নতুন সরকারের প্রথম ডিসি সম্মেলন শুরু ৩ মে

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণসহ ১৭২৯ প্রস্তাব মাঠ প্রশাসনের

এম এ নোমান

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণসহ ১৭২৯ প্রস্তাব মাঠ প্রশাসনের

রাজনৈতিক দলের প্রভাবের বাইরে থেকে দায়িত্ব পালন করতে চান মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, সরকারের চাওয়া, কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে জনসেবা নিশ্চিত করা।

পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা। জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনকে কেন্দ্র করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সারসংক্ষেপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের পাঠানো প্রস্তাবনার ভিত্তিতে প্রশাসনের তৃণমূলের ভাবনা উঠে এসেছে মন্ত্রিপরিষদের তৈরি করা সারসংক্ষেপে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

বিজ্ঞাপন

আগামী ৩ মে অনুষ্ঠেয় ডিসি সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসক পৃথকভাবে বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন সুবিধা, অসুবিধা ও সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তাদের প্রস্তাবনা পেশ করেছেন। সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নসহ মাদক নির্মূলের পথে যেসব অন্তরায় রয়েছে তা ওঠে এসেছে তাদের প্রস্তাবনায়। এতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও ওঠে এসেছে তাদের প্রস্তাবে।

সারা দেশের মাঠ প্রশাসন থেকে তথ্য নিয়ে জেলা ডিসিরা এক হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব পেশ করেছেন। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠক করে ৪৯৮টি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে নীতি ও কর্মসূচি বদলের সুবিধা ও অসুবিধার পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কথাও তুলে ধরেছেন কেউ কেউ। এক জেলা প্রশাসক লেখেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকায় ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার কারণে মাদকমুক্ত সমাজ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। সীমান্ত দিয়ে অবাধে মাদক আমদানির বিষয়টিও ওঠে এসেছে একজন জেলা প্রশাসকের মতামতে। এছাড়া ভারতের ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহতা থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রক্ষা করতে দ্রুত পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন একজন। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলার প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প (জি-কে প্রজেক্ট) জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (দ্বিতীয় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের কথাও বলেছেন আরেকজন।

নতুন সরকারের প্রথম ডিসি সম্মেলন

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের অভিযাত্রা শুরু হয় গত ১৭ এপ্রিল। নতুন সরকারের সময়ে এবারের ডিসি সম্মেলনকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। সরকারের নীতি নির্ধারকরা বলেন, এ সম্মেলনের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে নতুন সরকারের একটি সেতুবন্ধন তৈরি হবে। মূলত এরপরই সরকারের নীতি, কর্মপদ্ধতি ও নির্বাচনের সময়ে দেশবাসীকে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিগুলোর সফল বাস্তবায়নের নির্দেশনা পাবেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শৃঙ্খলা অধিশাখার একজন কর্মকর্তা জানান, আগামী ৩ থেকে ৬ মে এ সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে জেলা প্রশাসকরা মুক্ত আলোচনায় অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রী ওই সময় সরাসরি ডিসিদের কাছ থেকে প্রশাসনের তৃণমূলের সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং দায়িত্ব পালনের সুবিধা ও অসুবিধার কথা শুনবেন।

ডিসি সম্মেলনের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, এ বছর ৫৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, কার্যালয় ও সংস্থার বিষয়াদি ৩৪টি কার্য অধিবেশনে আলোচনা হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, রেওয়াজ অনুযায়ী ডিসি সম্মেলন উপলক্ষে ডিসিরা সারা দেশের মাঠের চিত্র ও সুবিধা-অসুবিধা ও সুপারিশগুলো প্রস্তাব আকারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়ে থাকেন। এবার সারা দেশ থেকে ১ হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে ৪৯৮টি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ডিসি সম্মেলনকে সামনে রেখে এবার ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারদের কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাবের মধ্যেÑজনদুর্ভোগ কমানো, জনসেবা ও স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ নির্মাণ, দেশব্যাপী পর্যটনশিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি, ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন।

এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ, স্থানীয় পর্যায়ে কর্ম-সৃজন ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন, গুজব প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি। এসব প্রস্তাবের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা ও এগুলোর কার্যক্রম জোরদারের বিষয়েও ডিসিরা বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, ডিসিদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি এসেছে মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে। সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদকের অবাধ আমদানি ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে। পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বিষয়গুলো নিয়েও ডিসিদের উদ্বেগ প্রকাশসহ এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ানোর সঙ্গে লোডশেডিং কমানোর বিষয়েও প্রস্তাব এসেছে ডিসিদের কাছ থেকে।

সম্মেলন ঘিরে সরকারের ভাবনা

ডিসি সম্মেলন ঘিরে সরকারের প্রত্যাশা ও মাঠ প্রশাসনের প্রতি কী ধরনের নির্দেশনা থাকবে এ প্রশ্ন ছিল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী এমপির কাছে। আমার দেশকে তিনি বলেন, ডিসিরা সরকারের নীতি ও কর্মকৌশল দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম। আমাদের সরকারের আমলে এটিই প্রথম সম্মেলন। কাজেই আমরা এ সম্মেলনকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই মাঠ প্রশাসন সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুক। প্রশাসন শক্তিশালী হলে জনগণ সুফল পাবে। আমরা নির্বাচনের সময়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি ও ইশতেহারে যা ঘোষণা করা হয়েছে তার সফল বাস্তবায়ন চাই। এটি বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত তৃণমূলের কর্মকর্তাদের। এজন্য আমরা পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীও একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন চান।

সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আবদুল বারী বলেন, আমরা জনগণের কাছে ইশতেহার দিয়েছি। জনগণ আমাদের এ ইশতেহার গ্রহণ করে আমাদের তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছে। আমরা এখন দেশের শাসক নই, আমরা হচ্ছি সেবক। দেশবাসীর সেবার জন্য দায়িত্ব নিয়েছি। এটি অক্ষরে অক্ষরে আমরা পালন করতে চাই। এজন্য প্রশাসনের সহযোগিতা আমাদের একান্ত প্রয়োজন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে যেসব কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন তা বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রশাসনিক কাঠামো দরকার, আমরা সেটি করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। প্রশাসনের কর্মকর্তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়। তারা দেশের জন্য কাজ করবেন। ডিসি সম্মেলনের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনকে এ বার্তাটিই দেওয়া হবে বলেও জানান জনপ্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত এ প্রতিমন্ত্রী।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন