবেচনা করতে হয়—

* কিডনির কার্যকারিতা অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচন ও মাত্রা নির্ধারণ

* রক্তপাতের ঝুঁকি

* রক্তের অণুচক্রিকা জমাট বাঁধা প্রতিরোধকারী ওষুধ এবং রক্ত জমাট প্রতিরোধকারী ওষুধ ব্যবহারে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বনাম রক্তপাতের ঝুঁকির ভারসাম্য

* বিভিন্ন পরীক্ষা বা চিকিৎসামূলক হস্তক্ষেপের সময় তীব্র কিডনি ক্ষতির সম্ভাবনা

* কিডনি রোগীর কিছুটা ভিন্ন বা প্রচলিত নয় এমন উপসর্গের সম্ভাবনা।

কিডনি রোগ ও স্ট্রোক

কিডনি রোগীদের স্ট্রোকের ঝুঁকিও বেশি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধমনিতে চর্বি জমা, রক্তনালিতে ক্যালসিয়াম জমা এবং অন্যান্য রক্তনালিজনিত সমস্যা এই ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই স্ট্রোক প্রতিরোধের জন্য কিডনি রোগকে রোগীর সামগ্রিক রক্তনালিজনিত ঝুঁকি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি

সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ, গুলশান, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন