বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং কওমি মাদরাসাভিত্তিক তথা দেওবন্দী আলেমদের একাংশের দ্বন্দ্ব যেন কাটছেই না। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর কিছু লেখাকে কেন্দ্র করে অনেক আগে থেকে শুরু হওয়া দ্বন্দ্ব পরবর্তীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিস্তৃতি লাভ করেছে।
কওমি একাংশের মতে, জামায়াত ও কওমি আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ রাজনৈতিক নয়, আকিদাগত। তাদের মতে, জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার আগ থেকেই মাওলানা মওদুদী তার কিছু লেখায় কয়েকজন নবী এবং সাহাবাদের সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর কথা লিখেছেন, যে বিষয়ে দেওবন্দী অনুসারী কওমি আলেমরা একমত নন। যে কারণে মওদুদী প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীরও বিরোধিতা করেন তারা।
যদিও জামায়াতের পক্ষ থেকে কওমিদের সম্পর্কে প্রকাশ্য কোনো মতবিরোধ বা দ্বন্দ্বের কথা বলা হয় না। বরং কওমি আলেমদের সঙ্গে ঐক্যের তৎপরতায় বেশ সোচ্চার দেখা যায়। এমনকি ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও জামায়াত তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখায় না। এতে জামায়াতের সঙ্গে কওমি অঙ্গনের একটি অংশ, বিশেষ করে তরুণদের মাঝে দূরত্ব কমছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জামায়াত-কওমি দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে কওমিপন্থি লেখক মুফতি আব্দুল্লাহ ফারুক আমার দেশকে বলেন, মাওলানা মওদুদী প্রথমদিকে সাংবাদিক ছিলেন। পশ্চিমাবিরোধী তার লেখালেখিতে ভারতীয় উর্দু ভাষীরা বেশ মুগ্ধ হতেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আলেম না হয়েও স্বশিক্ষিত হিসেবে তিনি অনেক লেখালেখি করেছেন। কিন্তু তার কিছু লেখায় কয়েকজন নবী ও সাহাবাদের বিষয়ে আপত্তিকর কথা ছিল। তখন অরাজনৈতিক কিছু আলেম সেই বিষয়গুলোতে আপত্তি করেন। পরে ১৯৪১ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করলে সেই দলের সমর্থন করেননি ওই আলেমরা। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশেও জামায়াত নিয়ে কওমি আলেমদের দ্বন্দ্ব চলে আসছে। তাই মওদুদী ও জামায়াতের বিরোধিতা রাজনৈতিক কোনো বিষয় নয়, এটা আকিদাগত। এ কারণে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে হেফাজত আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম বলেছেন। তাছাড়া জামায়াতের সঙ্গে কওমির দ্বন্দ্বের আরেকটি কারণ হলোÑ তারা মনে করে, আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন হুকুমত কায়েমের জন্য। আর আমরা মনে করি, আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন ইবাদতের জন্য, এজন্য হুকুমত লাগলে লাগলো, আর না লাগলে না লাগলো।
এ বিষয়ে কওমিপন্থি আরেক আলেম বলেন, মাওলানা মওদুদীর লিখিত কিছু মত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মৌলিক আকিদার বিরোধী। যেমনÑ নবীগণ নিষ্পাপ, সাহাবাগণ সত্যের মাপকাঠিÑ এটা তিনি মানেন না। এ বিষয়গুলোর সমাধান না হওয়ায় কওমি আলেমরা জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এজন্য বিভিন্ন সময়ে কওমি ও জামায়াতের মুরুব্বি আলেমরা ঐক্যের উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি।
একই ধরনের মত পোষণ করে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও কওমি আলেম মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, মাওলানা মওদুদীর বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে বিরোধের সমাধান করলেই মওদুদীবাদ বলে কিছু থাকবে না। সব সমাধান হয়ে যাবে।
সূত্রমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতবিরোধী তৎপরতা জোরদার করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী। ভোটের এক সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ধর্মীয় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম, কোনোভাবেই জায়েজ নয়। এ সময় তিনি জামায়াতের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’-এর ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি) আসনের বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। হেফাজত আমির জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তার এই বক্তব্য নিয়ে কওমি অঙ্গনেও বেশ বিতর্ক দেখা দেয়। কারণ একদিকে হেফাজত আমিরের জামায়াতবিরোধী ফতোয়া, অন্যদিকে জনপ্রিয় কওমি আলেম ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন দলসহ আরো কয়েকটি দল জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি ঐক্য করে একে-অপরের জন্য মাঠে সরব ছিল। সেই ঐক্য এখন সংসদে বিরোধীদল হিসেবে স্থায়ী রাজনৈতিক ঐক্যে রূপ নিয়েছে।
জামায়াত নিয়ে কওমি অঙ্গনের একাংশের এই অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, জামায়াতে ইসলামী ও কওমি আলেমদের দ্বন্দ্বটা মওদুদীকে কেন্দ্র করে। তার কিছু লেখা নিয়ে আপত্তি আছে। তাই জামায়াতও সেই মতামত মানেÑ এমন যুক্তিতে বিরোধিতা শুরু। বিষয়টি ওভাবেই আছে। যদিও জামায়াতের অনেকে বলেন, মওদুদীর আকিদা আর তাদের আকিদা এক নয়।
তিনি বলেন, আমরা জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য নিয়ে আছি। তবে জামায়াতকে ভোট দেওয়া যারা হারাম বলেন, এটা অনেক বাড়াবাড়ি। তারা কোনো একটা পক্ষ নিয়েই এটা বলেন। কারণ পাকিস্তানেও জমিয়ত ও জামায়াতসহ অনেকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনীতি করছে। এখানেও অতীতে কওমি আলেমদের দল জামায়াতের সঙ্গে জোট করে রাজনীতি করেছে। তাই ইসলামপন্থি বা ইসলামের নামে যারা রাজনীতি করে, তাদের দূরত্ব কমানো দরকার। আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়।
কওমিদের বিরোধ সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, কওমি আলেমদের একটি গ্রুপ এই দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখেন। তারা ভোটের সময় মাথাচাড়া দেন। নানা ফতোয়া দেন। কেন এটা করেন, তা জানি না। তিনি বলেন, অধ্যাপক গোলাম আযম তার ‘ইকামতে দ্বীন’ বইয়ে স্পষ্ট করে লিখেছেন, জামায়াতে ইসলামী মাওলানা মওদুদীকে (র.) ফেকাহ বা আকায়েদের ইমাম মনে করে না। তার ইজতেহাদকে মেনে নেয়াও জামায়াতের কোনো নীতি নয়।
গোলাম আযম আরো লিখেছেন, মাওলানা মওদুদীর কোনো কথাকেই রাসুলের কষ্টিপাথরে যাচাই না করে আমি মানতে রাজি নই। কোরআন ও সুন্নাহর বিচারে তার মতামত যতটুকু গ্রহণযোগ্য মনে হয়, আমি ততটুকুই গ্রহণ করি। এটাই জামায়াতে ইসলামীর নীতি।
খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, জামায়াতের আকিদা বিশ্বাস হলো ইসলামের আকিদা। জামায়াতের কোথাও বলা নেই যে, আমরা নবী ও সাহাবাদের মানি না। তিনি বলেন, মাওলানা মওদুদী দেওবন্দী আলেমদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে গেছেন। তিনি নিজেও দেওবন্দী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। কওমি আলেমদের সঙ্গে তিনি আন্দোলন করেছেন। তার কিছু বক্তব্য বা লেখার ভুল তরজমা করে বিতর্ক করা হয়। যার সঙ্গে জামায়াতের কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি আরো বলেন, জামায়াত কর্মীদের প্রধান পাঠ্যপুস্তক হলো কোরআন ও হাদিস। আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্র পরিচালনাকেন্দ্রিক তথ্য জানতে মাওলানা মওদুদীসহ অনেক লেখকের বই পড়ে সহযোগিতা নেওয়া হয়। তবে জামায়াতের সঙ্গে অন্যান্য ইসলামি দলের আকিদার কোনো পার্থক্য নেই। আমাদের আকিদা হলোÑ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। তাই জামায়াতের সঙ্গে কওমিদের দ্বন্দ্বের কোনো কারণ আছে বলে মনে করি না। তাদের একটি গ্রুপ বিতর্ক করলেও বৃহত্তর অংশ জামায়াতের সঙ্গেই আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সূত্র মতে, চব্বিশের জুলাই পরবর্তী ১৮ আগস্ট রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে কওমি ঘরানার আলেমসহ বিভিন্ন ইসলামি দলের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে আলেমদের উদ্দেশে জামায়াতের আমির বলেন, ‘এখন থেকে আমরা সবাই একে অপরের জন্য। সবাই সিসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ থাকব, ইনশাআল্লাহ। অতীতের কোনো আচরণের জন্য আপনারা যদি সামান্য কষ্ট পেয়ে থাকেন, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই। আশা করি, আপনারা আমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।’ পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর ভোটের একটি বাক্স দেওয়ার নীতিতে কাজ শুরু হয়। তবে প্রথমে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও শেষ মুহূর্তে ইসলামি আন্দোলন আকিদাগত সমস্যা দেখিয়ে সেই উদ্যোগ থেকে সরে যায়। অবশ্য কওমি অঙ্গনের আলোচিত দল মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, হাফেজ্জী হুজুরের দল খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টিসহ দেশপ্রেমিক দল নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য করে নির্বাচনে অংশ নেয় জামায়াত।
কওমি-জামায়াত দ্বন্দ্ব বিষয়ে সম্প্রতি জামায়াতে যোগ দেওয়া জনপ্রিয় কওমি তরুণ আলেম মাওলানা আলী হাসান উসামা বলেন, ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদীর লেখালেখি নিয়ে তথা কওমিদের ইলমি ইখতেলাফ (জ্ঞানগত দ্বন্দ্ব) ছিল। ধীরে ধীরে তা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, পাকিস্তানে কওমি-জামায়াত তেমন কোনো দ্বন্দ্ব নেই। সেখানে কওমিপন্থি বড় দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে কাজ করছে জামায়াত। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। ধর্মীয় বিরোধ থেকে রাজনৈতিক বিরোধে রূপ নিয়েছে। যদিও জামায়াতের পক্ষ থেকে বার বার স্পষ্ট করা হয়েছে যে, মাওলানা মওদুদীর মত তার ব্যক্তিগত মত। জামায়াতে হানাফী, সুন্নী সব মাযহাবের লোক আছে। নবী (সা.) ও সাহাবাদের নিয়ে কওমিপন্থিরা যে অভিযোগ তোলেন তা অবাস্তব। কারণ জামায়াতের লোকেরাও তা বিশ্বাস করে না। এমনকি জামায়াতের লোকেরা বছরে একবারও মওদুদীর নামটাও উচ্চারণ করেন না। তারাই বারবার এই উচ্চারণ করেন। একটি দলের পক্ষ নেওয়া কিছু কওমি আলেম এগুলো জিইয়ে রাখেন।
আলী হাসান উসামা আরো বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনের আগে যখন সব ইসলামি দল ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ ঘোষণা করে, তখন বিএনপির পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করার কিছু ছিল না। পরবর্তী সময়ে জামায়াতবিরোধী ফতোয়া দিয়ে সেটাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে ফতোয়া দেওয়া হয় যে, জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম। এর মাধ্যমে বিএনপি ও অন্য দলগুলোকে ভোট দেওয়া জায়েজ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভোটের পর তাদের এক নেতার বক্তব্যে প্রকাশিত হয়েছে। ওই নেতা বলেছেন, আমাদের জেতা উদ্দেশ্য ছিল না, জামায়াতকে হারানোই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য, তাতে আমরা সফল হয়েছি।
মুফতি উসামা আরো বলেন, ইসলামের ইতিহাস নিয়ে টুকটাক ইখতিলাফ থাকলে তা বসেই সমাধান করা যেতে পারে। তবে তরুণ কওমি আলেমদের মধ্যে অনেকটাই পরিবর্তন আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, ধীরে ধীরে এই দ্বন্দ্ব কেটে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

